বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনৈতিকভাবে এক ভয়াবহ মন্দার দিকে ঢুকছে। যা ১৯৩০ সালের গ্রেট ডিপ্রেশনের চেয়ে ভয়াবহ হতে পারে। এ পরিস্থিতি থেকে পুরো পৃথিবীকেই নতুনভাবে শিক্ষা নিতে হবে। তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব, অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে করোনা পরবর্তী অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে এসব কথা বলেন। তার সাক্ষাতের প্রথম পর্ব প্রকাশিত হল আজ।

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস এক অভূতপূর্ব অবস্থা তৈরি করেছে বিশ্বব্যাপী। এর আগে পৃথিবীজুড়ে এমন পরিস্থতি দেখা যায়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি দুনিয়া দেখেছে।

একশ বছর আগের ইনফ্লুয়েঞ্জার কথাও আমরা জানি। সেসময় পৃথিবীর কিছু কিছু এলাকা এমন পরিস্থিতি থেকে বাদ পড়েছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাস একেবারেই ভিন্নমাত্রা নিয়ে এসেছে। করোনা পুরো পৃথিবীকে গ্রাস করেছে। এর পরিণিতি কি হবে তা এখনও কেউ ধারণা করতে পারছে না। আমরা আন্দাজ করতে পারি কিন্তু পুরো পরিণতি বোঝার জন্য আমাদের সামনে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। এর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত এবং স্বাস্থ্যগত দিক রয়েছে। করোনা ভাইরাসের কারণে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, মানুষই সবচেয়ে বেশি আতঙ্কগ্রস্থ। দুনিয়াজুড়ে মানুষের উৎপাদন কমে গেছে, কৃষি বন্ধ। অথচ, মানুষ ছাড়া অন্য যে সকল প্রাণ আছে যেমন, বাতাস, ফুল, পাখি, লাতা পাতা, গাছ তাদের অবস্থা আগের চেয়ে ভাল। এ অবস্থা চলতে থাকলে তাদের অবস্থা আরও ভাল হবে। এ ধরণের পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো- একটা বড় বিষয় সকলের খেয়াল করা দরকার, এমন একটা উন্নয়ন যাত্রা পৃথিবীতে হচ্ছিল; উন্মাদনার যাত্রা পৃথিবীতে হচ্ছিল, যার ফলে পুরো পৃথিবীর সকল ধরণের প্রাণী বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছিল। সেই উন্মাদনার উন্নয়ন যাত্রায় সাধারণ মানুষও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছিল। যেভাবে বাংলাদেশে উন্নয়ন হচ্ছিল ; যেভাবে সারা পৃথিবীতে উন্নয়ন হচ্ছিল এটাকে আমি বর্জ্যবান্ধব উন্নয়ন বলি। যে উন্নয়নধারা কেবল বর্জ্য তৈরি করছে। পলিথিন বর্জ্য, পারমাণবিক বর্জ্য, বিভিন্নধরনের রাসায়নিক মারণাস্ত্রের মধ্য দিয়ে যে ধরণের বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। আর এরকম সমস্ত ধরণের বর্জ্যের নিচে পৃথিবী চাপা পড়ছে। আমাদের নদীগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে, সমুদ্র শেষ হয়ে যাচ্ছে, বাতাস দূষিত হয়ে যাচ্ছে, বন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। এই বর্জ্যের নিচে চাপা পড়ে পৃথিবীর ঠিকে থাকা কতটা নাজুক এবং সেটা যেসম্ভব নয় তা করোনা ভাইরাসের মধ্য দিয়ে দেখা যাচ্ছে। করোনা ভাইরাসের মধ্য দিয়ে যে তাগিদটা প্রবলভাবে আসবে যেভাবে পৃথিবী চলছিল, যেভাবে বাংলাদেশ চলছিল সেভাবে চলা যাবে কিনা? করোনা থামার পরে যে চলা শুরু হবে সেটার মধ্যে অবশ্যই একটা নতুন যাত্রা থাকতে হবে।

সেই নতুন যাত্রাটা কি?

নতুন যাত্রা শুরু করতে হলে আগেকার উন্নয়নের ধারণটাকে প্রশ্ন করতে হবে। যেভাবে সম্পদকেন্দ্রিক উন্নয়ন হচ্ছিল, দারিদ্র্য, বৈষম্য যেভাবে বাড়ছিল, যুদ্ধ, মারণাস্ত্র গবেষণা এবং পরিবেশ যেভাবে ধ্বংস হচ্ছিল তা বন্ধ করতে হবে। এটা কেবল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হচ্ছিল তা নয় এটা সারা পৃথিবীতেই হচ্ছে। এটা একটি দিক। এর দ্বিতীয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, পাবলিক হেলথ কেয়ার বা সর্বজন চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতকরণ। সর্বজন চিকিৎসা ব্যবস্থা বর্তমান উন্নয়ন ধারায় একেবারেই গুরুত্ব পাচ্ছিল না। আমাদের এখানে তো নয়ই বড় বড় শিল্পোন্নত দেশ সমূহের কি চিত্র দেখি? মহাপরাক্রমশালী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যার ক্ষমতার শেষ নেই। তারা বছরে মারণাস্ত্রের পেছনে যে খরচ করে তা বাংলাদেশের চল্লিশ বছরের বাজেটের সমান। এরকম বিপুল পরিমাণ অর্থ তারা খরচ করে কেবল ধ্বংসের পেছনে। সেই মার্কিন যুক্তরাষ্টে আজকে দেখা যাচ্ছে সেনিটাইজার নেই, মাস্ক নেই, ভেনটিলেটর নেই, আইসিইউ নেই। তার মানে সেখানে উন্নয়নের ধরণের বৈপরিত্য দেখছি। একটি দেশ যার পরাক্রমে সারা পৃথিবী কাঁপে সে তার নাগরিকদের সামান্যতম নাগরিক সুবিধা দিতে পারছে না। কারণ হচ্ছে, সর্বজন চিকিৎসা সুবিধা তাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে নেই। তারা অস্ত্র কিনবে, পারমাণবিক গবেষণা করবে, পাবলিক হেলথ কেয়ার নিশ্চিত করবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যখনই হেলথ কেয়ার নিয়ে কথা হয় তখনই বৃহৎ পুঁজিপতি গোষ্ঠী এর বিরোধিতা করে। বলে, আমরা এ সমস্ত কমিউনিজমের মধ্যে নেই। সবার জন্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করেছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়রভূক্ত জার্মানি, সুইডেন। এ দেশগুলো করোনা পরিস্থিতির ধাক্কা মোটামুটি সামলাতে পেরেছে। যুক্তরাষ্ট্র এত বিশাল সম্পদশালী হয়েও কিন্তু করোনায় কাবু। তারা বীমা কোম্পানি আর ওষুধ কোম্পানিকে মুনাফা দিতে গিয়ে কখনই পাবলিক হেলথ কেয়ার সিস্টেম দাঁড় করাতে পারেনি। আর আমাদের এখানে তো পাবলিক হেলথ কেয়ার সিস্টেম বলে কিছু নেই?

আনু মুহাম্মদ যোগ করেন, বাংলাদেশে পাবলিক হেলথ সিস্টেম বেসরকারি এবং বাণিজ্যিক হতে হতে এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, এখানে চিকিৎসা সাংঘাতিক রকমের বাণিজ্যিক। যে কারণে বর্তমান অবস্থায় আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি একটি বিশাল প্রাইভেট হাসপাতাল তৈরিই যথেস্ট নয়। দরকার মান সম্পন্ন পাবলিক হেলথ কেয়ার সিস্টেম। যেখানে থাকবে যথেস্ট সংখ্যক ডাক্তার, যথেস্ট সংখ্যক নার্স। তাদের জন্যও পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনও ধরণের রোগসমস্যায় সকল নাগরিক যেন স্বাস্থ্য সেবা পেতে পাওে সেজন্য ওষুধপত্র এবং সরঞ্জামাদি থাকাও জরুরি।

করোনায় সারা পৃথিবীর জন্য শিক্ষা হচ্ছে, পাবলিক হেলথ কেয়ার সিস্টেম বাণিজ্যের জন্য নয়, মুনাফার জন্য নয় এটা সকল নাগরিকের অধিকার, আর তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এর বাইরে অর্থনৈতিক দিকে কি কি পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে- ১৯৩০ সালে পৃথিবী যে বিশ্ব মন্দা বা গ্রেট ডিপ্রেশনের কবলে পড়েছিল এবারে করোনা পরিস্থিতি তার চেয়েও বড় মন্দার দিকে দুনিয়াকে ঠেলে দিয়েছে। ১৯২৯ থেকে ১৯৩২ এ সময়টা গ্রেট ডিপ্রেশন বলে পরিচিতি। সেসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শতকরা ৫০ থেকে ৬০ ভাগ কল-কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বেকারত্ব বেড়েছিল বহুগুণ। পশ্চিমা পুঁজিবাদী দুনিয়ায় সেসময় বড় ধরণের একটা পরিবর্তনের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। আমরা এখন সেসব দেশে যে ধরণের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখি, ন্যুনতম মজুরি পদ্ধতি দেখি তার অনেক কিছুই সেসময় চালু হয়েছিল। সে সময় আমেরিকায় সেফটি নেট প্রোগ্রাম নেয়া হয়েছিল রুজভেল্টের নেতৃত্বে। ইউরোপের অনেক দেশেও তখন সোশ্যাল ওয়েল ফেয়ার প্রেগ্রাম হাতে নেয়া হয়েছিল। এরপরও একটি বড় মন্দা এসেছিল ২০০৮-২০০৯ সালে। সে পরিস্থিতিও পৃথিবী কাটিয়ে ওঠেছে। কিন্তু বর্তমানে আমরা যে মন্দার মধ্যে ঢুকতে যাচ্ছি তা গ্রেট ডিপ্রেশনের চেয়ে আরও ভয়াবহ এবং বিস্তৃত হবে। কারণ, তা হয়েছিল পুঁজিবাদের নিজস্ব একটা অন্তঃর্নিহিত সঙ্কট থেকে। সেই সঙ্কট এখনও অব্যহত আছে। করোনার ফলে তার সঙ্গে যোগ হয়েছে, পুরো পৃথিবী এখন বাধ্যমূলকভাবে বন্ধ। সকল প্রকার বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং বিপনন বন্ধ। বেকারত্ব বিরাট আকার ধারণ করেছে। সুতরাং, এই মন্দার মাত্রা পরিমাণগত এবং গুনগত উভয়দিক থেকেই একেবারে ভিন্নতর। আগের যে কোনও মন্দার সঙ্গে এটাকে মিলানো যাবে না।

(০৪ এপ্রিল ২০২০ তারিখে দৈনিক মানবজমিনে প্রকাশিত)