10441979 912281565464391 409846729880478120 nঅধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। অর্থনীতিবিদ। সদস্য সচিব, তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। সাপ্তাহিককে দেয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন রামপালের কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, ফুলবাড়ির কয়লাখনি, পিএসসি ২০১২’র নানা দিক এবং সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। জাতীয় স্বার্থরক্ষার গণআন্দোলনের নেতৃত্বদানের অভিজ্ঞতা থেকে বিচার করেছেন শাহবাগের আন্দোলন ও নির্বাচনমুখী রাজনীতি নিয়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এই অধ্যাপক মতামত দিয়েছেন হলমার্কের অর্থ কেলেঙ্কারি নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা, আগামী বাজেট ও অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বিষয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিস রায়হান

সাপ্তাহিক : সম্প্রতি জাতীয় কমিটির রামপাল ও ফুলবাড়ির কর্মসূচি স্থগিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আন্দোলন পিছিয়ে পড়ছে কি? ব্যর্থতাটা কোথায়?
আনু মুহাম্মদ : আমাদের কোনো ব্যর্থতা নেই। সর্বশেষ কর্মসূচিগুলো স্থগিত হয়েছে উদ্ভূত জাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে। ফুলবাড়ীতে কর্মসূচি স্থগিতের প্রাক্কালে আমরা বলে দিয়েছি যদি জিসিএম সেখানে কোনো অপতৎরপরতা দেখায় তাহলে যে কোনো সময়, কিছু ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই আবার ওই কর্মসূচি দেয়া হবে। জনগণ যে তাদের সেখানে দাঁড়াতেই দেবে না এর প্রমাণ তারা দিয়েছেন।
বর্তমানে জিসিএম ফুলবাড়ীর আশপাশের থানাগুলোতে তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। এটা ঠেকাতে আমরা ফুলবাড়ীর পার্শ্বস্থ বিরামপুর থানায় গিয়েছিলাম। সেখানে সরকারি দলের যোগসাজশে কিছু স্থানীয় সন্ত্রাসী আমাদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছে ঠিকই, কিন্তু জনগণের সহায়তায় আমরা আমাদের কাজটা করে আসতে পেরেছি। জিসিএম এখন আশপাশের থানাগুলোর মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, ফুলবাড়ীতে খনি হলে তাদের কপাল খুলে যাবে। কিন্তু আমরা বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কথাটা জানান দিয়েছি।
খনি হলে পানি উত্তোলনের ফলে ফুলবাড়ীর খনি এলাকা থেকে চতুর্দিকে ৫৭ কিলোমিটার পর্যন্ত যে মেরুকরণ ঘটবে, এসব এলাকার মানুষ নলকূপে আর পানি পাবে না, আবাদ বন্ধ হবে এবং আরও অনেক সমস্যায় পড়বে, এই তথ্যগুলো আমরা জনগণকে জানিয়ে এসেছি। আমাদের কাজ আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। জনস্বার্থ, জাতীয় স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে আমরা অবিচল আছি। তারাও বসে নেই। ফুলবাড়ীতে, তার আশপাশে জিসিএম স্থানীয় প্রভাবশালীদের কিনছে, এজেন্ট নিয়োগ দিচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে তারা অনেক তারকা দালালকে দলে টানতে সক্ষম হয়েছে। এই পেশিশক্তির বৃত্তটা আমরা ভাঙার চেষ্টা করছি। মুখোশধারীদের মুখোশ উন্মোচনেরও চেষ্টা চালাচ্ছি।
রামপালে সরকার যা করছে তা অস্বচ্ছতায় ভরপুর। ঠিক এ ধরনের একটি প্রকল্প করতে গিয়ে ভারতে এনটিপিসি জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। একই প্রকল্প এখন আমাদের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা চলছে। এছাড়া এ প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ কেনা হবে অধিক দামে। সর্বোপরি আপত্তির জায়গাটা হলো সুন্দরবন। এই প্রকল্পের কারণে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু সরকার বলছে, কিছু হবে না। ঠিক আছে, এটা তাহলে কিভাবে নিষ্পত্তি হবে? নিয়ম অনুযায়ী সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর সেখানে প্রকল্প করা যাবে কিনা এ বিষয়ে একটি পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা দেবে। তার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত হবে।
কিন্তু আমরা দেখেছি, এই পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা আসার আগেই সরকার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। জমি থেকে মানুষকে উচ্ছেদ করেছে। পিডিবি সব ধরনের প্রস্তুতিও নিয়েছে। এই অবস্থায় সরকারেরই আরেকটি দপ্তর কিভাবে সঠিক রিপোর্ট দেবে? ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ দল সেখানে গেছে। তারাও বলছে এই প্রকল্পের মাধ্যমে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা আমাদের পর্যবেক্ষণগুলো দিয়েছি। আমাদের একটাই সুন্দরবন। এটা আমাদের সম্পদ। একে বিনষ্ট হতে দেয়া যাবে না। চাইলেই সরকার প্রকল্পটা অন্য কোথাও সরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু সরকার কারও কোনো কথা কানে লাগাচ্ছে না। এর প্রেক্ষিতে আমরা সারাদেশে প্রচার চালাচ্ছি। মানুষকে সঙ্ঘবদ্ধ করছি। ওই এলাকাতেও আমরা কর্মসূচি জারি রেখেছি।

সাপ্তাহিক : মাঠপর্যায়ে প্রকল্প গেলে তার বিরুদ্ধে জনগণ প্রতিরোধ করছে। কিন্তু নীতিনির্ধারণীতেই কেন জনস্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে না?
আনু মুহাম্মদ : যদি সংসদীয় গণতন্ত্র এখানে আসলেই কার্যকর হতো তাহলে স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই তো জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার কথা। সংসদ কার্যকর থাকলে সিদ্ধান্তগুলো সংসদে আলাপ হতো। সব সংসদ সদস্যরা মতামত দিত। কিন্তু এই গণতান্ত্রিক চর্চা এখানে নেই। বরং যারা জনপ্রতিনিধি হচ্ছে তারা জনগণের প্রতিনিধিত্বের চাইতে কোনো না কোনো কোম্পানি বা সরকারের কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নেই বেশি আগ্রহী। এজন্যই সরকারি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জনগণের স্বার্থটা বার বার উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।

সাপ্তাহিক : কিন্তু এই জনপ্রতিনিধিরা কি নির্বাচনী রাজনীতি করে না? নির্বাচনী রাজনীতির স্বার্থেই তো বড় বিষয়গুলোতে তাদের জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো উচিত।
আনু মুহাম্মদ : এটা কিছু মাত্রায় আছে। এজন্য সরকারের মধ্যে আমরা দুটো ধারা দেখতে পাই। একটা অংশ জিসিএমকে প্রাধান্য দেয়। তাদের চাপেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সার্কুলার পাঠান। আরেকটা ধারা আবার খনির বিরোধিতাও করে। একটা অংশ শুধু সাময়িক ও ব্যক্তিগত লাভক্ষতির চিন্তাটাকেই প্রাধান্য দেয়। কিন্তু এর ফলে ফুলবাড়ীতে যে বিদ্রোহ হবে তার প্রভাব কিন্তু সারা দেশেই পড়বে। এই বিপদটা আবার অনেকে টের পাচ্ছে। এরাই আবার চাপ দেয় বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী কাজ করার জন্য।

সাপ্তাহিক
 : নির্বাচনী রাজনীতি তো এখন ঘনীভূত। কোন দিকে পরিস্থিতি এগুচ্ছে?
আনু মুহাম্মদ : এখন যা কিছু ঘটছে, সহিংসতা, হামলা, সাম্প্রদায়িক উস্কানি, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি খারাপের দিকেই। মূল সমস্যাটা হচ্ছে, বাংলাদেশের যে শাসকশ্রেণী, তারা নিজেদের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া এখনও দাঁড় করাতে পারেনি। আবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নটা এখনও অমীমাংসিত। উচিত ছিল এই দুটো প্রশ্ন অনেক আগেই সমাধান করে ফেলা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে দ্বিমতের কোনো সুযোগ নেই। এই বিচারটা অনেক আগেই শাসকশ্রেণীর বড় দলগুলোর ঐক্যমতের ভিত্তিতে সেরে ফেলা দরকার ছিল। তেমনি নির্বাচন কিভাবে হবে, কিভাবে একদল ক্ষমতা ছাড়বে অন্যদল আসবে এটারও একটি পদ্ধতি বের করার দরকার ছিল। এই দুটো প্রশ্নের সমাধান হয়নি। তাই ঘুরেফিরে আমরা পুরনো একই সঙ্কটের বৃত্তে পড়ে আছি। প্রতিবারই নির্বাচন ঘনিয়ে এলে সংঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। কোনো দলেরই সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে নজর নেই। দুই দলই চায় যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় যেতে। এ জন্যই এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
বার বার ঘুরেফিরে আসছে যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নটাও। সত্তর দশকের শেষ দিকে এই দাবিতে তৈরি হলো যুবকমান্ড। এরশাদের সেনাশাসনের চাপে তা স্তিমিত হলো। সেনাবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তারা ছাড় পেল। সেনাশাসনের মদদে তারা শক্তিশালীও হলো। এরপর ৯২ এ শুরু হলো আবার। আওয়ামী লীগের আঁতাত-পিছুটানের কারণে সেবারও তা সফলতার মুখ দেখতে পারল না। এখন ২০১৩তে এসে আবার সেই প্রশ্ন। এই প্রশ্নটা আগেই সমাধান হয়ে গেলে তরুণ প্রজন্ম বর্তমানের সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য লড়তে পারত। আমাদের অগ্রযাত্রার অনেক প্রতিবন্ধকতা উপড়ে ফেলতে পারত। কিন্তু তা হয়নি। ঘুরে ঘুরে আমাদের প্রতিটি প্রজন্মকেই জন্মযুদ্ধের সেই একটি সমস্যা সমাধানেই শক্তিক্ষয় করে যেতে হচ্ছে। মাঝখান দিয়ে ক্রমশ বেড়ে চলেছে সমস্যার বহর।
এই দুই সমস্যা যে আর কতকাল চলবে আমরা তা জানি না। আর কত রক্ত আমাদের দিতে হবে, আর কত নিজেদের সমস্যা ভুলে জীবনধারণটাকেই বড় প্রাপ্তি মনে করে বেঁচে থাকতে হবে? এখন যা অবস্থা, তাতে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও এই সহিংসতা-সংঘাত-ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বাড়বে। মানুষ তেমন কিছু করবে না, কারণ টানেলের শেষপ্রান্তে আলো পাওয়ার কোনো আশাও তাদের মধ্যে নেই।

সাপ্তাহিক
 : শাহবাগের গণজাগরণ এক্ষেত্রে কি কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে?
আনু মুহাম্মদ : বড় দলগুলোর প্রতি জনগণের অনাস্থা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশই হচ্ছে শাহবাগের গণজাগরণ। এটা একটা বিশেষ কারণ ধরে শুরু হলেও শুধু তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মানুষের বড় ক্ষোভের জায়গাটা ছিল, এতদিনেও কেন এই বিচার হলো না। আরেকটা জায়গা হচ্ছে, এই সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যদিও আগে এই সরকারেরই রেকর্ড আছে জামায়াতের সঙ্গে আঁতাতের। সেই আশঙ্কাটাই মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। তরুণ প্রজন্মকে বেপরোয়া করে তুলেছে।
তরুণ প্রজন্মের জাগরণের ক্ষেত্রে এখানে বড় বাধাটা তৈরি করেছে গত ৪২ বছরের অপরাজনীতি। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মতো বড় দলগুলো নানাভাবে দীর্ঘ এ সময়ে ধর্মকে রাজনীতির আনুষঙ্গিক বস্তু করে তুলেছে। এতে করে ধর্ম নিয়ে যারা ব্যবসা করে শক্তির মঞ্চে তাদের অংশীদারিত্ব বেড়েছে অনেক। জামায়াত সেই শক্তিটাকে ব্যবহার করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে ধর্মরক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। এই খেলায় যোগ দিয়েছে বিএনপি। আমি নিশ্চিত খালেদা জিয়া নিজেও বিশ্বাস করেন না যে, শাহবাগ যারা যায়, সবাই নাস্তিক। কিন্তু তিনি জামায়াতের সঙ্গে গলা মিলিয়ে এটা বলছেন। উদ্দেশ্য একটাই, ভোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে বিপদে ফেলা।
ইসলামপন্থি বিভিন্ন দল এখন মাঠে নামছে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য। কিন্তু যারা ইসলামপন্থি রাজনীতি করে তাদের যদি ইসলামের প্রতি আনুগত্য থাকে নিজেদেরই তো উচিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াকে অগ্রসর করতে ভূমিকা রাখা। কারণ এরাই একাত্তরে ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করেছিল। লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ করেছিল। ধর্মের নামে অধর্ম চালিয়েছিল তারা। এদের শাস্তি নিশ্চিত করাটা ধর্মীয় রাজনীতি যারা করে, তাদের নৈতিক দায়িত্ব।
যাই হোক, এগুলো হয়নি। কিন্তু তবু শাহবাগের বড় অর্জনটা হচ্ছে, তরুণ প্রজন্মের দেশপ্রেম এবং সক্রিয়তা। এতদিন সবার ধারণা ছিল তরুণ প্রজন্ম ক্ষমতার দলাদলিতে ব্যক্তিস্বার্থ নিশ্চিত করা আর ক্যারিয়ারের পূজা ছাড়া কিছু করতে সক্ষম না। এই প্রজন্মের ওপর অনেকেই আশা হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু এই গণজাগরণের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্ম প্রমাণ দিয়েছে দেশপ্রেম ও সততার।
সরকারপক্ষে যারা আছে তারা ঠিকঠাক এই গণশক্তির তাৎপর্যটাকে ধরতে পারেনি। এজন্য তারা গণদাবি, তরুণ প্রজন্মের দাবিকে পাশ কাটিয়ে ধর্মপন্থিদের ভুল ভাঙানোতেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। তারা অন্যায় দাবি, মিথ্যা প্রচারণাকে মেনে নিচ্ছে, বৈধতা দিচ্ছে। তাদের শর্ত মেনে নিচ্ছে। এগুলো করে ধর্মীয় রাজনীতির সঙ্গে তাদের সখ্যতা যতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তা কাটানোর চেষ্টা করছে। ক্ষমতা থেকে ধর্মীয় রাজনীতি হঠানোর স্পিরিট ধ্বংস করে পুনরায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। এর ফলে বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক যে সমাজের আকাক্সক্ষা তা আবারও পিছিয়ে গেল।

সাপ্তাহিক
 : সরকার তো জনসমর্থন পাচ্ছে? জামায়াত নিষিদ্ধের উদ্যোগ নিতে সমস্যা কোথায়?
আনু মুহাম্মদ : শাহবাগের গণজাগরণের মধ্য দিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে তা অনেক বড়। বর্তমান সরকারের যে রাজনৈতিক নীতি ও বিন্যাস আছে তার দ্বারা এই প্রত্যাশার চাপ পূরণ করা সম্ভব না। কিছু করতে হলে সরকারের অনেক সময় লাগবে। এ কারণেই জটিলতা তৈরি হয়েছে। যেমন, সরকারের পক্ষ থেকে, বার বার গণজাগরণ মঞ্চের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে এই আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছেন। জামায়াত নিষিদ্ধের কথা সরকারের মন্ত্রীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন। জনগণ আশা করেছে, মন্ত্রীরা দায়িত্ব নিয়েই এসব কথা বলেছেন। এর ফলে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে যে, সরকার মনে হয় জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে চায়। এখন সেই প্রত্যাশা থেকেই আলটিমেটাম এসেছে। কিন্তু সরকার নীরব। তরুণদের মধ্যে যারা একেবারেই আপস করতে রাজি না, তারা এটা মেনে নিতে পারছে না। আবার যেহেতু তারা মনে করে এই সরকারই বিচার করবে তাই সরকারবিরোধী আন্দোলনে তারা নামছে না। বাধ্য হয়ে নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেই তারা দাবি আদায়ের জন্য লড়াই চালাচ্ছে।
কিন্তু সরকার এখনও নীরব। বেশিক্ষণ তারা চুপ থাকতে পারবে না। প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলেই তাদের দায় আছে। এ জন্যই ছেলেমেয়েরা শেষ দেখে নিতে চাচ্ছে। যদি আওয়ামী লীগ এই প্রত্যাশার জায়গা না তৈরি করত তাহলে তরুণরা হয়ত দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রামের পথে যেত। কিন্তু এখন তারা হয় জয়, নয় ক্ষয় এমন একটা পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় না, সরকার বেশি কিছু করবে। কিছু করার কোনো নমুনা দেখা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিকভাবে জামায়াত যেসব তৎপরতা চালাচ্ছে সরকার তার বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশনে যাচ্ছে না। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, যারা কিনা আওয়ামী লীগের বিরাট সমর্থক, তারাই অভিযোগ তুলছে সরকার ট্রাইব্যুনালকে যথেষ্ট লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়নি। প্রসিকিউটরদের অধিকাংশই দুর্বল। তাছাড়া এমন সব মন্তব্য সরকারের নেতৃবৃন্দ করেন, যা দেখে মনে হয় তারা নিজেরাই হাতে ধরে জামায়াতের কাছে অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন। আইন থাকা সত্ত্বেও সরকার বলছে আইন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মোটকথা, দীর্ঘদিন ধরে দুধ কলা দিয়ে পোষার কারণে জামায়াত-শিবির তো এখন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। এই শক্তির বিন্যাসের জন্য সরকারকে চ্যালেঞ্জ নিয়ে যেভাবে কাজ করতে হবে তার কোনো লক্ষণ সরকারের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। সরকারের কর্মকান্ডই সরকার থেকে মানুষকে দূরে রাখে। ছাত্রলীগ-যুবলীগ যদি জনগণের ওপর সারাক্ষণ সন্ত্রাসী তৎপরতা চালায় তাহলে তো আর জনগণ এই দলের পাশে এসে দাঁড়াবে না। যদি এরা দখল লুণ্ঠন চালিয়েই যায় তাহলে তো মানুষ এদের সমর্থন করবে না। এই সুযোগটাই এখন জামায়াত নিচ্ছে।
আওয়ামী লীগের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তাদের কথা ও কাজের মধ্যে মিল নেই। কারণ কথাগুলো বলে তারা ভোটের রাজনীতির জন্য। আর কাজগুলো না করতে পারার কারণ তাদের ওই নৈতিক দৃঢ়তা নেই। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে, আওয়ামী লীগের জামায়াত বিরোধিতা মতাদর্শিক বা রাজনৈতিক না। এটা সম্পূর্ণই কৌশলগত। নির্বাচনী হিসাব নিকাশের অংশ হিসেবেই তারা এ নিয়ে তৎপরতা দেখায়। তারা শত্রু মনে করে বিএনপিকে। সেক্ষেত্রে বিএনপিকে পর্যুদস্ত করার জন্য প্রয়োজনে জামায়াতের সঙ্গে আপসরফায়ও তারা যেতে পারে। কাদের মোল্লার রায় দেখে মানুষ সেই আশঙ্কাতেই পড়ে। শাহবাগ গণজাগরণের ফলে এই পথটা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। তবে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক জায়গা থেকে এখনও প্রস্তুত না। কেবলমাত্র বিশাল গণআন্দোলনই পারে সরকারকে দিয়ে এই কাজটা করাতে।

সাপ্তাহিক
 : এখানে তো আওয়ামী সমর্থক তবে আওয়ামী নয় এমন অনেক আছে। এরা কি সরকারের ওপর আস্থা হারাচ্ছে না?
আনু মুহাম্মদ : এই আন্দোলনে সরকারি দলের একটা অংশ, তাদের সমর্থক, তাদের বিরোধী ও একেবারেই রাজনীতি সচেতন নয়- এরকম সবগুলো শ্রেণীরই অংশগ্রহণ আছে। আওয়ামী লীগেরই অঙ্গ- ছাত্রলীগ, এর সঙ্গে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও মানুষ এখানে এসেছে। কারণ তারা থাকলেও কর্তৃত্ব বা নেতৃত্বটা তাদের ছিল না। মানুষ যখন দেখল, এখানে জাহানারা ইমাম ছাড়া আর কারও ছবি উঠছে না, তখন মানুষ এখানে থেকে গেল।
সরকারপক্ষও ততক্ষণ এটাকে ধারণ করেছে যতক্ষণ আন্দোলনের আঙ্গিকটা সরকারের পক্ষে গেছে। এখন যখন দাবি সুনির্দিষ্ট হয়েছে, আলিমেটাম এসেছে সরকার দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে গেছে। এখন মঞ্চকে কেন্দ্র করে ঐক্যটা ধরে রাখতে হলে সরকারকে কিছু প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। এটা না করতে পারলে আওয়ামী লীগ কর্মীদের চেয়ে বড় সমস্যায় পড়বে মাঠে এবং অনলাইনে আওয়ামী ধারার সমর্থক গোষ্ঠীটি। তারা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এই মানুষগুলো পিছিয়ে আসতে পারবে না।

সাপ্তাহিক
 : আন্দোলনের গতি কোনদিকে যেতে পারে বলে মনে হয়?
আনু মুহাম্মদ : এভাবে মূল্যায়ন করা যাবে না। তবে আন্দোলনের মধ্যে বহুবিধ ধারা তৈরি হবে। এই আন্দোলনের রেশ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়বে।

সাপ্তাহিক
 : বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কেমন দেখছেন? লোডশেডিং তো বাড়ছেই...
আনু মুহাম্মদ : বিদ্যুৎ খাতে সরকার কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। উৎপাদন কিছু বাড়িয়েছে। কিন্তু তাও ভুল নীতির ওপর ভিত্তি করে। ফলে দেখা যাচ্ছে যে, জ্বালানি ঘাটতি, মেশিনারিজ সমস্যা ও অন্যান্য সব মিলে ২৫০০ মেগাওয়াটের মতো উৎপাদন কম হচ্ছে। অল্প কিছু টাকা ব্যয় হলেই এই সমস্যার অনেকটা সমাধান করা যেত। কিন্তু তা না করে সরকার রেন্টালের দিকে ছুটেছে। এতে তাদের কিছু মানুষের লাভ হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ খাত ও অর্থনীতি ডুবেছে, মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছে।
উদ্ধার পেতে তারা দৌড়ে গেছে বিশ্বব্যাংকের কাছে। বিশ্বব্যাংকের নীতি হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় খাতকে বসিয়ে দেয়া। স্বাভাবিকভাবে টাকা তারা পায়নি। অথচ যে কোনো খাত থেকে চাইলেই তারা এই টাকাটা নিতে পারত। এক হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রের জন্য বড় টাকা না। এই টাকাটার যোগান সরকার দিতে পারেনি। কিন্তু এক হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বছরে সে ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ করে চলেছে। অর্থমন্ত্রী এর আগে হলমার্কের কেলেঙ্কারি নিয়ে বলেছিলেন, চার হাজার কোটি টাকা তেমন কিছু না। অথচ এক হাজার কোটি টাকার জন্য বিদ্যুৎ খাত মুখ থুবড়ে পড়েছে। সরকারকে ধরর্ণা দিতে হয়েছে বিশ্বব্যাংকের দুয়ারে।
শুধু বিদ্যুৎ না। এর মধ্য দিয়ে জ্বালানি খাতকেও বিপন্ন করা হয়েছে। তেলের দাম বেড়েছে, গ্যাসের দাম বেড়েছে কিন্তু সঙ্কট কমেনি। কারণ সঙ্কটটা তৈরি করা হচ্ছে হাতে ধরে। সামনের দিকে আবার এই পরিস্থিতি উল্টে যাবে। কনকোফিলিপস সমুদ্রে কাজ চালাচ্ছে। এখন আবার ১২ ব্লকে পিএসসি হচ্ছে। নতুন পিএসসিতে যে দাম দেয়া হবে, তার সঙ্গে পরিবহন ব্যয় যোগ হলে এটা আমদানি ব্যয়ের সমান হয়ে যাবে।
আবার এতগুলো ব্লক থেকে গ্যাস ওঠা শুরু করলে গ্যাস রপ্তানি ছাড়া আমাদের কোনো উপায় থাকবে না। যতগুলো পদক্ষেপ এই খাতে নেয়া হচ্ছে সবই কোনো না কোনো মাত্রায় জনস্বার্থবিরোধী। একদিকে বলা হচ্ছে, বাপেক্সের ক্ষমতা নাই, ফলে বাপেক্সকে বসিয়ে রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে মিয়ানমার তাকে ডাকছে। আফগানিস্তানে শেভরন তাকে কাজে লাগাতে চায়Ñ এগুলো সরকার বিবেচনা করতে বসেছে। এমনিতে দেশের ব্লকগুলোতে বিদেশি কোম্পানি ডেকে আনা হচ্ছে। বাপেক্সের সময় নেই, ক্ষমতা নেই বলে।
সামনে নির্বাচন। এখন সরকার আরও প্রতিশ্রুতি দেবে। নতুন ইস্যু দিয়ে এই ইস্যুটা ধামাচাপা দেবে। সত্য মিথ্যা মিশিয়ে পরিস্থিতি উৎরাতে চাইবে। কিন্তু সঙ্কট তারা কমাতে পারবে না। সামাল দিতে পারবে না।

সাপ্তাহিক : হলমার্ক প্রসঙ্গ তো এখন আবার ফিরে এসেছে। অপরাধীকে শাস্তি না দিয়ে পুনর্বাসনের এই প্রক্রিয়াকে কিভাবে দেখছেন?
আনু মুহাম্মদ : হলমার্ক হচ্ছে শাসকশ্রেণীর লুটপাটের উলঙ্গ প্রকাশ। সরকার কিভাবে সামগ্রিক অর্থনীতির মধ্যে লুটপাট চালাচ্ছে এর মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হয়েছে। হলমার্ক কিভাবে সোনালী ব্যাংকের টাকা নিয়েছে, লুটপাট করেছে এটা তো সোনালী ব্যাংকের টাকা না। এটা রাষ্ট্রীয় টাকা। ক্ষমতাসীনরা কিভাবে রাষ্ট্রের অর্থ লুটপাট করছে তাই স্পষ্ট হচ্ছে এর মধ্য দিয়ে। এতদিন খেলাপি ঋণের কথা আমরা শুনে এসেছি। বাংলাদেশের বিত্তবান যারা তাদের একটা বড় অংশই ঋণখেলাপির মধ্য দিয়েই বিত্তবান হয়েছে। অর্থমন্ত্রী এটাকে নতুন রূপ দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় ব্যাংক লোপাটকারীকে যেভাবে তিনি রক্ষা করতে নেমেছেন তাতে তার সংশ্লিষ্টতা কোথায় এ প্রশ্ন এসেই যায়। তিনি এখন হলমার্ককে পুনরায় ঋণ দেয়ার প্রস্তাব করেছেন হলমার্কের প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মচারী-কর্মকর্তাদের রক্ষার জন্য। আদমজীর ক্ষেত্রে তারা তা করেননি। তাদের উচিত ছিল হলমার্ককে রাষ্ট্রায়ত্ত করে হয় এটা নিলামে তোলা, নয় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা। তা না করে এখন হলমার্ককে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। আগের লুটপাটের কি হলো তা যাচাই না করেই, তাকে পুনরায় লুটপাটের ব্যবস্থা করে দেয়া হচ্ছে।

সাপ্তাহিক : সামনেই বাজেট। এই বাজেট কেমন হতে পারে?
আনু মুহাম্মদ : প্রতি বছরই আমাদের বড় অঙ্কের বাজেট দেখানো হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিটাও হয় বিশাল। এর মাধ্যমে জনগণের ওপর করের বোঝা ও সম্প্রসারিত ভ্যাট চাপানো হয়। বছর শেষে দেখা যায় নির্ধারিত করের চেয়ে ২০-২৫ হাজার কোটি টাকার কর বেশিও আদায় করে। অর্থাৎ জনগণের যা দেবার তা জনগণ ঠিকই দিয়ে দেয়। কিন্তু তার বদলে জনগণের যা পাওয়ার অধিকার, তার নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা এগুলোতে সব সময়ই বাধা লেগে থাকে। কারণটা ওই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেই।
ওখানে বেশিরভাগ থাকে ভুল প্রকল্প। যেগুলো বাস্তবায়ন করা যাবে না। বাকিগুলো থাকে অপ্রয়োজনীয় বা কম প্রয়োজনীয় প্রকল্প। জরুরি প্রয়োজনগুলোই থাকে পিছিয়ে। স্বাভাবিকভাবে এসব প্রকল্পের অনেকগুলো বাধাগ্রস্ত হয়। অনেকগুলো তারা নিজেরাই ঝুলিয়ে দেয়। ফলে উন্নয়ন কর্মসূচির বিরাট অংশজুড়ে দেখা যায় পুরনো প্রকল্পগুলোরই ছড়াছড়ি। সামনের বাজেটটাও এর বাইরে যাবে বলে মনে হয় না।
সাপ্তাহিক : এত অপকর্ম, ঢিলেমি করেও সরকার টিকে আছে কিভাবে? অর্থনীতিতেও তো বড় কোনো সমস্যা নেই।
আনু মুহাম্মদ : এখানে সরকারের কোনো কৃতিত্ব নেই। আমাদের অর্থনীতির তিনটা প্রধান শক্তির জায়গা আছে। একটা হচ্ছে কৃষি। কৃষিখাতে কৃষকরা অনেক দুঃখ কষ্ট সয়েও প্রতিনিয়ত দেশকে বিপুল পরিমাণে দিয়ে যাচ্ছেন। যা অর্থনীতির বিরাট চাপ কমিয়ে দিচ্ছে। খাদ্যশস্য আমদানি এবং কৃষিজাত অন্যান্য পণ্য আমদানিতে উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমাদের ব্যয় হচ্ছে অনেক কম।
দ্বিতীয়ত, আছে গার্মেন্টস। এই খাতের মাধ্যমে আমাদের নিজস্ব সিস্টেমটা শক্ত আছে। অত্যন্ত নিম্ন মজুরি আয় হলেও গার্মেন্টস থাকায় বেকারত্বের চাপ কম লাগছে। বৈদেশিক মুদ্রাও আসছে।
সবচেয়ে বড়টা হলো রেমিট্যান্স। এটার কারণেই এত টাকা ডলার হয়ে দেশ থেকে পাচার হয়ে গেলেও আমরা ধসে যাইনি। অর্থনীতির এই শক্তির জায়গাগুলো বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। এর সঙ্গে আরেকটা বিষয় আছে। গত কয়েক বছরে দেশে বড় কোনো দুর্যোগ হয়নি। আবার অনেক বড় প্রকল্পের চাপও সরকার নেয়নি। এগুলো মিলিয়ে নানা ধরনের অনিয়ম সত্ত্বেও সরকার এগিয়ে যাচ্ছে।
আরেকটা বড় জায়গা হচ্ছে পাট। পাটকে গুরুত্ব দিলে, এটাকে ভিত্তি করেই আমরা শিল্প বিপ্লব ঘটাতে পারি। যা হবে আমাদের একেবারেই নিজস্ব। আমাদের যে সক্রিয় জনগোষ্ঠী আছে, যে সম্ভাবনার জায়গাগুলো আছে, ঠিকমতো পরিচালনা করলে শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, যোগাযোগ- এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য ৫ বছরই আমাদের যথেষ্ট।
মধ্যম আয়ের লক্ষ্য আমাদের কাছে কিছুই না। আমরা চাইলে ৫ বছরের মধ্যে উন্নত আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারি। অর্থনীতির মূল শক্তির জায়গাগুলো অনেক সম্পদ তৈরি করছে। এই সম্পদগুলো আমরা সুষ্ঠুভাবে বণ্টন ও কাজে লাগাতে পারলে আমরা সবদিক থেকেই এগিয়ে যেতাম।

সাপ্তাহিক : অর্থনীতির এ পর্যায়ে নির্বাচনমুখী বাজেট ও অন্যসব মিলে কি সরকারের সামনে বড় কোনো সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকছে?
আনু মুহাম্মদ : এই সরকার যত সুবিধা পেয়েছ তাতে এটা ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যর্থ সরকার। এত সুবিধা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কোনো সরকার পায়নি। এমনকি আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলোও সরকারকে তেমন কোনো সমস্যায় ফেলেনি। তবু সরকার চাপে আছে। মানুষকে চাপে ফেলছে। এটা শাসকদেরই ব্যর্থতা। তারা উন্নয়ন বলতে রাস্তাঘাট নির্মাণ বোঝায়। এমপিরা সেদিকেই হাঁটে। মানুষও তাই চায়। কিন্তু একটা পাবলিক স্কুল, পাবলিক হাসপাতাল উন্নয়নের কি ধরনের ধারক এটা তারা জনগণের কাছে প্রচার করে না। ফলে আমরা এত ভালো করেও পিছিয়ে থাকি। সরকারই এর জন্য দায়ী।
সরকারের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের জন্যই তো আমরা এত বেশি চাপে আছি। ব্যয় বাড়ছে তো বাড়ছেই। আগে যে ১০ ঘণ্টা কাজ করত এখন সে ১২ ঘণ্টা কাজ করে। আগে যে পরিবারে ২ জন কাজ করত এখন সেখানে ৩-৪ জন কাজ করছে। সে তার ব্যয় কাটছাঁট করছে। শখ-আহ্লাদ মাটি দিচ্ছে। মধ্যবিত্তরা ডিসপেনসারি থেকে ওষুধ নিচ্ছে, ডাক্তারের কাছে যাচ্ছে না। মানুষ ছুটির সময় পাচ্ছে না। সরকারে যারা আছে তারা যে লুটপাট চালাচ্ছে, দখল করছে তার ফলেই তো এই অবস্থা। মানুষ এর প্রতিবাদ করে কি করবে। আসবে তো আবার বিএনপি। মানুষ তাই প্রতিবাদ করে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাই একে অপরের জন্য আশীর্বাদ। তারা একজন আরেকজনের দিকে আঙুল তুলেই সব বৈতরণী পার হচ্ছে।

(সাপ্তাহিক, বর্ষ ৫, সংখ্যা ৪৭ এ প্রকাশিত)


অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। অর্থনীতিবিদ। সদস্য সচিব, তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। সাপ্তাহিককে দেয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন রামপালের কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, ফুলবাড়ির কয়লাখনি, পিএসসি ২০১২’র নানা দিক এবং সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। জাতীয় স্বার্থরক্ষার গণআন্দোলনের নেতৃত্বদানের অভিজ্ঞতা থেকে বিচার করেছেন শাহবাগের আন্দোলন ও নির্বাচনমুখী রাজনীতি নিয়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এই অধ্যাপক মতামত দিয়েছেন হলমার্কের অর্থ কেলেঙ্কারি নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা, আগামী বাজেট ও অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বিষয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিস রায়হান