ফরাসি অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটির ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি বা একুশ শতকের পুঁজি শিরোনামে বৃহৎ কলেবরের বইটি ২০১৩ সালে ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত হয়। পরের বছর প্রকাশিত হয় এর ইংরেজি অনুবাদ। প্রকাশের পর এটি বহুল আলোচিত হতে থাকে এবং নানা বিতর্ক সত্ত্বেও কয়েক দশকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাজ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর মধ্যে আরও বহু ভাষায় এর অনুবাদ হয়েছে। শিরোনামের বইটি বাংলাভাষায় পিকেটির একুশ শতকের পুঁজির সংক্ষিপ্ত ভাষ্য হিসেবে উপস্থাপিত।ফরাসি অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটির ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি বা একুশ শতকের পুঁজি শিরোনামে বৃহৎ কলেবরের বইটি ২০১৩ সালে ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত হয়। পরের বছর প্রকাশিত হয় এর ইংরেজি অনুবাদ। প্রকাশের পর এটি বহুল আলোচিত হতে থাকে এবং নানা বিতর্ক সত্ত্বেও কয়েক দশকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাজ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর মধ্যে আরও বহু ভাষায় এর অনুবাদ হয়েছে। শিরোনামের বইটি বাংলাভাষায় পিকেটির একুশ শতকের পুঁজির সংক্ষিপ্ত ভাষ্য হিসেবে উপস্থাপিত।বইটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো, অষ্টাদশ শতক থেকে ২০১০ একটি দীর্ঘ সময় বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন দেশে বিশেষত শিল্পোন্নত বিশ্ব তথা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য মাত্রা ওঠানামা অনুসন্ধান করা। কখন কোথায় বৈষম্য বাড়ছে, কোথায় কমছে; বিভিন্ন কালে কখন কোন অঞ্চলে বেড়েছে, কোন অঞ্চলে কমেছে- এই বিষয়ে মূল মনোযোগ দিয়েই বইটি লেখা। এ বিষয়ে কুজনেতস তত্ত্ব, অ্যাংগুস ম্যাডিসনের কাজ পর্যালোচনা করেই পিকেটি তার অনুসন্ধান শুরু করেছেন। উন্নয়ন অর্থশাস্ত্রে বহুল পরিচিত কুজনেতস রেখার সারকথা হলো, প্রবৃদ্ধি হলে প্রথমদিকে বৈষম্য বাড়লেও পরে প্রবৃদ্ধির ধারাতেই আবার বৈষম্য কমতে থাকে, এই তত্ত্ব পরীক্ষা পিকেটির কাজের অন্যতম বিষয়। কুজনেতসের সমীক্ষার ক্ষেত্র ছিল শুধু যুক্তরাষ্ট্র এবং সমীক্ষার সময়কাল ছিল ১৯১৩ থেকে ১৯৪৫। বলে রাখা দরকার যে, ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত কুজনেতসের সিদ্ধান্ত রাজনীতি নিরপেক্ষ ছিল না। পুঁজিবাদী বিশ্বে বিদ্যমান ব্যাপক বৈষম্য স্থায়ী নয়, তা থেকে শিগগিরই বের হওয়া যাবে- এ রকম আশার বাণী শোনানোর বিশেষ লক্ষ্য ছিল বলে পিকেটি মনে করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব মোকাবিলায় এটা জরুরি ছিল।
1 bTHBX9G qg0kckxXJGdbxw

যাই হোক, অনুসন্ধানে পিকেটি নিয়েছেন তিন শতকের বেশি সময় এবং অঞ্চল হিসেবে নিয়েছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকাসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের পরিসংখ্যানও যোগ করেছেন। এই বিশাল তথ্য-উপাত্ত থেকে তার সিদ্ধান্ত হলো- এই বৈষম্য ওঠানামা শুধু প্রবৃদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, কারণ বাজার প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈষম্য কমায় না। পিকেটি পুঁজি থেকে প্রাপ্ত আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পার্থক্যকে বৈষম্যবৃদ্ধির অন্যতম উৎস বলে মনে করেন। তিনি দেখিয়েছেন, যখন যেখানে বৈষম্য হ্রাস দেখা যাচ্ছে তার পেছনে রাষ্ট্রের নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা আছে। তার মানে বাজার প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈষম্য কমায় না।

ইউরোপের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে একসময়ে বৈষম্য হ্রাসের চিত্র দেখা গেলেও পিকেটি গত কয়েক দশকের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে বৈষম্য বৃদ্ধির তথ্যপ্রমাণ হাজির করেছেন। সম্পদ ও আয়ের কেন্দ্রীভবন ঘটছে মোট জনগোষ্ঠীর ১ শতাংশের হাতে এবং তা আরও বেশি মাত্রায় ঘটছে ০.১ শতাংশের হাতে। তিনি আরও দেখাচ্ছেন, ১৯৮০ দশক থেকে তথাকথিত নয়া উদারতাবাদী নীতির প্রয়োগে বিশ্বজুড়েই বৈষম্য বাড়ছে। ইউরোপের যেসব দেশ রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে বৈষম্য কমিয়ে এনেছিল তারাও নীতি পরিবর্তন বা কাটছাঁটের কারণে এর শিকার হচ্ছে।

পিকেটির এই বিশাল তথ্য-উপাত্তভিত্তিক বিশ্নেষণ নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক সম্পদ কেন্দ্রীভবন ও আয় বণ্টনের কালিক ও স্থানিক বিস্তৃত চিত্র পেতে সবাইকে সাহায্য করবে। তবে যে তিন শতক সময়কাল এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের যে বর্ণনা পিকেটি দিয়েছেন, সেই সময়ের একটি বড় অংশ ছিল ঔপনিবেশিক কাল। বিভিন্ন অঞ্চলের উপনিবেশ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র জন্ম হলেও বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ আন্তর্জাতিক একচেটিয়া পুঁজি আর সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের মধ্যেই এখনও পরিচালিত হচ্ছে। একচেটিয়া পুঁজির ব্যবস্থাপক ও প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলো নানা ছলে ও বলে পুরো বিশ্বকে পুঁজির জন্য উন্মুক্ত করেছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশে দেশে নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব সংকুচিত হয়েছে। বাংলাদেশের মতো বহু দেশে সম্পদ ও নীতিমালায় জনগণের বদলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেশি-বিদেশি বৃহৎ পুঁজির।

বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ও বৈষম্যের পেছনে ঔপনিবেশিক শোষণ, লুণ্ঠন, উপনিবেশ-উত্তর ক্ষমতার বিন্যাস, বলপ্রয়োগ, আধিপত্য, গণহত্যা, যুদ্ধ, দখল, স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির ভূমিকা অনস্বীকার্য। দারিদ্র্য, বৈষম্য, প্রাণ প্রকৃতি বিনাশ, সন্ত্রাস, গণতন্ত্রহীনতা এই সবকিছুর সঙ্গে বিদ্যমান বিশ্বের দেশে দেশে পুঁজিকেন্দ্রিক কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা গভীরভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু এসব দিকে মনোযোগ দেননি পিকেটি। পিকেটির এই অমনোযোগ বা উপেক্ষার কারণে তার বিশাল কাজে পুঁজি পুঞ্জিভবনের গতিশীল ও কাঠামোগত বিশ্নেষণ পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেছে এর ফলাফল চিত্র। তবে পিকেটি এটি জোর দিয়েই বলেছেন, বিশ্বে বৈষম্য তথা আয় বণ্টন পুনর্গঠন অর্থনীতির স্বয়ংক্রিয় ধারায় আসার বিষয় নয়, তা মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ও বৈষম্যের পেছনে ঔপনিবেশিক শোষণ, লুণ্ঠন, উপনিবেশ-উত্তর ক্ষমতার বিন্যাস, বলপ্রয়োগ, আধিপত্য, গণহত্যা, যুদ্ধ, দখল, স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির ভূমিকা অনস্বীকার্য। দারিদ্র্য, বৈষম্য, প্রাণ প্রকৃতি বিনাশ, সন্ত্রাস, গণতন্ত্রহীনতা এই সবকিছুর সঙ্গে বিদ্যমান বিশ্বের দেশে দেশে পুঁজিকেন্দ্রিক কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা গভীরভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু এসব দিকে মনোযোগ দেননি পিকেটি। পিকেটির এই অমনোযোগ বা উপেক্ষার কারণে তার বিশাল কাজে পুঁজি পুঞ্জিভবনের গতিশীল ও কাঠামোগত বিশ্নেষণ পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেছে এর ফলাফল চিত্র। তবে পিকেটি এটি জোর দিয়েই বলেছেন, বিশ্বে বৈষম্য তথা আয় বণ্টন পুনর্গঠন অর্থনীতির স্বয়ংক্রিয় ধারায় আসার বিষয় নয়, তা মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় অর্থনীতি বিষয়ে লেখালেখি খুবই কম। দুনিয়াজুড়ে বিশ্ব অর্থনীতি, অর্থশাস্ত্র বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা, তত্ত্বচর্চা, বিশ্বব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি নিয়ে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ হতে থাকলেও বাংলা ভাষায় সেগুলোর অনুবাদ বা পর্যালোচনা হাতেগোনা। বাংলাদেশে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা' নিয়ে আবেগ-উচ্ছ্বাসের কমতি না থাকলেও স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও বাংলা ভাষায় চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখার সংখ্যা খুবই কম, সেইসঙ্গে বিভিন্ন ভাষায় রচিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই অনুবাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিদারুণভাবে অনেক পিছিয়ে। অর্থনীতি শুধু নয়, সমাজ রাষ্ট্র দর্শন বিষয়ক চিন্তার বিকাশের পথে এই অভাব এক বড় প্রতিবন্ধক।

এরকম পরিস্থিতিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ মাসুম টমাস পিকেটির এই আলোচিত বই বাংলা ভাষায় উপস্থিত করে এক সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন। বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে এবং বিপুল তথ্য ও উপাত্ত সমৃদ্ধ বইটির সংক্ষিপ্ত ভাষ্য তিনি উপস্থিত করেছেন যথেষ্ট দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে। আমি আশা করি, শুধু অর্থনীতি বিষয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী নয়, আগ্রহী সব পাঠককেই এই বইটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনার সঙ্গে পরিচিত হতে সহায়তা করবে। এই পরিশ্রমী কাজের জন্য আমি মোহাম্মদ মাসুমকে অভিনন্দন জানাই এবং বইটির বহুল পাঠ কামনা করি। বইটি প্রকাশ করেছে অবসর প্রকাশনা সংস্থা।

[১৫ জানুয়ারি ২০২১ দৈনিক সমকালে প্রকাশিত]