করোনা, ক্ষুধা ও রাষ্ট্রের লাঠি

১৬ কোটি মানুষের বাস এই বাংলাদেশে। কিন্তু ভাইরাসের পরীক্ষা হয়েছে মাত্র হাজারখানেক। একজন ফেসবুক মন্তব্যে লিখেছেন, ‘স্কুলে পরীক্ষা না হলে তো আর কেউ ফেল করে না। বাংলাদেশের সেই দশা।’ সংবাদপত্রে প্রকাশিত একাধিক খবরে জানা যায়, অনেকে লক্ষণ নিয়ে যোগাযোগ করলেও টেস্ট করার সুযোগ পাচ্ছেন না। একই রকম লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন—এ রকম খবরও আছে। লক্ষণ আছে কিন্তু শনাক্ত হয়নি, অথচ এ রকম একটি ক্ষেত্রেও যদি করোনাভাইরাস আক্রান্ত সত্যি হয়ে থাকে তাহলে এর সূত্রে কতজন বিপদাক্রান্ত হতে পারেন, তা চিন্তা করাও কঠিন। এই চিকিৎসায় চিকিৎসক-নার্সদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, কিন্তু তাদেরও কোনো সুরক্ষা নেই। সরকার সমর্থক চিকিৎসকরা পর্যন্ত সংবাদ সম্মেলন করে এসব সামগ্রী নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন, কিন্তু কোনো নড়াচড়া দেখা যায়নি। এখন চীন থেকে এসেছে, দেশে সরকারের বাইরে অনেকে উদ্যোগ নিচ্ছেন।




তিন মাস হলো এই অজানা ভাইরাসের বিপদ নিয়ে বিশ্বজুড়ে কথাবার্তা হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশে প্রস্তুতি নেয়া হয়নি। বেশি আক্রান্ত দেশগুলো থেকে আসা ব্যক্তিদের জন্য কোয়ারেন্টিন,  রোগীদের জন্য আলাদা হাসপাতাল, আইসিইউ প্রস্তুত করা—এগুলো খুবই অগোছালো ও সমন্বয়হীন ছিল। বরং প্রথম থেকেই সমস্যাটি অস্বীকার করার প্রবণতা এবং সরকারের মন্ত্রীদের হাস্যকর আত্মপ্রসাদের বাণী যতটা সম্ভব ছিল সেই কাজের গতিও মন্থর করেছে। ফলে যখন প্রয়োজন ঘাড়ের ওপর, তখন তথ্য চেপে রাখা, নিয়ন্ত্রণ করা, ভয়ভীতি দেখানোর ক্ষেত্রে সরকারের সক্রিয়তা আরো বেশি দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রের লাঠি যথারীতি সক্রিয় আছে। 




স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়েছে ১৭ মার্চ থেকে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিজেরা বন্ধ করা শুরুর পর। আরো বহু প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম তখন থেকেই সীমিত করে ফেলা হয়। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তাঘাটে চলাচল কমে যায়। পরিবহন শ্রমিক, দোকান শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, হকারসহ খুদে ব্যবসায়ীরা বেকার হয়ে পড়েন। ২৬ মার্চ থেকে কারখানা ও সীমিতভাবে ব্যাংক বাদে সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। বাস, লঞ্চ, ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে লাখ লাখ বেকার গ্রামের দিকে রওনা হন। গ্রামে না গিয়ে তারা কী করবেন? ঢাকায় তাদের থাকার ব্যবস্থা এমন নয় যে তাতে করোনা থেকে বাঁচার মতো করে থাকা যাবে। ঢাকায় থাকলে শরীর অসুস্থ হলে যে চিকিৎসা হবে তাও নয়, ঢাকায় থাকলে যে খাবারের সংস্থান হবে তাও নয়। তাহলে কেন ঢাকায় থাকবেন তারা? যারা থেকে গেলেন ঢাকায়, তাদের রাস্তায় চলাচল করতে হয়, দোকান বা হাসপাতাল বা কাঁচাবাজারে যেতে হয়। কিন্তু নির্বিচারে রাস্তায় চলাচল বন্ধ করতে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মহাতত্পর। তাদের আক্রমণের শিকার বৃদ্ধ ভ্যানচালক থেকে তরুণ চিকিৎসক পর্যন্ত। সরকার-বেসরকার থেকে বেতার-টেলিভিশনে লিফলেটে মাইকে বলা হতে থাকে সবাইকে ঘরে থাকতে। কিন্তু সমস্যা দাঁড়ায় বহু মানুষের বাসস্থান এমন সব স্থানে, রাস্তায়, রেললাইনের ধারে, বস্তিতে, যেখানে তারা কীভাবে এসব শর্ত পূরণ করবে তার কোনো নির্দেশনা সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠান থেকেই আসেনি বা সরকারি দল ও অগণিত শাখা সংগঠনের এত এত লোক, তাদেরও কোনো তত্পরতা দেখা যায়নি।




সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন কেমন, কেমন তার থাকা-খাওয়া, খেলা, কাজ আর রাষ্ট্রের বা সর্বজনের অর্থ কোথায় যায়, তা নিয়ে গবেষক মাহা মির্জা যা লিখেছেন, তাতেই সারকথা পাওয়া যায়:




‘কুড়িল বস্তির কথা মনে পড়ল। খালের পাড়ে সারি সারি বাঁশের ঘর। ওইটুকু জায়গায় কত মানুষ রোজ ঢোকে, বের হয়। গায়ে গা লাগিয়ে মানুষ বাঁচে। ডাম্প করা ময়লার স্তূপে বাচ্চারা খেলে। আরবান এলিটদের নাক সিঁটকানি দেখি আর অবাক হই। তারা উপদেশ দেয়, এই জাতি নোংরা, খারাপ, থুথু ফেলার হ্যাবিট। মানলাম। কিন্তু থুথুর মধ্যে, কফের মধ্যে, আপনার ইউরেনাল লাইনের উপরে, খোলা পায়খানার কয়েক গজের মধ্যে একটা মধ্য আয়ের দেশের কত লক্ষ মানুষ জীবন যাপন করতে বাধ্য হয় বলেন তো? এলিয়েন তো নয়, আপনারই সার্ভিস প্রোভাইডার। আপনার ঠিকা বুয়া, সিঁড়ি মোছার বুয়া, সকাল বেলার হকার। প্রতিদিন আলু-টমেটো সরবরাহ করা ভ্যানওয়ালা। আপনার প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান, ডিশের লাইন ঠিক করতে আসা অল্প বয়সী ছেলেটা? কই থাকে? গুরুত্বপূর্ণ সার্ভিস দেয়া এতগুলো মানুষ কেন এমন গায়ে গা লাগিয়ে ইতরের জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়, এই প্রশ্নটা করেন না কেন? কারণ এই প্রশ্নটা করলে সিস্টেমে ধাক্কা লাগবে। আপনার পোষাবে না। আচ্ছা, এ প্রশ্নটা করেন না কেন, সামিট গ্রুপকে বসিয়ে বসিয়ে ২ হাজার কোটি টাকার বিল দেয়া যায়, এস-আলম গ্রুপের ৩ হাজার কোটি টাকা ট্যাক্স মওকুফ করে দেয়া যায়, কিন্তু সারা বছর হাড়ভাঙা খাটুনি খাটা গার্মেন্টের মেয়েগুলোকে স্ববেতনে ছুটি দেয়া যায় না কেন? প্রশ্ন করেন তো, ঢাকা-মাওয়া রুটের নির্মাণকাজে ইউরোপের তিন গুণ বেশি খরচ হয়ে যায়, অথচ একটা আইসিউ বেডের জন্যে, একটা ভেন্টিলেটরের জন্যে প্রতিদিন শত শত মানুষ এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে পাগলের মতো ছুটে কেন? বিশ্বের সর্বোচ্চ খরচের ফ্লাইওভারের দেশে প্রতি ১০০০ জন রোগীর জন্যে মাত্র ১টা হাসপাতাল বেড কেন? আমরা মজুদ করেছিলাম কম্ব্যাট ফাইটার্স, এয়ার মিসাইল সিস্টেম, মিগ ২৯। এখন আমাদের ফ্রন্ট লাইনের চিকিৎসকরা হাহাকার করছেন, মাস্ক নাই, কিট নাই, বেড নাই, আইসিইউ নাই। প্রায় দুই মাসের মতো অমূল্য সময় পাওয়ার পরেও আমাদের হাসপাতালগুলো আনপ্রটেক্টেড কেন? প্রয়োজনীয় গ্লাভস, মাস্ক, স্যানিটাইজার আর টেস্টিং কিট মজুদ করা গেল না কেন? প্রশ্ন করেন তো রাশিয়ার সঙ্গে ৮ হাজার কোটি টাকার আর্মস ডিল করা যায়, বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতের বেহুদা লোকসান সামলাতে পাবলিক ফান্ড থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকিও দেয়া যায়, অথচ এমন ভয়ানক বিপদের দিনেও এই শহরের খেটে খাওয়া মানুষদের জন্যে ফ্রি-তে চাল-ডাল সরবরাহ করা যায় না কেন?’




বাংলাদেশে নিয়মিত বেতন ও মজুরি পেয়ে কাজ করেন এ রকম মানুষ সংখ্যায় খুবই লঘিষ্ঠ। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ স্বনিয়োজিত। আসলে টুকটাক অর্থনীতিই বাংলাদেশের প্রধান জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার অবলম্বন। কেউ টুকরা ব্যবসা, কেউ এখানে সেখানে কাজ করে, বহুতল ভবনে ঝুলে, ভদ্রলোকদের সেবা করে নিজেদের আয় খুঁজতে চেষ্টা করেন। কোনোটাই স্থায়ী নয়, কোনোটাই নিয়মিত নয়। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, কৃষি শিল্প আর পরিষেবা খাতে প্রায় ছয় কোটি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে পাঁচ কোটি মানুষই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে অর্থাৎ যাদের নিয়মিত আয় নেই। যাদের জীবিকা নির্ভর করে প্রতিদিনের হাড়ভাঙা কাজের ওপর। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে আবার নারীর অনুপাত বেশি। করোনাভাইরাসের আক্রমণে এই কোটি কোটি মানুষ এখন দিশেহারা। করোনা ছাড়াই তাদের জীবন বিপন্ন। এদের জন্য রাষ্ট্র কী ব্যবস্থা গ্রহণ করল?




করোনা বিস্তারের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ভারতের




কথাই যদি বলা যায়, সেখানে আগামী তিন মাসের জন্য ৩ রুপি কেজি দরে চাল এবং ২ রুপি কেজি দরে গম দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়া চুক্তিবদ্ধ সব অস্থায়ী কর্মীকে পুরো মাসের বেতন দেয়া হবে। এর বাইরে ভারতে বিভিন্ন রাজ্য সরকার নিজ নিজ অবস্থান অনুযায়ী আরো সমর্থন ঘোষণা করেছে। কেরালায় ২০ হাজার কোটি রুপির কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে, যার অন্তর্ভুক্ত হলো দরিদ্র নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা, ঋণ, বিনা মূল্যে খাদ্য, ভর্তুকিতে খাদ্য এবং বকেয়া পরিশোধ। পশ্চিমবঙ্গেও স্পষ্ট কিছু কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।  




যুক্তরাষ্ট্র ২ ট্রিলিয়ন (২ লাখ কোটি) মার্কিন ডলারের এক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যার একটা বড় অংশ বোয়িংসহ বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীই পাবে। তবে সেখানেও কাজ হারানো বা আয় কমে যাওয়া মানুষের কিছু সমর্থন দেয়ার অংক আছে।  




কিন্তু বাংলাদেশে এ রকম কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। একমাত্র স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা রফতানিমুখী শিল্প, যা প্রধানত তৈরি পোশাক শিল্প তার জন্য বরাদ্দ। তার বিতরণ বিধিও জানানো হয়নি। গার্মেন্ট মালিকদের দাবি সরকারের কাছে সবসময়ই অগ্রাধিকার পায়, এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। এই পোশাক কারখানার অধিকাংশ খোলা, যেগুলো বন্ধ সেগুলোর মজুরি সবার পরিশোধ হয়নি। সামনে কতজন ছাঁটাই হবে সেটা নিয়ে সবারই উদ্বেগ। এর বাইরে যে হাজার হাজার ছোট কুটির শিল্প আছে, যেগুলো দেশের চাহিদা মেটায় এবং যারা কখনই কোনো সরকারি সুবিধা পায় না এবং যাদের এখন পথে বসার দশা, তাদের জন্য কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। বাকি সারা দেশের মানুষের জন্য ডিসি সাহেবদের বলে দেয়া হয়েছে, এখন পর্যন্ত সেখানে বরাদ্দ ৭ দশমিক ৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের জন্য সুবিধা ঘোষণা করেছে। কিন্তু যথারীতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রতি তাদের কোনো নজর নেই। ‘এমপি’ সাহেবদের যে বড় অংকের থোক বরাদ্দ দেয়া আছে সেগুলোও বর্তমান সংকটে কোনো কাজে লাগানোর ঘোষণা নেই।  




করোনাভাইরাসে বিশ্বের কয়েকশ কোটি মানুষ যখন শুধু মৃত্যুভয় নয়, অনাহার আর দারিদ্র্যের ভয়াবহতার মুখোমুখি, তখন বিভিন্ন রাষ্ট্র বিশেষ বরাদ্দ ঘোষণা করছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভূমিকার র্যাংকিং করলে দেখা যায় বাংলাদেশ সবচেয়ে নির্মম ও নির্লিপ্ত ভূমিকা গ্রহণ করেছে। এ দেশে যে কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ বাস করে, তা রাষ্ট্রের কর্ণধারদের চিন্তার মধ্যে আছে বলেই মনে হয় না।

(০১ এপ্রিল ২০২০ তারিখে দৈনিক বণিক বার্তায় প্রকাশিত)

Footer 1

Anu Muhammad
Professor of Economics
Jahangirnagar University

আনু মুহাম্মদ, Anu Muhammad

Footer 2

প্রচ্ছদপ্রবন্ধবই পত্রবক্তৃতাসাক্ষাৎকার • ভিডিও চিত্র | Landing
Email: This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

Developed by AM.Julash