0গত ১৪ই জুন ‘তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ, বিদ্যুৎ, বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’র আহ্বানে জ্বালানী মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচীতে প্রায় ১২’শ-১৪’শ মানুষ ছিলেন, প্রধানত ছিলেন তরুণেরা । জ্বালানী মন্ত্রণালয় ঘেরাও বা এর সামনে অবস্থান কর্মসূচী মূলত একটা বেপরোয়া কর্মসূচী। অনেকগুলো কর্মসূচী পার হয়ে আমরা বাধ্য হয়ে এই কর্মসূচী দিয়েছি। ২০০৯ সালে যখন পুলিশ আমাদেরকে হামলা করে তখন এবং তারও আগে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যখন পিএসসি করার প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন থেকেই এটা নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলেছি যে পিএসসি ২০০৮ এর অধীনে যদি বাংলাদেশে চুক্তি হয় তাহলে বর্তমান প্রজন্ম তো বটেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মও আমাদেরকে অভিশাপ দেবে। কেননা তারা যে মাত্রায় বঞ্চিত হবে তা ভয় পাইয়ে দেবার মত। একটু দায়িত্বশীল হলেই এটা বোঝা সম্ভব। সেজন্য আমরা সুনির্দিষ্টভাবেই দাবী তুলেছিলাম। এরপর সেটা নিয়ে মাঠে আন্দোলন হয়েছে, লেখালেখি হয়েছে, টেলিভিশনেও কথা বলেছি, এমনকি জ্বালানী বিষয়ক সংসদীয় কমিটির কাছে সুনির্দিষ্টভাবে প্রস্তাবও দিয়েছি। ‘খনিজ সম্পদ নিষদ্ধকরণ আইন’ বিল পাশ করতে পরামর্শ দিয়েছি, এমনকি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি গোলাম মোহাম্মদ রাব্বানীসহ আরো কয়েকজন আইনজীবী মিলে বিলের খসড়াটি আমরাই করে দিয়েছি। সেই বিল পড়ে আছে প্রায় দুবছর হল। কোন কাজ হয়নি। সরকার কোনরকম ভ্রুক্ষেপ না করে যা খুশি তা করেই যাচ্ছে। কিছুদিন আগে উইকিলিকসের মাধ্যমে প্রকাশিত হল- জেমস মারিয়ার্টি জ্বালানী মন্ত্রনালয়ে গিয়ে জ্বালানী উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহীকে বলছেন যে “কনোকো ফিলিপসের সাথে চুক্তি করেন, ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত খনি করেন, শেভরনের কাছ থেকে কমপ্রেশার মেশিল কেনেন” ইত্যাদি। এই বিষয়গুলো সরাসরি মার্কিন দূতাবাস বলছে। আমরা অনেকদিন থেকেই বলে আসছি জ্বালানী মন্ত্রনালয় আর বাংলাদেশের নিজের নাই, এটা বহুজাতিক কোম্পানীর একটা বর্ধিতাংশে পরিণত হয়েছে। উইকিলিকসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে আসলেই সেটা ঠিক। এরই মধ্যে সরকার কনকো-ফিলিপসের সাথে চুক্তি করে ফেলার তোড়জোড় শুরু করে। যার প্রেক্ষিতে আমরা ১৪ জুন ঘেরাও কর্মসূচি দিতে বাধ্য হই। ১৪ জুনের আরেকটা তাৎপর্য আছে। যেটার জন্য দায়ী জ্বালানী মন্ত্রণালয়, জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের অবহেলা। ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মাগুরাছড়ায় ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছিল। অক্সিডেন্টাল নামক একটা মার্কিন কোম্পানী তখন দায়িত্বে ছিল। পরবর্তীতে তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে যে শুধুমাত্র তাদের দায়িত্বে অবহেলার জন্য এই ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। সেই তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে এই বিস্ফোরণে ২৫০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নষ্ট হয়েছে। পরিবেশ, রেললাইন, চা বাগান, এগুলোতো আছেই। ১৯৯৭ থেকে ২০১১, এই সময়েও কিন্তু এই ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়নি। জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ব্যয় বহন করেন জনগণ, তারা বেতন পান, বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পান; সেটা কি জন্য? জনগণের স্বার্থ দেখার জন্য, জ্বালানী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। কিছুদিন আগে ‘বিপি আমেরিকা’ গালফ অব মেক্সিকো- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলীয় অঞ্চলে তেল অনুসন্ধান করতে গিয়ে একটা দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। মিডিয়ার মাধ্যমে সেই দুর্ঘটনার ভয়াবহতা, ফলাফল আমরা দেখেছি। বিপি আমেরিকার নির্বাহী কর্মকর্তাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের যে জ্বালানী বিষয়ক কমিটি এবং কংগ্রেসের বিভিন্ন ধরণের বডি দুই মাসের মধ্যে অন্তত দশবার তাদের ডেকে শুনানি করেছে পাবলিকলি, যা সরাসরি সম্প্রচার হয়েছে টিভি চ্যানেলে। অথচ আমাদের দেশে ১৯৯৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত জ্বালানী বিষয়ক সংসদীয় কমিটি কখনোই এটা নিয়ে কোন শুনানী করতে পারে নি। লোক দেখানোর জন্য আনুষ্ঠানিকতাও করতে পারত, তাও করে নি। বরঞ্চ একবার ডেইলি স্টার পত্রিকায় একটা ঘটনা প্রকাশিত হয়েছিল। ঘটনা টা এরকম- এখন যিনি জ্বলানী উপদেষ্টা তখন তিনি জ্বালানী সচিব ছিলেন, সেই সময় জ্বালানী বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন আওয়ামীলীগের জাঁদরেল একজন লোক আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি জ্বালানী সচিবকে বলেছিলেন “এরকম একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, পিএসসি নিয়ে এত সমালোচনা, রপ্তানী বিষয়ে বিরোধীতা হচ্ছে, আমি ঐ চুক্তির কপিটা দেখতে চাই”। জ্বালানী সচিব তাকে বলেছেন “এই চুক্তি আপনাদেরকে দেখানো যাবে না”। তাহলে ভেবে দেখুন, আমাদের সংসদ, আমাদের নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান, আমাদের সংসদীয় কমিটি, তাদের চুক্তির ব্যাপারে কোন এখতিয়ার নাই। কে তাহলে নির্ধারণ করে বাংলাদেশের সম্পদের ভবিষ্যৎ? জ্বালানী সচিব কিন্তু শেষ পর্যন্ত ও সেটা দেখান নাই। অক্সিডেন্টাল যে দুর্ঘটনাটা ঘটিয়েছে বাংলাদেশে, সেই ঘটনা ঘটানোর পর লভ্যাংশ নিয়ে তারা নিজেরা দরদাম করে ইউনোক্যালের কাছে তাদের ব্যাবসাটা বিক্রি করে দিয়ে চলে গেল। পেট্রোবাংলার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল এই কেনাবেচা বিষয়ে, তারা বলেছে তারা কিছু জানে না। ইউনোক্যালও ব্যাবসা করলো কিছুদিন, তারপর তারা সেই ব্যাবসা শেভরনের কাছে বিক্রি করে দিল। এখন সেটা শেভরনের কাছে আছে। সুতরাং দায়দায়িত্ব এখন শেভরনের। তারমানে বাংলাদেশের জিনিস এই যে তারা কেচাবেচা করল এর উপর বাংলাদেশের কিন্তু কোন কন্ট্রোল নাই।

ভয়ংকর ব্যাপার এই যে এখনো পর্যন্ত এই চুক্তিগুলো গোপন। আন্তর্জাতিক ভাবে চুক্তি রিভাইসের বিধান আছে, সরকার চাইলে সেটা করতে পারে। অথচ আমাদের দেশে হচ্ছে উল্টোটা। রিভাইস হচ্ছে, কিন্তু সেটা কোম্পানীর স্বার্থে। যেমন কিছুদিন আগে, সান্টোস নামক একটা অস্ট্রেলীয় প্রতিষ্ঠানকে অনুমুতি দেয়া হল তারা আমাদের গ্যাস ইচ্ছামত দামে বিক্রি করতে পারবে যেকোন পক্ষের কাছে। সরকারের কাছে বিক্রি করতে তারা বাধ্য থাকবে না, নির্দিষ্ট দামের বাধ্যবাধকতা থাকবে না, এটা আগের পিএসসিতে ছিল না, তারা রিভাইস করেছে। রিভিশনগুলো হচ্ছে এইরকম আত্নঘাতী ধরণের।

আমরা গ্যাস সংকটে ভুগছি, আমাদের বিদ্যুৎ নাই, অথচ শেভরনের কাছে ২৫০ বিসিএফ গ্যাস এবং নাইকোর কাছে আরো ২৫০ বিসিএফ গ্যাস মোট ৫০০ বিসিএফ গ্যাস নষ্ট হয়েছে, অথচ সেটা আমরা পাচ্ছি না। এই পরমাণ গ্যাস যদি আমরা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সংগ্রহ করতে চাই, গড় দাম যদি ধরি ১০ ডলার তাহলে দাম দাঁড়ায় ৫ বিলিয়ন ডলার অর্থ্যাৎ ৩৬-৩৭ হাজার কোটি টাকা। এই বছর বাজেটে জ্বালানী খাতে বরাদ্দ আট হাজার কোটি টাকা। তারমানে প্রায় চার বছরের বাজেটেরও বেশি টাকা আমরা এই কোম্পানীর কাছেই পাই। এই টাকা আদায় তো করা হচ্ছেই না বরং তাদেরকে আরো নতুন নতুন জায়গা দেয়া হচ্ছে। লাউয়াছড়ার মত বনাঞ্চল তাদের হাতে দেয়া হচ্ছে, সুন্দরবনে তাদের প্রবেশাধিকার দেয়া হচ্ছে। এরমকম ঘটনাগুলোই যখন আমরা দেখছি সেই সময়েই কনকো- ফিলিপসের সাথে চুক্তিটি করা হল। যেকারণে আমরা ১৪ জুন ঘেরাও কর্মসূচী দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমাদের দাবীর মধ্যে কিন্তু এটাও ছিল যে শেভরনের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা আদায় করতে হবে। সরকার সবসময় বলে আমাদের পুঁজির অভাব। পুঁজির অভাব বলে যে সমস্ত কোম্পানীকে আনা হয়েছে তাদের কারণেই যত টাকা পুঁজির অভাব বলা হয়েছিল তার দশ গুণ টাকা আমাদেরকে ভর্তুকি দিতে হয়। কারণ বিদেশী কোম্পানীর কাছ থেকে আমাদেরকে বেশি দামে কিনতে হয়। তার মধ্যে রিভাইস করে যখন তাকে অধিকার দেয়া হচ্ছে আরো বেশি দামে গ্যাস বিক্রির তখন কিন্তু ভর্তুকির পরিমাণটা আরো বাড়ে। এই ভর্তুকির ফলাফলে বাজেটের উপর চাপ পড়ে, অর্থমন্ত্রী তখন বলেন ভর্তুকি কমাতে হবে, ভর্তুকি কমানোর জন্য গ্যাসের দাম বাড়ে, বিদ্যুতের দাম বাড়ে, সেই প্রভাব চাল-ডাল-আলুসহ সবকিছুর উপর পড়ে। অনেকে ভাবেন গ্যাস-তেল-কয়লা এগুলোর সাথে তার নিজের জীবনের কোন সম্পর্ক নাই। কিন্তু প্রতিদিন তার পকেট থেকে যে বাড়তি টাকা কাটা যাচ্ছে, প্রতিদিন যে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে সেটার সাথে এইধরণের চুক্তির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সেকারণে এটা শুধু গ্যাস বা কয়লা রক্ষার ব্যাপার না। আমাদের সমগ্র অর্থনীতি যে একটা ভয়ংকর বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে সেটা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এই জন্য এই ইস্যু গুলোকে আমরা সামনের দিকে আনছি। কনোকো ফিলিপসের সাথে এই চুক্তি আমাদেরকে আরো ভয়াবহ একটা অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কারণটা হল এটা সমুদ্রের মধ্যে। আমরা কিন্তু এখনো জানিনা আমাদের বঙ্গোপোসাগরে কি বিশাল সম্পদ আছে। সমুদ্রে এখনো অনেক অজানা সম্পদ আছে। বিবিসিতে একবার একটা আলোচনা শুনলাম, সেখানে আন্তর্জাতিক জ্বালানী বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করছেন “তেলের ভবিষ্যত কি” এই বিষয় টা নিয়ে? একজন বিশেষজ্ঞ বলছিলেন, তেলের ভবিষ্যত নিয়ে তেমন সংকটের সম্ভাবনা নাই। সামনে কিছু ভাল মজুদ আছে, একটা আলাস্কা, আরেকটা ‘বে অব বেঙ্গল’। অর্থ্যাৎ বঙ্গোপসাগর তাদের সাংঘাতিক মনোযোগের মধ্যে আছে। এই কথাটা শুনে আমার আনন্দিত হওয়ার কথা ছিল, আমি কিন্তু আনন্দিত হতে পারি নাই। আমার কাছে মনে হল এই যে সম্পদের খবরগুলো আসছে এগুলোর সম্ভাবনা বাড়া মানে হল আমাদের বিপদ বাড়া। যাদের দায়িত্ব এগুলোকে জনগণের স্বার্থে কাজে লাগানোর, সেই জায়গাটাতেই বড় ধরণের সমস্যা। সমস্যাটা এমন যে সম্পদ বেশি হওয়া মানেই আমাদের বিপদ বৃদ্ধি পাওয়া। এবং সেটারই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। গ্যাস অনুসন্ধানই হোক, আর সীমানা নির্ধারণই হোক, মায়ানমার, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, এইসমস্ত রাষ্ট্রের যে তৎপরতা বঙ্গোপসাগর নিয়ে এবং সেইসাথে আমাদের সরকারগুলোর যে ভূমিকা দেখতে পাচ্ছি তাতে আমাদের ভবিষ্যত খুবই বিপদাপন্ন। বঙ্গোপসাগরে বিশাল সম্পদ আছে সেটাকে ২৮ টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে তার মধ্যে দুটি ব্লক কনোকো ফিলিপসকে দেয়া হচ্ছে। সেই দুটো ব্লকে যে কাঠামোতে চুক্তি করা হচ্ছে সেটা হচ্ছে পিএসসি ২০০৮(প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট-২০০৮) এর অধীনে। মালিকানা কাদের থাকবে, উত্তোলিত গ্যাসের শেয়ার, বা গ্যাস ছাড়া অন্য কোন সম্পদ যদি পাওয়া যায় সেটার মালিকানার ধরণটা কি হবে, সেটার কস্ট টা কিভাবে ডিস্ট্রিবিউশন হবে, মুনাফা কিভাবে ডিস্ট্রিবিউশন হবে, উঠানোর পরে গ্যাসটা কোথায় বিক্রি করা হবে, রপ্তানীর বিধান থাকবে কিনা সেগুলো এই পিএসসির মধ্যে আছে। কিছু কিছু জিনিস অস্বচ্ছ- যেমন গ্যাস ছাড়া অন্য কোন সম্পদ থাকলে সেইসব বিষয়ে অস্বচ্ছতা আছে। পরিষ্কারভাবে যেটা আছে, যেটা বাংলাদেশের জন্য বিপদ সেটা হল, কস্ট রিকভারী এবং প্রফিট শেয়ারিং হওয়ার পরে বাংলাদেশ তার অংশ পাবে। তবে কোনভাবেই বাংলাদেশ ২০% এর বেশি গ্যাস পাবে না। এবং সেই গ্যাসটা স্থলভাগে আনতে হলে বাংলাদেশের নিজের অবকাঠামো তৈরী করে আনতে হবে। স্থলভাগের অবকাঠামো নির্মাণ খরচ আর সমুদ্র থেকে স্থলভাগ পর্যন্ত অবকাঠামো নির্মাণ খরচ তো একই বিষয় নয়। এই অবকাঠামো বলতে পাইপ লাইন তৈরী করতে হবে গ্যাস আনার জন্য যা একটা বিশাল ব্যয়সাধ্য ব্যাপার। আর ৮০% গ্যাস তারা পেট্রোবাংলাকে অফার করবে কেনার জন্য। পেট্রোবাংলা না কিনলে সেটা এলএনজি(তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) করে বিদেশী রপ্তানী করবে এই বিধান রয়েছে পিএসসি ২০০৮ এ। বাংলাদেশ যদি দেখে ২০% গ্যাস আনার খরচ পুরো গ্যাসের দামের চাইতে অনেক বেশি তখন বাংলাদেশ হয়ত সেটা আনবে না। তখন পুরো গ্যাসের মালিকানা পাবে কনোকো ফিলিপস। সবমিলিয়ে রপ্তানীর একটা অত্যন্ত অনুকূল একটা পরিবেশ এই বিধানে রাখা হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টন কিছুদিন আগে একটা গবেষণা করে তা প্রকাশ করেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে গ্যাসের চাহিদা, সেই চাহিদা পূরণের জন্য কোন জায়গা থেকে এবং কিভাবে গ্যাস আনলে সেটা ইকোনমিক হবে। এই জরিপটা করা হয়েছে এলএনজি করে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানী করা কতটা যুক্তিসঙ্গত তার উপর। এই জরিপের জন্য অর্থায়ন করেছে যে কোম্পানী তার নাম কনকো ফিলিপস। স্টাডি রিপোর্টে বলা হচ্ছে যে আর ১৫ বছরের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাসের যে ঘাটতি তার পরিমাণ হবে ৪ থেকে ৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এবং সেটা দূর থেকে যদি এলএনজির মাধ্যমে আনা হয় সেটাই হবে সবচেয়ে কস্ট ইফেকটিভ। কনোকো ফিলিপস যে দুইটি ব্লকে অনুসন্ধান কাজ শুরু করতে যাচ্ছে ধারণা করা হচ্ছে সেখানে কমপক্ষে প্রায় চার টিসিএস গ্যাস থাকবে।

মজুদের ব্যাপারটা আমরা বুঝতে পারি বিভিন্ন অঞ্চলে স্যাটেলাইট ইমেজিং এর মাধ্যমে একটা প্রাথমিক ধারণা করে। এরপর সুনির্দিষ্ট করার জন্য অনুসন্ধান করা হয়। এখন ঐ দুইটা ব্লকে গ্যাস আছেই এটা প্রাথমিকভাবে মোটামুটিভাবে নিশ্চিত কিন্তু কোন পয়েন্টে গ্যাস আছে সেটা নিশ্চিত না। একটা জায়গায় অনুসন্ধান করলেই গ্যাস পাওয়া যাবে তা নয়। কয়েকটা জায়গায় অনুসন্ধান করলে একটা জায়গায় পাওয়া যেতে পারে।
বলা হচ্ছে যে মার্কীন কোম্পানীটি একটি বিপুল পরিমান অর্থ বিনিয়োগ করবে, ফলে তার অংশ একটু বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। এটা আসলে কস্ট নিয়ে তৈরী করা এক ধরণের মিথ । মিথটা এরকম যে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিপুল টাকা লাগে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা তা নয়। কনোকো ফিলিপস প্রাথমিক যে অনুসন্ধান করবে তার বাজেটটা তাদের ওয়েবসাইটে দেয়া। এর পরিমাণ- পাঁচ বছরের জন্য ১১০ মিলিয়ন ডলার অর্থ্যাৎ বাংলাদেশী টাকায় ৭৭০ কোটি টাকা। গড়ে বছরে ২০০ কোটি টাকারও কম। বাংলাদেশের জন্য এই টাকা কোন টাকাই না। । সবচেয়ে বড় কথা, পৃথিবীতে এই ধরণের কাজ করার একক সক্ষমতা আছে এমন কোন প্রতিষ্ঠান আদতে নাই। বিপি আমেরিকার ব্যাপারটা দেখলে তা স্পষ্ট হয়। দুর্ঘটনার পর অনুসন্ধানে দেখা গেছে কোন কাজ বিপি আমেরিকা নিজে করেনি, সবই বিভিন্ন কোম্পানীকে সাব-কন্ট্রাক্ট দিয়েছে। বাংলাদেশেই সাঙ্গুর পাশে ড্রিলিং এর জন্য সান্তোস চুক্তিবদ্ধ হয়েছে নরওয়ের একটা ড্রিলিং কোম্পানীর সাথে। আমরাও সেরকম নিজেদের মালিকানায় সাব-কন্ট্রাক্ট দিতে পারতাম। চুক্তিটা হওয়ার ফলে প্রকৃতপক্ষে কনোকো ফিলিপসের আন্তর্জাতিকভাবে একটা গুরুত্ব তৈরী হবে কারণ বঙ্গোপসাগর সে পাচ্ছে। তার শেয়ারের মূল্য বেড়ে যাবে, সে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে, বিভিন্ন ফান্ডিং এজেন্সি তার সাথে আসবে এবং পরবর্তীতে সে বিভিন্ন কোম্পানীকে সাব-কন্ট্রাক্টে এসব কাজ দিয়ে দেবে। আমরা জাতীয় মালিকানার কথা বলি তার মানে এই না যে সব কাজ নিজেরা করা। এটা কোন দেশ পারেনা। এমন কোন দেশ নাই যারা শতভাগ কাজ নিজেরা করতে পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল মালিকানা। দুটো বিষয়কে আমরা সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, প্রথমটি হচ্ছে জাতীয় মালিকানা, যেহেতু এই সম্পদ সীমিত ও অনবায়নযোগ্য সেহেতু তা নিজেদের হাতে রাখা। দ্বিতীয়ত, জাতীয় মালিকানায় থাকলে আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী সাব-কন্ট্রাক্ট দিতে পারব এবং আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী উত্তোলন করতে পারব। আর বহুজাতিক কোম্পানী কি করবে? সে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ইনভেস্ট করবে, যতদ্রুত সম্ভব গ্যাস উত্তোলন করে মার্কেটাইজ করে প্রফিট রিয়ালাইজ করবে। আর আমাদের জন্য দরকার বিদ্যুতায়ন ও শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী উত্তোলন ও ব্যবহার। মালিকানা যদি আমাদের হাতে থাকে তাহলে আমরা বিদেশী কোম্পানী বা বিদেশী এক্সপার্ট ভাড়া করে আমাদের প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত করে অনুসন্ধান করতে পারি, উত্তোলন করতে পারি। তাহলে গ্যাস সম্পদটাও আমাদের হাতে থাকল সেই সাথে বিশেষজ্ঞও তৈরী হতে থাকল। আমরা তখন আন্তর্জাতিক ভাবেও প্রতিযোগীতা করতে পারব। এখন কনোকো ফিলিপস যেখানে অনুসন্ধান করবে সেখানে গ্যাস ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া গেল কিনা সেটা মনিটরিং কে করবে? স্বাধীনতার ৪০ বছর পর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা অনেক ভূতত্ত্ববিদ যখন বলেন আমাদের দেশে এক্সপার্ট নাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে আমি তখন লজ্জা বোধ করি, ভাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করি কি আমরা অদক্ষতা তৈরীর জন্য নাকি দক্ষ জনশক্তি তৈরীর জন্য? তাহলে আমরা শিক্ষকতা করছি কেন?

আমরা আগে ভাবতাম আমরা অনসোরে এক্সট্রাকশনই করতে পারি না, কিন্তু এখন তা করছি, রিগ কেনা হয়েছে। ১৯৭৪ সালে পেট্রোবাংলা প্রতিষ্ঠিত হয়, এটা ছিল একটা গুরুত্বপুর্ণ সিদ্ধান্ত। জ্বালানী উপদেষ্টা, বিভিন্ন কনসালটেন্ট, বিভিন্ন বিদেশী কোম্পানী যারা এখন বলছে আমাদের সক্ষমতা নাই, এই দৃষ্টিভঙ্গি যদি ১৯৭৪ সালে থাকত তাহলে কি হত? কারণ তখনতো আসলেই কিছু ছিল না। কিন্তু পেট্রোবাংলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতীয় দায়িত্ববোধ থেকে। এবং এটা প্রতিষ্ঠার কারণে আশি দশকে আমাদের একটা অবকাঠামো, একটা ভিত্তি তৈরী হয়েছে, বেশ কিছু জনশক্তি তৈরী হয়েছে। তৈরী হওয়ার ফলে ১৯৯৮ সালে বিদেশী কোম্পানী আসার আগে পর্যন্ত শতভাগ গ্যাস কিন্তু জাতীয় প্রতিষ্ঠানই উত্তোলন করেছে। এখনো করতে পারে যদি তাদেরকে সেই সুযোগটা দেয়া হয়। দেয়া হয়নি। দক্ষতা এবং সক্ষমতা প্রথমেই আসে সিদ্ধান্ত থেকে। প্রথম দফা ৯৩-৯৪ সালে বিএনপির সময়ে, পরবর্তীতে ৯৭-৯৮ সালে দ্বিতীয় দফা বিডিং এর মাধ্যমে স্থলভাগেরই অনেকগুলো ব্লক বিদেশী কোম্পানীকে দিয়ে দেয়া হয়। যার ফলে প্রতিবছর আমাদেরকে দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, গ্যাসের দাম বাড়ছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ছে।

এই সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলতেও চেয়েছি কিন্তু তার সুযোগ কখনো হয়নি। প্রধানমন্ত্রী বরাবরে আমরা আমাদের সমস্ত কাগজপত্র, সমস্ত বক্তব্য পাঠিয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সাথে আমরা খোলামেলা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। বিষয়টা তো এমন নয় যে আমরা গোঁয়ার্তুমি করতে চাই, সেটা নিঃসন্দেহে অপ্রয়োজনীয়।
অনেকেই বলেন- এক্সপার্টরা কিছু বলছেন না, আপনারা কেন এত কথা বলছেন। আমিতো দেখি যারা কোন কোম্পানীর সাথে যুক্ত নন বা বিদেশী কোম্পানীর কনসালটেন্সি করেন না তারা ছাড়া প্রত্যেকে পিএসসি ২০০৮ বা রপ্তানীমুখী চুক্তি, কিংবা উন্মুক্ত কয়লা খনির বিরোধিতা করেন। সেই বিশেষজ্ঞদের কথা যদি সরকার শোনে তাহলে সম্পুর্ন চিত্রটা কিন্তু অন্যরকম হয়। এবং কয়েকদিন আগে বুয়েটের প্রবীণ শিক্ষক ড. নুরুল ইসলাম যিনি এই পিএসসির বিরোধীতা করে আসছেন তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন । তার উদ্বেগ প্রকাশের পর পত্রিকায় দেখলাম অর্থমন্ত্রী বিষয়টা সমন্ধে জানতে চেয়েছেন। কিন্তু জিনিসটা কিন্তু মন্ত্রী পরিষদ হয়েই গেছে। এমন হতে পারে কেউ দেখছেন না যে কি জিনিস যাচ্ছে। হতে পারে এর পেছনের শক্তি এত বড় যে মন্ত্রীও দেখছেন না তিনি কি ফাইলে সাইন করছেন। প্রধানমন্ত্রী কতটা জেনেশুনে এটা করছেন আমরা জানিনা। সংসদীয় কমিটিই যেমন আমাদেরকে বলেছে যে তারা রপ্তানী করবেন না কারণ আমাদের অভ্যন্তরীন প্রয়োজন রয়েছে। আমরা বলেছি- ধরে নিলাম আপনারা ভাল মানুষ আপনারা রপ্তানী করবেন না, কিন্তু আপনারা তো চিরদিন ক্ষমতায় থাকবেন না। আপনি চুক্তির মধ্যে রপ্তানীর সুযোগ রাখছেন অতএব সে যদি বেটার অপশন পায় সে তো রপ্তানী করবেই। এবং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখে এসেছি যে জ্বালানী মন্ত্রণালয় বহুজাতিক কোম্পানী যেভাবে চায় সেভাবেই কাজ করে। সেক্ষেত্রে আপনারা যদি আসলেই মনে করেন যে রপ্তানী করবেন না তাহলে রপ্তানীর বিধানটাকেই বাদ দিয়ে দিচ্ছেন না কেন। অথবা ‘খনিজ সম্পদ নিষিদ্ধকরণ আইন’ এর বিল আমরাই তৈরী করে দিচ্ছি, সেটা পাশ করান। তাহলে পরে খারাপ লোকেরা আসলেও রপ্তানী করতে পারবে না। তাহলে এক ধরণের আস্থা তৈরী হয় যে হা আসলেই আপনার রপ্তানী করবেন না। দুই বছর হল সেটা পড়ে আছে, সেটা নিয়ে কোন আলোচনা হয় নাই, কোন সিদ্ধান্ত হয় নাই।

কিছু সংখক লোক যারা এই চুক্তি করে সুবিধা পাচ্ছে, কমিশন পাচ্ছে কিংবা কনসালটেন্সি ফী পাচ্ছে তারা বাদ দিয়ে আওয়ামীলীগের সমর্থক হোক আর বিএনপির সমর্থক হোক যদি বিদ্যুতের দাম বাড়ে, গ্যাসের দাম বাড়ে, যদি শিল্পায়ন না হয়, বাংলাদেশের সমস্ত ক্ষেত্রে যদি ভর্তুকির চাপ বাড়ে, অন্যান্য সব ক্ষেত্র- শিক্ষা-চিকিৎসা সব বিপর্যস্ত হয় তাহলে প্রত্যেকটা মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। সেজন্য আমরা মনে করি এটা একটা জাতীয় আন্দোলন। ১৪ তারিখের ঘেরাওয়েও আমি অনেক প্রবীণ মানুষ দেখেছি যাদেরকে আমি চিনি না। তারা নিজেদের আগ্রহ থেকে এসেছেন। অনেকের চিঠি, ফেসবুক বা ইমেইলের মাধ্যমে পাঠানো বার্তা সবকিছু থেকে আমি অনুভব করি যে এই আন্দোলনের প্রতি একটা জনসমর্থন আছে। এমনকি আওয়ামীলীগ বা বিএনপিরও অনেক মানুষ আছে যারা এটাকে সমর্থণ করেন। এর একটা ‘জাতীয়’ ধরণ আছে। যারা এটা অনুভব করেন তারা এসেছেন। রেহনুমা আহমেদ হচ্ছেন তাদের মধ্যে একজন অগ্রণী মানুষ এবং বিশেষজ্ঞ। অনেক তরুণ নারী পুরুষ ছিলেন সেখানে। সেইরকম একটা আন্দোলন যেটা পরিষ্কার একটা জাতীয় স্বার্থের বিষয় সেখানে সরকারের এই বাধা পরিষ্কার একটা মেসেজ দিতে চাচ্ছে যে কনোকো ফিলিপস বা বিদেশী কোম্পানী অনেক বেশি গুরুত্বপুর্ণ। এই কোম্পানীর সম্মান তার রক্ষা করতে হবে, তার সাথে চুক্তি করতে হবে। ফুলবাড়ীতে একজন কৃষক ক্ষুব্ধ হয়ে একবার বলেছিলেন, ভোট কি আমরা দেই নাকি কোম্পানী দেয়? ভোটতো আমরা দেই তাহলে সরকার আমাদের কথা কেন শুনবে না? সেই কৃষক যে প্রশ্নটি উত্থাপন করেছে সেটা আমারো প্রশ্ন, এটা একটা মৌলিক প্রশ্ন। কারণ জনগণ আপনাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে, কনোকো ফিলিপস তো ভোট দেয়নি।

শেখ হাসিনা বলেছিলেন যে গ্যাস রপ্তানীর বিষয়ে মুচলেকা দিয়ে আগের সরকার সরকার ক্ষমতায় গিয়েছিল। এই ব্যাপারে শেখ হাসিনার সাথে আমি একমত। এটা হওয়া খুবই সম্ভব। ক্ষমতায় যাওয়ার দুইদিন পর তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন যে যদি মাছ-চা-চামড়া রপ্তানী করতে পারি তাহলে গ্যাস রপ্তানী করতে সমস্যা কি? বোঝাই যায় যে তাদের একটা কমিটমেন্ট ছিল। এখন যখন এই সরকার আগের সরকার বিষয়ে এই কথা বলছে আমি কিন্তু সেটা বিশ্বাস করছি যে হ্যা এটা হওয়া খুবই সম্ভব। এবং তারপর যখন এই সরকার একই কাজ করতে যাচ্ছে তখন কি আমার মনে প্রশ্ন আসবে না যে তাহলে কি এই সরকারও মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে যে ভয়াবহতার মধ্যে আমরা প্রবেশ করতে যাচ্ছি তা হল, পুরো বঙ্গোপসাগর অঞ্চল যার আয়তন বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুন। ভারত একটা অংশ দাবী করছে, মায়ানমার একটা অংশ দাবী করছে। ভারতের অংশে অনুসন্ধান করবে না কনোকো ফিলিপস। তারমানে ভারত একটা অংশ নিয়ে যাবে, মায়ানমার একটা অংশ নেবে, আর যে অংশটুকু বিরোধহীন ভাবে বাংলাদেশের সেটুকু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে যাবে। তাহলে আমাদের জন্য কি থাকবে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা দুনিয়াতে যা করছে তাতে কিছুদিন পরেই তারা বলবে আমার দেশের কোম্পানী এখানে আছে, তাদের নিরাপত্তার জন্য এখানে মার্কিন নেভি থাকতে হবে। সব মিলিয়ে আমরা শুধু যে গ্যাস বা খনিজ সম্পদ হারাবো তাই নয়, আমরা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকেই হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছি।

এর আগে যখন আমাদের মিছিলের উপর হামলা করা হয়েছিল তখন বিএনপি এই হামলার নিন্দা জানিয়েছিল, আমাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন। সমর্থনের প্রশ্নটি যখন এসেছে, সাংবাদিকরা যখন জানতে চেয়েছে বিএনপি সমর্থন দিলে আমরা নেব কিনা, তখন আমি পরিষ্কার বলেছি যেকোন দল যদি আমাদেরকে সমর্থন দেয় আমরা নেব। কিন্তু, বিএনপি নিজের আমলে এধরণের চুক্তি করেছে, সুতরাং বিএনপি কে পাবলিকলি বলতে হবে যে তারা চুক্তি করে ভুল করেছে, জাতীয় স্বার্থবিরোধী কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতে এধরনের চুক্তি করবে না। এটা যদি পরিষ্কারভাবে পাবলিকলি বলে তাহলে আমাদের কোন সমস্যা নাই। কারণ আমরা তো একটা নির্দিষ্ট দাবী, নির্দিষ্ট ইস্যুকে ধরে অগ্রসর হচ্ছি। সেই ইস্যুতে পরিষ্কার যারা থাকবে তাদের সাথেই আমাদের ঐক্য হতে পারে। এখন আওয়ামীলীগে অনেকেই আছেন, মন্ত্রী হিসেবেও আছেন, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানও আছেন তারাতো জাতীয় কমিটির সাথে ছিলেন, কাজ করেছেন। এবং নির্দিষ্ট ইস্যুর ভিত্তিতেই কাজ করেছেন। তাদের কমিটমেন্ট থেকে তারা সরে গিয়েছেন, আমরা তো সেই কমিটমেন্ট নিয়েই কাজ করছি।
বঙ্গোপসাগরের মত এত বড় একটা জিনিস, এখানকার সম্পদ বিদেশীদের হাতে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে সরকার এক্ষেত্রে নেতিবাচক ভূমিকা নিচ্ছে। তারা কনোকো ফিলিপস বা মার্কিনদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছে। এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আছে, ভারত আছে, অর্থ্যাৎ বিভিন্ন দেশ যুক্ত হয়ে আছে এবং তাদের সহযোগী হিসেবে সরকার তাদের ইন্টারেস্ট নিয়ে কাজ করছে। জাতীয় কমিটি রাষ্ট্র ক্ষমতা নিয়ে ক্ষমতার লড়াই করছে না- এটা জাতীয় কমিটির এজেন্ডার মধ্যে নাই। আমরা মনে করি যে কাজ আমরা করছি সেটা কোন দলীয় বিষয় নয়, এটা জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় সার্বভৌমত্বের লড়াই। এখন এই অবস্থায় আমাদের ভরসা শুধুমাত্র একদিকে তথ্য-যুক্তি, আরেকদিকে জনগণের শক্তি।