anu11আনু মুহাম্মদ। অর্থনীতিবিদ ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা আন্দোলনের অন্যতম নেতা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করছেন দীর্ঘদিন যাবৎ। পাশাপাশি তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব হিসেবেও নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। লেখক এবং বিশ্লেষক হিসেবেও তার  খ্যাতি রয়েছে। তার প্রকাশিত অসংখ্য বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ বিশ্ব পুঁজিবাদ ও বাংলাদেশের অনুন্নয়ন, পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণ ও অনুন্নত বিশ্ব, বাংলাদেশের অর্থনীতির চালচিত্র, বাংলাদেশের তেল-গ্যাস : কার সম্পদ কার বিপদ, প্রভৃতি। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সাপ্তাহিক-এর মুখোমুখি হন তিনি। কথা বলেন শেয়ারবাজার, বিডিআর বিদ্রোহের বিচার, মধ্যপ্রাচ্যে আন্দোলন, বাংলাদেশের অর্থনীতি, ভারত ও বিশ্বব্যাংকের ঋণ, বিরোধীদলের রাজনীতিসহ আরো অনেক বিষয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিস রায়হান।

সাপ্তাহিক :
শেয়ার বাজারের অবস্থাকে কিভাবে দেখছেন?
আনু মুহাম্মদ : শেয়ারবাজারের আজকের অবস্থাটা খুব আকস্মিক কিছু নয়। বাংলাদেশে এমনিতেই শেয়ারবাজার ততটা পরিণত নয়, এটা আমরা সবাই জানি। শেয়ারবাজারে হঠাৎ ধস নামা বা বিনিয়োগকারীদের সর্বস্বান্ত হওয়ার ঘটনাও এ বছরই প্রথম নয়। ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজার এতটা বিস্তৃত ছিল না। কিন্তু তখনও ধস নামে, কিছুসংখ্যক লোক বিশাল মুনাফা করে এবং ব্যাপক বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয়। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, তখনকার সরকার একটি তদন্ত কমিটি করতে বাধ্য হয়। তদন্ত কমিটির বিপোর্টের কাজ শেষ হওয়ার খবর আসলেও তাদের সেই রিপোর্ট এখনো প্রকাশিত হয়নি। রিপোর্টটি প্রকাশিত হলে জনগণ জানতে পারত কি কারণে এত বড় ধস নেমেছিল। কিন্তু জনগণকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে। যারা এর পেছনে যুক্ত ছিল তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। রিপোর্ট প্রকাশে বাধা দিয়ে লুণ্ঠনকারীদের রক্ষা করা হয়েছে। সেই লুণ্ঠনকারীরাই এখন দলে এবং বলে বেড়ে আবার শেয়ারবাজারে হামলে পড়েছে। ফলে পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে, ১৯৯৬ সাল পরবর্তী সময়ে যারা ক্ষমতায় ছিল তারা কেউই শেয়ারবাজারের দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করতে বা বিচার করতে আগ্রহী না। এ সরকারের আমলেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।
এবার যে তদন্ত কমিটি হলো তারাও কিছু করতে পারবে বলে আমরা আশাবাদী হতে পারছি না। অনেকের নামে অভিযোগ উঠছে কিন্তু কারো বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বর্তমান তদন্ত কমিটির প্রধান দায়িত্ব নেয়ার আগে বলেছিলেন, এবারের ধসের জন্য ওরা ১১ জন দায়ী। এ ১১ জন কারা তা তিনি এখনো স্পষ্ট করতে পারেননি। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন এর মধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি উভয় পক্ষেরই লোক আছে। অবস্থাদৃষ্টে এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে যে, ঘটনা যাই ঘটুক না কেন এ ধরনের অপতৎপরতা সংঘটনের ক্ষেত্রে দুই দলের ঐক্য খুব মজবুত।

সাপ্তাহিক : বাংলাদেশের শেয়ার বাজার পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনৈতিক অবস্থার প্রভাব কতটুকু?
আনু মুহাম্মদ : শেয়ারবাজারের এই যে ধস এটা বাংলাদেশের একক কোনো বিষয় না। শেয়ারবাজার ব্যাপারটাই এখন সারা পৃথিবীতে ফটকাবাজারি ব্যবসা হিসেবে বিস্তৃতি পাচ্ছে। বাস্তব অর্থনীতি তথা উৎপাদন সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কার্যক্রমের চাইতে সারা বিশ্বেই এখন ফটকাবাজারি অর্থনীতি তথা উৎপাদন থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু টাকা দিয়ে টাকা বাড়ানোর ব্যবসাগুলোর মাত্রাই বেশি। বড় পুঁজিবাদী দেশগুলোতে উৎপাদনের একটি শক্ত ভিত্তি আছে। এ ধরনের দেশগুলোতে ধস নামলে যতটুকু প্রভাব পড়ে, বাংলাদেশে ধসের প্রভাব তারচেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে। এর কারণ বাংলাদেশে উৎপাদনের ভিত্তি অনেক দুর্বল।
সাধারণত তাত্ত্বিকভাবে বলা হয় যে, শেয়ারবাজারের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা জনগণের কাছ থেকে পুঁজি সংগ্রহ করে এবং পরবর্তীতে জনগণকে সেই পুঁজির লভ্যাংশ বিতরণ করে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, শেয়ারবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা উৎপাদনের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত নয়। নিয়মিত তাদের এজিএম হয় না। শেয়ারধারীদের তারা কোনো লভ্যাংশ দেয় না। কিন্তু তারাই বিরাট আকারে মুনাফা করছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির প্রতিষ্ঠানের নামেও এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে। সালমান এফ রহমানের কথা ১৯৯৬ সালে শোনা গিয়েছিল। এখনো শোনা যাচ্ছে। তার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ফালুর নাম। এ সময়ে এসে দুই প্রধানমন্ত্রীর দুই ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির নাম শোনা যাচ্ছে শেয়ারবাজারের কেলেঙ্কারি নিয়ে। এসব তথ্য এবং বর্তমান ঘটনাবলি প্রমাণ দিচ্ছে যে, তত্ত্ব বা নিয়ম অনুযায়ী পুঁজিবাজার চলে না। পুঁজিবাজার চলে পুঁজিপতিদের আঙুলি হেলনিতে। পৃথিবীর অন্য দেশগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়।

সাপ্তাহিক : এ পরিস্থিতির কারণ কি? সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কী ভূমিকা রেখেছে?
আনু মুহাম্মদ : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জিডিপি এখন যত, বিভিন্ন হিসেবে দেখা যায় তার অর্ধেকই চোরাই টাকা বা কালো টাকা। এই চোরাই টাকার একটি বড় ক্ষেত্র হচ্ছে শেয়ারবাজার। এর বাইরে শেয়ারবাজারে এসে যুক্ত হচ্ছে প্রবাসী আয়ের (রেমিটেন্সের) টাকা। সরকার উৎপাদনশীল খাতে প্রবাসী আয়ের টাকা কাজে লাগানোর জন্য কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। চোরাই টাকা এবং প্রবাসী আয়ের টাকা মিলে শেয়ারবাজারে মুদ্রা সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়েছে। চাহিদার তুলনায় কিন্তু উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়েনি বা উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের সংখ্যা বাড়েনি। চাহিদা ও যোগানের ঠিক মাঝখান দিয়ে কিছু ক্ষমতাশালী লোক প্রভাব বিস্তার ও তথ্য বিকৃতির মাধ্যমে বিপুল টাকা লুণ্ঠনের সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে।
বাংলাদেশে বিত্তবান শ্রেণীর ক্ষুধা অনেক বেশি। যেভাবে তারা সম্পদ সংগ্রহ ও সঞ্চয় করে পুঁজি বাড়ায় তার মূল ধরনটাই হচ্ছে লুণ্ঠন করা, দখল করা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করা এবং ব্যাপকভাবে জনগণের সম্পদ চুরি করার সমস্ত সুযোগকে কাজে লাগানো। শেয়ারবাজারও তার একটা অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারীর মধ্যে যে ২৫ লাখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের যেমন কোনো দলীয় পরিচয় নাই তেমনি লুণ্ঠনকারীদেরও দলীয় পরিচয়টা মুখ্য নয়। যেহেতু প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সকলেই এ ধরনের লুণ্ঠনকারীদের প্রশ্রয় দিয়ে থাকে সেহেতু রাজনৈতিক কোনো ব্যবধান এখানে নেই। এখানে আছে শুধু পুঁজির ব্যবধান, মালিকানার ব্যবধান, ক্ষমতার ব্যবধান।
সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাজ হচ্ছে শেয়ারবাজারের ত্রুটি-বিচ্যুতি, অনিয়ম অনুসন্ধান করা, তত্ত্বাবধান করা। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণকারী (রেগুলেটরি) সংস্থা হিসেবে তাদের কাজ করার কথা। কিন্তু আমরা এখানেও দেখছি তত্ত্ব আর বাস্তব এক না। যারা নিয়ন্ত্রণ করার কথা তারাই যদি দুর্বৃত্ত তৎপরতায় নিয়োজিতদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তাহলে অবস্থাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? নিয়ন্ত্রক যদি বিশেষ কোনো গোষ্ঠী দ্বারা প্রভাবিত বা পরিচালিত হয় তাহলে সে নিজেই কিন্তু দূষিত হয়ে যায়। এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রণকারী আর নিয়ন্ত্রণকার্য চালাতে পারে না। সে হয়ে ওঠে ওই বিশেষ গোষ্ঠীর এজেন্ট বা প্রতিনিধি। এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হয়ে উঠে দুর্বৃত্তকারী সংস্থারই সম্প্রসারিত অংশ। একেই বলে শর্ষের ভেতরে ভূত। এসইসির ক্ষেত্রেও এমনটাই হচ্ছে। যে কারণে ১৯৯৬ সালের ধসের তদন্ত রিপোর্ট আজো মেলেনি এবং এবারের ধসের তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে তাত্ত্বিকভাবে শেয়ারবাজার চালানোর কথা যেভাবে বলা হয় সেভাবে চালানো যাবে না।

সাপ্তাহিক : বিডিআর বিদ্রোহের বিচার যেভাবে করা হচ্ছে সে সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?
আনু মুহাম্মদ : বিডিআর বিদ্রোহ এবং এর মধ্যে যে হত্যাকাণ্ড পুরো বিষয়টা এখন পর্যন্ত অস্বচ্ছ। বিচারের একটা পর্যায়ে আমরা দেখলাম বিষয়টা প্রকাশ্যে ঘটছে। কিন্তু এর আগে রিমাণ্ডে বা অন্যত্র যেভাবে বিডিআর সদস্যদের কাছ থেকে বক্তব্য আদায় করা হয়েছে বা যেভাবে পুরো জিনিসটা সাজানো হয়েছে তা কিন্তু প্রকাশ্য ছিল না। এ কারণে অনেক সত্য গোপন থেকে যেতে পারে বলেই আমি মনে করছি। পুরো ঘটনাটা কিভাবে ঘটল, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত, এর পেছনে কারা কাজ করেছে তা এখন পর্যন্ত মানুষ জানতে পারেনি। বিডিআর সদস্যদের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে কেন্দ্র করে পুরো বিডিআরকে একটা বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। বিডিআরের বহু সদস্য যারা কিনা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল না তাদের জীবনও তছনছ হয়ে গেছে। অনেকের খবর আমরা এখন পর্যন্ত জানি না।

সাপ্তাহিক : বিডিআর মহাপরিচালক তো চাকরিচ্যুতদেরও নজরদারিতে রাখার কথা বলছেন...
আনু মুহাম্মদ : বিডিআর মহাসচিব যা বলেছেন তাতে পুরো বিডিআরকে অপরাধীকরণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আমি মনে করি, বিডিআর বিদ্রোহ আর পিলখানায় হত্যাকাণ্ড দুটো আলাদা জিনিস। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিল তারা অবশ্যই অপরাধী। তাদেরকে খুঁজে বের করাটা কঠিন ছিল না। তাদের সংখ্যাও বেশি না। তাদেরকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করাটা যথেষ্ট সম্ভব ও জরুরি ছিল। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সারা দেশের বিডিআর সদস্যদের অভিযুক্ত করা, তাদেরকে সমস্যায় ফেলাটা ঠিক হয়নি।
পিলখানার বাইরে সারা দেশে যে বিক্ষোভ হয়েছিল তার যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল। বাহিনী হিসেবে ধরলেও তাদের অপরাধ ছিল, তারা কমান্ড অস্বীকার করেছে। কিন্তু কেন তারা কমান্ড অস্বীকার করেছে তা তদন্ত হওয়া দরকার। তাদের কি অভিযোগ আছে তাও শোনা দরকার। কিন্তু এখন যে প্রক্রিয়ায় বিচার হচ্ছে, আমার ধারণা তাতে অনেকেই সন্তুষ্ট না। এ প্রক্রিয়ায় সবাই সুবিচার পাচ্ছে কিনা তাও আমি নিশ্চিত না। এ নিয়ে আমার নিজেরই অনেক প্রশ্ন রয়েছে।

সাপ্তাহিক : মধ্যপ্রাচ্যের আন্দোলন সংগ্রামকে কিভাবে দেখছেন?
আনু মুহাম্মদ : মধ্যপ্রাচ্যের আন্দোলন সারা বিশ্বসহ বাংলাদেশের জনগণের জন্যও ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন যাবৎ প্রথমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, পরবর্তীতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পুরোপুরি করতলগত হয়েছিল। করতলগত রাখার জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ দশকের পর দশক দেশগুলোতে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে। তা জেনারেল আকারে হোক বা রাজা-বাদশাহ, আমীর-উমরাহ আকারে হোক। এদেরকে ক্ষমতায় রেখে সাম্রাজ্যবাদীরা ওই দেশগুলোর জনগণের জীবন দুর্বিষহ করেছে। পাশাপাশি ওই অঞ্চলের বিভিন্ন খনিজ সম্পদ, বিশেষত তেল সম্পদের ওপর তাদের দখলদারিত্ব কায়েম করেছে। ব্যাপক আকারে লুণ্ঠন চালিয়েছে, সম্পদ পাচার করেছে। আবার এ অঞ্চলে ইসরাইলকে প্রতিষ্ঠা করে এক ধরনের অস্থিতিশীল অবস্থা এবং নিরাপত্তার সঙ্কট তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তারা অস্ত্র বিক্রি ব্যবসার পথ প্রশস্ত করেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি এখনো বিরাজমান।
কিছুদিন আগে সৌদি আরবের কাছে প্রচুর পরিমাণে অস্ত্র বিক্রি করা হয়েছে। সৌদি আরব এসব অস্ত্র কাদের ওপর ব্যবহার করবে? ইসরাইলের ওপর তো নয়, বরং ইসরাইলকে রক্ষার জন্য তারা আগে থেকেই তৎপরতা চালিয়ে আসছে। সুতরাং যাদের ওপর এ অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা আছে তারাও অস্ত্র সংগ্রহের দিকে নজর দেবে।

সাপ্তাহিক : আন্দোলন কিভাবে তৈরি হচ্ছে?
আনু মুহাম্মদ : মধ্যপ্রাচ্যে দশকের পর দশক এ স্বৈরশাসন টিকতেই পারত না যদি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদ না থাকত। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এখন ক্ষয়িষ্ণু, পতনোম্মুখ। তাদের অর্থনীতিতে যে ধস তা আবার সমরনীতিতে দেখা যাচ্ছে না। সামরিক শক্তির পরিধি অনেক বড় হওয়ায় সব মিলিয়ে তারা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক, বিকলাঙ্গ এবং ভয়ঙ্কর একটি দানবে পরিণত হয়েছে। তার শক্তি ক্রমান্বয়ে ক্ষয় হচ্ছে। এটা মধ্যপ্রাচ্যে বিক্ষোভ, বিদ্রোহের একটি কারণ। জনগণকে তো আর চিরদিন দমন করে রাখা যায় না। ইদানীংকালে মধ্যপ্রাচ্যে বেকারত্বও বেড়েছে, খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে, নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংখ্যা বেড়েছে। যারা কিনা বুঝতে পারছে তাদের জাতীয় সম্পত্তির পরিমাণ কতো এবং তা ব্যবহার করে তারা কোথায় যেতে পারত। সব কিছু মিলিয়েই এ বিক্ষোভটা তৈরি হয়েছে।
তবে এর পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে তরুণ প্রজন্ম। মিসরে সীমিত পরিসরে যে বিজয় এসেছে, যে বিজয়ের গণ্ডি পেরিয়ে আরো অনেক দূর তাদেরকে যেতে হবে সেই বিজয়ই কিন্তু পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের মধ্যে ব্যাপক আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে, জনগণের শক্তির স্ফুরণ ঘটিয়েছে। এটা মধ্যপ্রাচ্যকে বড় ধরনের পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাবে। যা কিনা সারাবিশ্বের জন্যই ইতিবাচক।

সাপ্তাহিক : সাধারণত দেখা যায় সাম্রাজ্যবাদী পক্ষগুলো কোথাও তাদের অনুগতরা হেরে গেলে নতুন কাউকে দলে টানার চেষ্টা করে। মধ্যপ্রাচ্যের আন্দোলনে এমনটা হচ্ছে কি?
আনু মুহাম্মদ : হচ্ছে তো বটেই, এটা তাদের বরাবরের কৌশল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তারা বিপক্ষে ছিল, পাকিস্তানি স্বৈরশাসনকে স্থায়ী করতে চেয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই তারা নতুন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলে। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান বিপক্ষ শক্তি হলেও আজ বাংলাদেশ তাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। মধ্যপ্রাচ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ঠিক একই কায়দায় কাজ করার চেষ্টা করছে। মিসরে সামরিক বাহিনীর গঠন এবং ধরনটাই এমন যে তাদের ওপর মিসর সরকারের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বেশি ছিল। সেই সেনাবাহিনী অটুট রেখে তার মাধ্যমেই নতুন করে ক্ষমতা বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তারপরও বলা যায়, ওই সেনাবাহিনী আনোয়ার সাদাদ বা হোসনি মোবারকের সময়ে যেভাবে কাজ করেছিল আগামীতে তা আর করতে পারবে না। তাদের অনেক ছাড় দিতে হবে। এটাই সংগ্রামের সুফল। তবে কতটুকু সুবিধা জনগণ নিতে পারবে তা নির্ভর করবে শক্তির বিন্যাসের ওপর। যেহেতু সেখানেও জনগণের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যেও অনেক বিভাজন আছে। তবে আগের মতো একইভাবে স্বৈরাশাসক বসিয়ে দশকের পর দশক পাড় করবে সেই সম্ভাবনা আর নেই।

সাপ্তাহিক : লিবিয়ার পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে?
আনু মুহাম্মদ : লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফি রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে বিপ্লবী হিসেবে ক্ষমতায় এসেছিল। তখন কর্নেল জামাল আব্দুল নাসের মিসরে রাজতন্ত্রের পতন ঘটান। কর্নেল বুমেদিন আলজেরিয়ায় নতুনভাবে রাষ্ট্রকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। এগুলোকে সেই সময়ে মুক্তি আন্দোলন হিসেবে দেখা হয়েছিল। মুয়াম্মার গাদ্দাফি তখন বিপ্লবী নেতা হিসেবেই আখ্যায়িত হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে পুরো ব্যবস্থার মধ্যে বিপ্লবীকরণকে থামিয়ে দেয়া হয়। বিশেষত গত ১৫ বছরে লিবিয়া পুরোপুরিভাবে মার্কিন এবং সাম্রাজ্যবাদের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সখ্যতা তৈরি করে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদীদের প্রাধান্য নিশ্চিত করে। যে কনকো ফিলিপস বঙ্গোপসাগরে আসার জন্য তোড়জোড় করছে তারা কিন্তু লিবিয়াতে আছে। গাদ্দাফির সন্তানেরা ব্যবসা-বাণিজ্যে অধিষ্ঠিত। তাদের সঙ্গে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেন এবং সখ্যতাও মাত্রাতিরিক্ত। যখন গাদ্দাফির সন্তানদের মধ্যে কারো হাতে দেশের ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা উঠেছে তখনই মূলত জনগণ রুখে দাঁড়ানোর পণ করেছে। তারই ধারাবাহিকতা আজকের এই আন্দোলন। আমার মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্র তাদের দখলদারিত্ব কায়েম রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মিসরে হোসনি মোবারকের ক্ষেত্রে তারা যত দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল গাদ্দাফির ক্ষেত্রে কিন্তু তা করেনি। এখন যেহেতু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণকারী একটি বাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। জাতিসংঘের নামে তারা তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পথে হাঁটছে বলেই আমার মনে হয়। আবার সৌদি আরবে যদি আন্দোলন শুরু হয়ে যায় তাহলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চেহারা আরো বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে স্পষ্টভাবে দেখা দেবে। যেহেতু আরব বিশ্বে সৌদি আরব তাদের সবচেয়ে বড় খুঁটি। তারা যে কোনোভাবেই হোক তার পতন ঠেকানোর চেষ্টা করবে।

সাপ্তাহিক : মধ্যপ্রাচ্যের আন্দোলনের প্রভাব এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে কিছু বলুন...
আনু মুহাম্মদ : মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা আমাদের শ্রমবাজারকে আক্রান্ত করেছে। ওখানে আন্দোলন চলতে থাকলে আমাদের প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের চাপ পড়বে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে। সৌদি আরব আক্রান্ত হলে এবং মধ্যপ্রাচ্যে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়লে তেলের দাম আরো বেড়ে যেতে পারে। এর পাশাপাশি তেল নিয়ে ফটকাবাজারিরা তো রয়েছেই। তারাও দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। সামনের দিকে আরো বেশি করে রাখবে। এগুলোর প্রভাবও বাংলাদেশে পড়বে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে শেয়ারবাজারে ধস নামার কারণে বেকারদের একটা অংশ সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। বেকারদের এ অংশটি শেয়ারবাজারে ছিল। তারা ভেবেছিল বেকারত্ব কোনো সমস্যা হবে না। শেয়ারবাজার সমাধান দেবে। কিন্তু শেয়ারবাজারের মাধ্যমে সমাধান মেলেনি। বরং তারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাদের বেকারত্বটা এখন অনেক বেশি সামনে আসবে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, আমাদের প্রবাসী আয় কমছে, আমদানি ব্যয় বাড়ছে, বেকারত্ব বাড়ছে, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে, জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। বহুজাতিক চুক্তিগুলোর প্রভাবে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, নানা শর্ত পালনও প্রভাব ফেলবে। বহুজাতিক পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির বহুমাত্রিক ক্রিয়ার প্রভাব ২০১১ এবং ২০১২ সালে ভালোভাবেই দেখা যাবে। এ সব মিলিয়ে আমার মনে হয়, অল্প সময়ের মধ্যেই দেশে বড় সঙ্কট আসছে।

সাপ্তাহিক : সঙ্কট মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কি?
আনু মুহাম্মদ : বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যারা ক্ষমতায় এসেছে, সকলেরই উন্নয়ন নীতি, উন্নয়ন দর্শনটা হচ্ছে বহুজাতিক পুঁজি এবং তার নিয়ন্ত্রকদের ওপর নির্ভরশীল। উইকিলিকসও আমাদের দেখিয়েছে যে, কিভাবে বহুজাতিকরা, সাম্রাজ্যবাদীরা নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখছে। এই যে বৈশ্বিক অসহযোগিতা, সঙ্কট, বিরোধিতা, চাপ- এগুলোকে মোকাবিলা করার জন্য পায়ের নিচে যে মাটি শক্ত করার দরকার সে ধরনের অর্থনৈতিক বা অন্যান্য নীতিমালা নেই। যদিও সরকার দিন বদলের কথা বলবে কিন্তু এই জায়গাগুলো ঠিক করবে না। আর নীতি অভিন্ন রেখে দিন বদলও হবে না। এখন যে সঙ্কট আসছে তা মোকাবিলার কোনো লক্ষণও আমরা দেখতে পাচ্ছি না।

সাপ্তাহিক : প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকালে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ আমদানি ও ১০০ কোটি ডলারের ঋণের বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন?
আনু মুহাম্মদ : ১০০ কোটি ডলারের ঋণ নিয়ে অর্থমন্ত্রী উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন, এটা বাংলাদেশের জন্য বিরাট সাফল্য। এটা বাংলাদেশের জন্য কোন দিক থেকে সাফল্য তা আমি বুঝে উঠতে পারিনি। এই ঋণ আনার কোনো প্রয়োজন ছিল বলে আমি মনে করি না। কারণ বাংলাদেশের কোনো পুঁজির সঙ্কট নাই। এটা ভারতকে সুবিধা দেয়া এবং দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য করা হয়েছে। এই টাকার সুদ আমাদের গুনতে হবে। তাদের দেয়া অনেক কঠিন শর্ত মানতে হবে। তাদের কাছ থেকে পণ্য আমদানি করতে হবে। ওই টাকা দিয়ে অন্য দেশ থেকে কিছু কিনতে চাইলে তাদের পরামর্শকের নির্দেশনা অনুযায়ী তা করতে হবে। এই টাকা যে কাজে ব্যয় হবে সে সমস্ত কাজ আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। এগুলো তাদের জন্য প্রয়োজন। ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে এই টাকা দিয়ে। ট্রানজিটের অবকাঠামো নির্মাণ তো আমাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে না। আমাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দারিদ্র্য বিমোচন করা। তা না করে ভারতীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা তো আমাদের কাজ হতে পারে না।
ট্রানজিটের মাধ্যমে লাভ হবে, লাভ হবে- এমন একটি জিকির আমরা শুনতে পাই। লাভটা কোথায় তা কিন্তু আমি নিজেও খুঁজে পাচ্ছি না। এতদিন সরকারপক্ষ বলেছে তিন বিলিয়ন থেকে পাঁচ বিলিয়ন আমাদের লাভ হবে কারণ আমরা ট্যাক্স পাব, ফি পাব। কিন্তু পরে শোনা গেল ফি পাওয়া যাবে না। অর্থমন্ত্রী বললেন, এটা নিয়ে সেমিনার হবে। মোটকথা বিষয়টা নিয়ে সরকার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছে আর জনগণের মাথায় কি বোঝা পড়ছে তার হিসেব নেই। যদি ট্রানজিটের জন্য বিশাল আকারের রাস্তা হয়, তার জন্য আমাদের কি পরিমাণ কৃষিজমি নষ্ট হবে। আমাদের কতটুকু খাদ্য উৎপাদন ব্যহত হবে তার হিসেব কি আছে? এছাড়া আমাদের সড়ক ও বন্দরে নিজস্ব পণ্য পরিবহনের চাপই বহন করতে পারছে না। এখন ট্রানজিট হলে পণ্য পরিবহন অন্তত দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়াবে। এ অবস্থায় তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া হলে আমাদের পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সময়সাপেক্ষ, ধীরগতির হয়ে পড়বে। আমাদের নিজস্ব ব্যবস্থাটা একটা সঙ্কটে পড়বে। এটা কিভাবে সামাল দেয়া হবে তার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। সুতরাং ঋণের টাকায় অবকাঠামো নির্মাণটা আশীর্বাদ না হয়ে বোঝা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
বিদ্যুতের বিষয়ে বলা হচ্ছে, আমদানি করা হবে। কখনো কখনো সুযোগ হলে আমরাও রপ্তানি করব। দুটোই খুব অস্বচ্ছ প্রস্তাবনা। ভারত বিদ্যুৎ কেন রপ্তানি করবে, যেখানে তার নিজেরই ঘাটতি আছে- এটা পরিষ্কার নয়। আবার বাংলাদেশ কি করে ভারতের কাছে বিদ্যুৎ রপ্তানি করবে এটাও একটা প্রশ্ন। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কথা বলা হচ্ছে, প্রস্তাবনায় বাগেরহাটের রামপাল এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারার কথা বলা হয়েছে। এই জায়গাগুলো কিভাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে তাও অস্পষ্ট। রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হলে সুন্দরবনের কি দশা হবে, মংলা বন্দরের কি দশা হবে তা কিন্তু জানা যায়নি। সেখানকার মাটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে তা অনুপযোগী। এখনো এর কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) হয়নি। আনোয়ারায় করা হলে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর যে চাপ পড়বে তা নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষই অনেক লেখালেখি করছেন। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সবকিছু মিলিয়ে জনগণের অনেক সম্পদ, প্রতিষ্ঠান এর দ্বারা হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। সরকার যদি মনে করে যে, এটা জাতীয় স্বার্থেই করা হচ্ছে, তাহলে স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজগুলো করতে অসুবিধা কি তা আমার বোধগম্য নয়। জনগণ তো পরিষ্কারভাবে দেখবে। যদি তাদের স্বার্থ হয় তারা অবশ্যই সমর্থন জানাবে।

সাপ্তাহিক : বিশ্বব্যাংকের ঋণে পদ্মা সেতু নির্মাণ ও ঋণের শর্ত বাংলাদেশের জন্য কতটা উপযোগী হবে?
আনু মুহাম্মদ : বিশ্বব্যাংকের ঋণ নয়, সব বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রেই দুটো জিনিস আমরা দেখি, প্রথমত প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায়। কারণ তাদের অনেক রকম শর্ত মানতে হয়। তাদের পরামর্শমতো কাজ করতে হয়। তাদের সেই পরামর্শকদের ব্যয়ও বহন করতে হয়। দ্বিতীয়ত ওই প্রকল্প সম্পন্ন করতে গিয়ে অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রেও বাধাপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রেও বিশ্বব্যাংকের ঋণ নিয়ে এমনটাই ঘটছে। বিশ্বব্যাংক যে ঋণ দিচ্ছে, তার শর্তানুযায়ী যমুনা সেতুর টোলের চার্জ বাড়ানো হচ্ছে। শুধুমাত্র এটা না, এ ঋণের টার্গেট দিতে গিয়ে বিভিন্ন সমস্যা হবে, কালক্ষেপণ হবে আর আমরা নানাভাবে ব্লাকমেইলের শিকার হব। ব্যয় বাড়ার বিষয়টিও যথারীতি এখানে যুক্ত হয়েছে। প্রথমে এর ব্যয় ১০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছিল। এখন এই ২০ হাজার কোটি টাকা পার হয়ে গেছে। তার মধ্যে তাদের পরামর্শকদের পেছনেই প্রচুর টাকা যাবে। সামনের দিকে এ ব্যয় আরো বেড়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঋণের ফাঁদে না পড়লে অর্ধেক ব্যয়েই প্রকল্প সম্পন্ন করা যেত।

সাপ্তাহিক : কিন্তু সরকার তো বলছে এত বড় পুঁজি সংগ্রহ করতে হলে নাকি ঋণের বিকল্প নেই?
আনু মুহাম্মদ : পুঁজি সংগ্রহের জন্য ঋণে প্রয়োজন- কথাটা গ্রহণযোগ্য না এজন্য যে শেয়ারবাজার একটা মাধ্যম ছিল। প্রবাসী আয় থেকেও ঋণ নেয়া যায়। এই দুটো পথই খোলা ছিল বড় আকারের পুঁজি সংগ্রহের জন্য। কিন্তু সরকার সেই পথে হাঁটেনি। সরকার যেই পথে হেঁটেছে সেই পথে হাঁটলে পরামর্শক, নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বিশাল মুনাফা করা সম্ভব হয়। সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এদের সঙ্গে সম্পর্কহেতু লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকে। তাই বড় বড় প্রকল্পের প্রতি তাদের আগ্রহ বেশি।

সাপ্তাহিক : আমাদের তো অনেক নাম করা প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞ আছে। তাদের কাজে লাগানো হচ্ছে না কেন?
আনু মুহাম্মদ : তারা আমাদের লোকজনকে গুরুত্ব দেয় না। সব সময় বলে যে, আমাদের দক্ষ জনশক্তি নেই। ৪০ বছরেও যদি দক্ষ জনশক্তি না হয়, তাহলে কবে হবে। দেশে এখন অনেকগুলো প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এখানকার প্রকৌশলীরা সব সময়ই কারো অধীনে কাজ করবে? তারা কি মূল দায়িত্ব, কর্তৃত্ব পাবে না? বাস্তবে অধিকাংশ প্রকল্পের কর্তৃত্ব বিদেশিদের হাতে থাকলেও কাজ করে কিন্তু আমাদের প্রকৌশলীরাই। যে কারণে আমরা সব ক্ষেত্রেই বলি জাতীয় মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

সাপ্তাহিক : একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। বিরোধীদল মধ্যবর্তী নির্বাচন চাচ্ছে। বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন? এখন নির্বাচন হলে কারা জিতবে?
আনু মুহাম্মদ : বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ হচ্ছে পরস্পরের পরিপূরক। একজন না থাকলে অন্য জনের টিকে থাকার কোনো উপায় নেই। আওয়ামী লীগ যখন সরকারে থাকে তখন বিদ্যুৎ, খাদ্যদ্রব্য, সন্ত্রাস, আরো যা কিছু আছে সব কিছু নিয়েই বিএনপিকে দোষারোপ করে। বলে ওদের সময়ের দিকে তাকান। ওরা এর চেয়ে ভালো ছিল না। বিএনপিও ক্ষমতায় থাকলে একই কাজ করে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, তারা একে অপরের রক্ষাকবচ। একজন আরেকজনের ওপরে ভর করে আত্মরক্ষা করতে চেষ্টা করে। এটা জনগণের জন্য ভয়ঙ্কর।
আওয়ামী লীগ দুই বছর ধরে, সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, দলীয়করণ, দুর্নীতি করে জনগণের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিএনপি মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা বলে এখান থেকে সুবিধা নিতে চাইছে। এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আওয়ামী লীগের জায়গায় বিএনপি থাকলে আলাদা কিছু হতো না। সুতরাং আওয়ামী লীগকে ছেড়ে বিএনপিকে ধরা, আবার বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগের কাছে যাওয়া জনগণ যদি এই ঘোর থেকে মুক্ত না হয় বা তাদেরকে মুক্ত করার মতো রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ যদি দেশে না ঘটে তাহলে মানুষের এই ভোগান্তি চলতেই থাকবে। আর নির্বাচনের কথা তুললে বলা যায় যে, নির্বাচনে যদি টাকা, পেশি শক্তি, সাম্রাজ্যবাদের আছর না থাকে তাহলে মধ্যবর্তী বলেন, আর যে কোনো নির্বাচন বলেন, আওয়ামী লীগ, বিএনপি কেউই ক্ষমতায় আসতে পারবে না। জনগণের পক্ষের শক্তিরাই তখন ক্ষমতায় আসবে।

(সাপ্তাহিক, বর্ষ ০৩, সংখ্যা ৪২ এ প্রকাশিত)