করোনাভাইরাস নিয়ে সৃষ্ট সংকট সবার জন্য বিপদ নয়, কারও কারও জন্য অনেক সুবিধাও। যেমন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শাসকদের জন্য কয়েকটি বিষয় খুবই সুবিধাজনক হয়েছে। মহাবিপদের মুখে মানুষ ভাবছে করোনা-পূর্ব অবস্থানে যেতে পারলেই আমরা খুশি। সুতরাং আড়াল হয়ে যাচ্ছে করোনা-পূর্ব কালের রাষ্ট্রের রূপ যার কারণেই আজ এই মহামারী দুর্যোগ আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।




আরেকটা সুবিধা হচ্ছে, সরকারও বলতে পারছে যত সংকট সব নিয়ে এসেছে করোনা, আগে আমরা খুবই ভালো করছিলাম। তার ফলে করোনা-পূর্ব সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত যেসব দেশে নতুন করে অর্থনৈতিক সংকট দানা বাঁধছিল, তাদের পক্ষে এখন সব দায় করোনার ওপর ছেড়ে দেওয়া খুব সহজ হচ্ছে। তৃতীয় সুবিধা হচ্ছে, কর্তৃত্ববাদী শাসকদের প্রিয় জবরদস্তি নজরদারি ব্যবস্থা আরও জোরদার করার যুক্তি পাওয়া। করোনা মোকাবিলা করার কথা বলে সার্ভিল্যান্স বা নজরদারি মেশিন শক্তিশালী করতে তাই বহু দেশের শাসকদের বিশেষ তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। অটোমেশন ত্বরান্বিত করার উদ্যোগও বেড়েছে।

করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) সংক্রমণ হয়েছে প্রায় সব দেশে, অর্থনৈতিক তৎপরতা প্রায় থেমে গেছে। মানুষকে ঘরে থাকতে হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু একদিকে ভাইরাস সংক্রমণ, চিকিৎসা, মৃত্যু অন্যদিকে অনাহার, বেকারত্ব, দারিদ্র্য ইত্যাদি সমস্যা সব দেশে এক ধরনের হয়নি। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যেসব দেশে (ক) সরকার জনবিপদ শনাক্ত করতে, তার বিরুদ্ধে দ্রুত যথাযথ সক্রিয় ব্যবস্থা নিতে পেরেছে; (খ) সুদৃঢ় সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা আছে এবং (গ) সর্বজন বা পাবলিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা শক্তিশালী সেসব দেশের নাগরিকদের করোনাকালে জীবন ও জীবিকা দুটি ক্ষেত্রেই সংক্রমণের তুলনায় ক্ষতি অনেক কম।




উদাহরণ হিসেবে বলা যায় কিউবা, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে ও জার্মানি। ভারতের ভেতরে রাজ্য হিসেবে কেরালার নাম অবশ্যই করা যায়। এই সবগুলো শর্তেই বাংলাদেশ গুরুতর ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। প্রথমটির ব্যর্থতা এ সময়ের সুতরাং এটি এই সরকারের একান্ত নিজস্ব, পরের দুটির জন্য এযাবৎকালের সব সরকারের দায়িত্ব আছে, দায়িত্ব আছে আন্তর্জাতিক তহবিল দোকানদারদের এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশের সামাজিক চাহিদার ধরনের। প্রথমটির ব্যর্থতার পেছনে সরকারের তিনটি সমস্যা মূল ভূমিকা রেখেছে। এগুলো হলো ১. ‘সবকিছু প্রস্তুত’, ‘আমাদের প্রস্তুতিসম্পন্ন’ কিংবা ‘বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আসবে না’ এসব অর্বাচীন কথার আড়ালে ভয়াবহ আত্মসন্তুষ্টি রোগ। ২. সমস্যা অস্বীকার করার সংস্কৃতি। এমনকি কেউ কোনো সমস্যা ধরিয়ে দিলে উল্টো বৈরী ভাব এবং ৩. সরকারের সব পর্যায়ে গুণকীর্তন, তোয়াজ, স্তুতির আধিপত্য। নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের চেয়ে এই ভূমিকাতেই যেহেতু প্রাপ্তি বেশি সে কারণে স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকায় ধস।

প্রস্তুতিহীনতা বা উদ্যোগহীনতা প্রকট হয়েছে চিকিৎসা এবং খাদ্য জোগান উভয় ক্ষেত্রেই। একদিকে করোনা পরীক্ষার সামগ্রী সংগ্রহ, বুথ স্থাপন, দায়িত্ব বণ্টন, হাসপাতাল নির্দিষ্ট করা আইসিইউ-ভেন্টিলেটর প্রস্তুত রাখা, ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষাসামগ্রী প্রস্তুত রাখার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ছিল পাহাড়সমান। এরপর সমাজের বিভিন্ন সংগঠন ও গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা-মতবিনিময়-পরামর্শ করে সমন্বিত সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রেও উদ্যোগ ছিল না। উল্টো সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যেই সমন্বয়হীনতা প্রকট হয়েছে। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্র ছিল ব্যাপকসংখ্যক মানুষের জন্য বেঁচে থাকার সামগ্রী জোগান দেওয়ার ব্যবস্থা করা। কারণ করোনাভাইরাস মোকাবিলায় যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয় তাতে বিশালসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েন। যারা দিনের খরচের টাকা দিনেই আয় করে, বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু প্রয়োজন বহুজনের আয় তার থেকেও কম, তাদের সংখ্যাই গরিষ্ঠ। সরকারি হিসাবটাই আমরা যদি ধরি চার কোটি মানুষের খাদ্য কিংবা আশ্রয়ের সমস্যা আগে থেকেই ছিল। আর প্রান্তিক দরিদ্র হিসেবে ধরলে এই সংখ্যা আট কোটির বেশি। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের মানুষদের তো এমনিতেই অনিশ্চয়তায় থাকতে হয়। পরিবহন শ্রমিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের কারখানা শ্রমিক, কৃষিমজুর, দিনমজুর, হকার মূলত যাদের অস্থায়ী বা খণ্ডকালীন বা অনিয়মিত কাজ, তাদের জন্য মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। সমাজ অস্বীকৃত ভাসমান মানুষদের জন্য সংকটের কোনো সীমা নেই। সরকারি এককালীন ত্রাণের যে ঘোষণা, ‘উপহার’ প্রদানের কর্মসূচি প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।




পাশাপাশি গার্মেন্টস খাতের কথা যদি ধরি, শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন পাওয়ার কথা কিন্তু একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চুক্তিভিত্তিক নিয়মিত শ্রমিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের কাজ থাকলেও মজুরি নেই, বকেয়াও পড়ে আছে অনেক। আবার নিয়মকানুন না মেনে লে-অফ, ছাঁটাইও করা হয়েছে অনেককে। কারখানা খোলা-বন্ধের যথেচ্ছাচারে গার্মেন্টস মালিকদের সরকারের সঙ্গে দর-কষাকষির সুবিধা হতে পারে, কিন্তু তাতে শ্রমিকদের দুর্ভোগ বেড়েছে, করোনার ঝুঁকি তাদের যেমন বেড়েছে, বেড়েছে অন্যদেরও।




সব দেশে জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ একই মাত্রায় ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা আর অভূতপূর্ব বিপদের মধ্যে পতিত হয়নি। কিন্তু এ দেশের নাগরিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর নেই। সোশ্যাল সেফটি নেট বলে যেটি চালু আছে, তা সামাজিক নিরাপত্তা নয়। বিশ্বজুড়ে বহু দেশের সামাজিক নিরাপত্তার যেসব ব্যবস্থা প্রতিটি নাগরিকেরই প্রাপ্য থাকে, যেমন খাদ্য, ন্যূনতম আয় বা বেকারত্ব ভাতা, চিকিৎসা ইত্যাদি। আমি যদি কিউবার কথা বিবেচনা করি, কিউবার নাগরিকরা করোনার কারণে এ ধরনের সংকটে পড়বে না। কারণ, তাদের প্রতিদিনের মূল খাদ্য (দুধ, ডিমসহ) রাষ্ট্র যেহেতু নিশ্চিত করে, করোনার কারণে কাজ না থাকলেও তাদের অনিশ্চয়তায় পড়তে হবে না। যেহেতু সর্বজন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা সেখানে খুবই শক্তিশালী, তাই চিকিৎসার জন্যও সেখানে কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না। ইউরোপের কিছু দেশ এমনকি এশিয়ার চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনামে সামাজিক নিরাপত্তার শক্তিশালী ব্যবস্থা আছে। আর ইউরোপের যেসব দেশে সর্বজন স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী, সেসব দেশে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে সরকারের ভূমিকার কারণে। তা ছাড়া ব্রিটেনসহ বেশ কয়েকটি দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাণিজ্যিকীকরণের ‘নয়া উদারনৈতিক’ বা কট্টর পুঁজিপন্থি পদক্ষেপে তহবিল জোগান কমে গেছে, করোনা সংকটে যার ফলাফল প্রকট আকারে ধরা পড়েছে।




বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা-বলয় বা সর্বজন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা কোনোটিই কার্যকর হয়নি। কোনো নাগরিকই রাষ্ট্রের কাছ থেকে জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা পায় না। পুঁজিবাদী বিশ্বে নাগরিকদের এভাবে বাজার বা তার নিজের সামর্থ্যরে ওপর ছুড়ে ফেলার দৃষ্টান্ত কমই আছে। দক্ষিণ এশিয়াতেও নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব বাংলাদেশেই সবচেয়ে কম। কেউ যদি বেকার থাকে বা অসুস্থ থাকে রাষ্ট্রের কোনো দায়দায়িত্ব নেই। এটা রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান যে, নাগরিকদের কোনো দায়দায়িত্ব তারা নেবে না, সর্বজন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার বদলে এর অধিকতর বেসরকারীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ করবে। বিশ্বব্যাংকের ঋণ প্রকল্প আসছে, অতীতে এসব প্রকল্পের মধ্য দিয়েই স্বাস্থ্য খাতে এই বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। করোনা-সংকটকালে সরকারের যেসব দুর্বলতা, ব্যর্থতা আর উদ্যোগহীনতা-সমন্বয়হীনতা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা তাই আকস্মিক নয়।




করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে। বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। সরকারের অপরিকল্পিত লকডাউন অকার্যকর হওয়ার পরে দোকানপাট, ব্যবসা, কারখানাও খুলে দেওয়া হয়েছে। খুবই অপ্রতুল সরকারি ত্রাণ, তা নিয়েও চুরি দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হচ্ছে, পিপিই, মাস্কসহ সুরক্ষাসামগ্রী নকল-ভেজাল হচ্ছে। সুরক্ষাসামগ্রীর দুর্বলতায় ডাক্তার-নার্সরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। এত অব্যবস্থা আর সমন্বয়হীনতার মধ্যে প্রায় অরক্ষিত অবস্থায় ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ এবং বিভিন্ন সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা যেভাবে কাজ করছেন, তার জন্য আমাদের কৃতজ্ঞ থাকতেই হবে। তথাকথিত এমপি-মেয়রদের খবর পাওয়া যাচ্ছে না, বদলে সরকার পুরো নির্ভর করছে আমলাদের ওপর।




এসব অনিয়ম, অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি, সমন্বয়হীনতা যত বাড়ছে, এসব বিষয়ে খবর, মতামত, সমালোচনা, ক্ষোভ প্রকাশের প্রতি সরকারের অসহিষ্ণুতাও তত বাড়ছে। অথচ এ সংকট মোকাবিলায় অবাধ তথ্যপ্রবাহ, ভুল-অনিয়ম-দুর্নীতি চিহ্নিত করা খুবই প্রয়োজনীয়। উল্টো এই করোনাকালেও মতপ্রকাশ, করোনা নিয়ে সক্রিয়তা, সমালোচনা দমনে সরকারের সক্রিয়তা থেমে নেই। অথচ নজরদারি যন্ত্র নাগরিকদের ওপর না রেখে যদি দুর্নীতিবাজ-দায়িত্বহীন-তোয়াজকারীদের ওপর থাকত, তাহলে করোনা-সংকট এত ভয়াবহ চেহারা নিত না।




(২০ মে ২০২০ তারিখে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত)