‘আমাদের আর কী হবে? আল্লাহই বাঁচাবে, মরণ এলে কি আর বাঁচাতে পারবে কেউ?’ এরকম কথা অনেকের মুখেই শোনা যায়, কিন্তু সবাই একই কারণে বলেন না। শ্রমজীবী মানুষ যাদের দিন এনে দিন খেতে হয়, বাইরে না বের হলে না খেয়েই মরার অবস্থা যাদের বর্তমান সংকটকালে তারা এই ধরনের কথা বলেন বুকে বল আনার জন্য। প্রকৃত চিত্র তুলে ধরলে, বা তাদের বিকল্প ব্যবস্থার কিছু উপায় দিতে পারলে তারাও নিয়মকানুন মেনে চলবেন। কিন্তু সংকটকালে কারও ওপর যদি ভরসা করা না যায় তাহলে নিজ জ্ঞান/কা-জ্ঞান আর আল্লাহ ভরসা ছাড়া মানুষেরই বা আর কী করার থাকে?

তবে মানুষের এই অসহায়ত্বের সুযোগও নেয় অনেকে, বিশেষত অপরাধীরা।

যখন ঝড় জলোচ্ছ্বাসে দুর্বল মানুষেরা মরতে থাকে অরক্ষিত থাকার কারণে, কিংবা সড়ক-লঞ্চ ‘দুর্ঘটনা’ শত হাজার মানুষ মরে সড়ক, পরিবহন ইত্যাদিতে ভুল নীতি আর মহা লুটপাটের কারণে, খুনি ধর্ষকদের অবাধ রাজত্ব তৈরি হয় সমাজে ক্ষমতাবানদের কারণে, এই সময়গুলোতে কিছু লোক পাওয়া যায় যারা উঁচু গলায় বলে, ‘এগুলো আল্লাহর গজব’, ‘পাপের শাস্তি’। অথচ এসব কথায় কোনো বিবেচনা থাকে না যে, কে পাপ করল আর মরল কে? পাপ তো বটেই, যে উন্নয়ন ধারা মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন করে তা তো পাপই, তার জন্য যে বিপদ নেমে আসে তাতো গজবই। কিন্তু যাদের কারণে দেশ ও মানুষ অরক্ষিত, যাদের লোভ আর লাভের কারণে সড়কে প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষ মরে, যাদের কারণে দেশের নদী বন নষ্ট বা উধাও হয়ে সারা দেশের মানুষ আরও বেশি অসুস্থ আরও বেশি নাজুক হয়ে যাচ্ছে, যাদের কারণে নারী-শিশু নিরাপত্তাহীন সেই তারা তো মহা আরামেই থাকে, তারা নিয়মিত হারাম টাকা উপার্জন করলেও এদের বিরুদ্ধে কখনো বুলন্দ আওয়াজ শোনা যায় না। তারা নিয়মিত দোয়াও কিনতে থাকে। অন্যদিকে গজব পাপ বলে মানুষকে তাদের দুর্ভোগের কারণ বুঝতে দেওয়া হয় না, রক্ষা করা হয় দুর্বৃত্তদের।

করোনা নিয়েও এরকম কথা শোনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এটা অমুসলমানদের ওপর আল্লাহর গজব, এতে মুসলমানদের কোনো ক্ষতি হবে না। সৌদি আরবে মসজিদ বন্ধ, ইরানে হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত, বিভিন্ন দেশে মৃতদের মধ্যেও আছে অনেক মুসলমান। তারপরও এসব মানুষ-বিদ্বেষী ভ্রান্ত কথাবার্তা চলছেই।

আর বিশ্বে আজ যে ভয়াবহ মারণাস্ত্র গবেষণায় আকাশ বাতাস পানি জমিন বিপর্যস্ত, যে পারমাণবিক বর্জ্য আর ইলেকট্রনিক বর্জ্যে মানুষের বিপদবৃদ্ধি সেই উন্নয়ন বা সেই মুনাফার আর ক্ষমতার উন্মাদনার মধ্যে যারা কর্তা তাদের মধ্যে যেমন বিশ্বাসী আছে, তেমনি আছে অবিশ্বাসী; আছে ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু, মুসলমান সবাই। তারা দুনিয়ার মানুষের ১ শতাংশ। আর যারা বিপদে, যারা বিপন্ন মানুষ, তাদের মধ্যেও বিশ্বাসী আছে, আছে অবিশ্বাসী; আছে ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু,  মুসলমান, তবে তারাই দুনিয়ার মানুষের ৯৯ শতাংশ। ধর্ম বা বিশ্বাস দিয়ে যেমন পাপী বা নিপীড়কদের ভাগ করা যায় না তেমনি ভাগ করা যায় না মজলুম মানুষদেরও। আর শুধু মানুষই নয়, বর্তমান মুনাফা উন্মাদ বিশ্বযাত্রার শিকার জগতের সব প্রাণ।

যাইহোক, দুনিয়া জুড়ে করোনা ভাইরাস ছড়াবার প্রাথমিক সময় ছিল জানুয়ারি মাস। সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে আমরা বরাবর শুনেছি যে, করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আড়াই মাস পরে জেনেছি দেশের বড় বড় হাসপাতালেই এসব রোগী আলাদা করে রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। ডাক্তার-নার্সদের সুরক্ষা পোশাক নেই। রোগ পরীক্ষার কিট নেই। এই সময়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব উদ্যোগও ছিল না। আসলে সারাক্ষণ ওপরওয়ালাকে তোয়াজ করতে ব্যস্ত থাকলে সামান্য দায়িত্ব পালনেরই বা সময় কোথায় থাকে? মার্চ মাসের শেষের দিক থেকে পরীক্ষা কিট, সুরক্ষা পোশাক বিদেশ থেকে আসতে শুরু করেছে। দেশের মধ্যেও এগুলো তৈরির বিভিন্ন উদ্যোগ দেখা গেছে। তবে এখনো রোগ পরীক্ষা খুব নিয়ন্ত্রিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলছে ব্যাপক সংখ্যায় পরীক্ষা করতে, কারণ পরীক্ষা না করলে তো বোঝাও যাবে না, ব্যবস্থাও নেওয়া যাবে না। সেখানেই বাংলাদেশের বড় ঘাটতি। পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে। এখন পরিস্থিতি এমন যে, অন্যান্য অসুখেও রোগীদের চিকিৎসা পাওয়া দুরূহ। 

শুধু বাংলাদেশ নয়, পাবলিক বা সর্বজনের চিকিৎসা অবকাঠামো পুঁজির আঘাতে বহু জায়গাতেই বিপর্যস্ত। ব্রিটেনকে এখন তাই আড়াই লাখ স্বেচ্ছাসেবক ডাকতে হচ্ছে। বাংলাদেশে তো এই ব্যবস্থা দাঁড়ায়ইনি। বাণিজ্যিকীকরণে পাবলিক বা সর্বজনের চিকিৎসা ব্যবস্থা দিন দিন আরও কোণঠাসা। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার নেতা যুক্তরাষ্ট্রের মতো সম্পদশালী দেশ সারা দুনিয়ায় সামরিক ঘাঁটি চালাচ্ছে, অথচ নিজ দেশে তার হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই। কারণ সেখানে সর্বজনের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা দাঁড়ায়নি, বীমা কোম্পানি আর ওষুধ কোম্পানির মুনাফা জোগাতে গিয়ে সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই ব্যবস্থা সবার জন্য চিকিৎসা নিশ্চিত করা থেকে অনেক দূরে। আর যে ছোট্ট দেশ কিউবাকে ছয় দশক ধরে অবরোধ করে রেখেছে মহাপরাক্রমশালী যুক্তরাষ্ট্র তারা সর্বজনের শক্তিশালী চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করায় এখন নির্ভার, এখন তারাই অন্য দেশগুলোকে ডাক্তার, চিকিৎসা উপকরণ, দুর্লভ ওষুধ দিয়ে সহযোগিতা করছে।    

করোনাভাইরাসের যথাযথ ওষুধ এখনো আবিষ্কার হয়নি, কাজ করছেন অনেকেই। তবে এই ভাইরাসে আক্রান্তরা যথাযথ চিকিৎসা সমর্থন পেলে শতকরা ৯০ ভাগই বেঁচে যান। এই সমর্থনের জন্য যে চিকিৎসা অবকাঠামো দরকার তা বাংলাদেশে নেই বলে ব্যাপক হারে এই ভাইরাসের আক্রমণ শুরু হলে আমাদের বিপদ অনেক বেশি হবে। তাই রোগাক্রান্ত না হওয়ার চেষ্টাই আমাদের জন্য বেশি জরুরি। এর জন্য সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা, হাত ধোয়া ইত্যাদি নিয়ম মেনে চলা, যাতায়াত, যোগাযোগ যথাসম্ভব বন্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ১৭ মার্চ থেকে পর্যায়ক্রমে সেসব সিদ্ধান্ত সরকার দেরিতে হলেও নিয়েছে। কিন্তু এর ফলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের যে অস্তিত্বের সংকট তৈরি হলো সে বিষয়ে সরকারের কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত দেখা গেল না।   

স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়েছে ১৭ মার্চ থেকে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিজেরা বন্ধ করা শুরুর পর। আরও বহু প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম তখন থেকেই সীমিত করে ফেলা হয়। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তাঘাটে চলাচল কমে যায়। পরিবহন শ্রমিক, দোকান শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, হকারসহ ক্ষুদে ব্যবসায়ীরা বেকার হয়ে পড়েন। ২৬ মার্চ থেকে কারখানা ও সীমিতভাবে ব্যাংক বাদে সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাস, লঞ্চ, ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে লাখ লাখ বেকার মানুষ গ্রামের দিকে রওনা হন। গ্রামে না গিয়ে তারা কী করবেন? ঢাকায় তাদের থাকার ব্যবস্থা এমন নয় যে, তাতে করোনা থেকে বাঁচার মতো করে থাকা যাবে। ঢাকায় থাকলে শরীর অসুস্থ হলে  যে চিকিৎসা হবে তাও নয়, ঢাকায় থাকলে যে খাবারের সংস্থান হবে তাও নয়। তাহলে কেন ঢাকায় থাকবেন তারা? যারা থেকে গেলেন ঢাকায় তাদের রাস্তায় চলাচল করতে হয়, দোকান বা হাসপাতাল বা কাঁচাবাজারে যেতে হয়। কিন্তু রাস্তায় চলাচল বন্ধ করতে পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নির্বিচারে মহাতৎপর। তাদের আক্রমণের শিকার বৃদ্ধ ভ্যানচালক থেকে তরুণ ডাক্তার পর্যন্ত। সরকার-বেসরকার থেকে বেতার টেলিভিশনে লিফলেটে মাইকে বলা হতে থাকে সবাইকে ঘরে থাকতে। কিন্তু সমস্যা দাঁড়ায় বহু মানুষের বাসস্থান এমন সব স্থানে, রাস্তায়, রেললাইনের ধারে, বস্তিতে যেখানে তারা কীভাবে এসব শর্ত পূরণ করবে তার কোনো নির্দেশনা সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠান থেকেই আসেনি। বা এই কাজে গঠিত ৫০০ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির (!) কোনো তৎপরতাই দেখা যায়নি।

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, কৃষি শিল্প আর পরিষেবা খাতে প্রায় ৬ কোটি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ৫ কোটি মানুষই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে অর্থাৎ যাদের নিয়মিত আয় নেই। যাদের জীবিকা নির্ভর করে প্রতিদিনের হাড়ভাঙা কাজের ওপর। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে আবার নারীর অনুপাত বেশি। করোনাভাইরাসের আক্রমণে এই কোটি কোটি মানুষ এখন দিশেহারা। করোনা ছাড়াই তাদের জীবন বিপন্ন। করোনা বিস্তারের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এরকম কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। একমাত্র স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা রপ্তানিমুখী শিল্প যা প্রধানত তৈরি পোশাক শিল্প তার জন্য বরাদ্দ। তার বিতরণ বিধিও জানানো হয়নি। গার্মেন্টস মালিকদের দাবি সরকারের কাছে সবসময়ই অগ্রাধিকার পায়, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এই পোশাক কারখানার অধিকাংশ খোলা, যেগুলো বন্ধ সেগুলোর সবার মজুরি পরিশোধ হয়নি। সামনে কতজন ছাঁটাই হবে সেটা নিয়ে সবারই উদ্বেগ। এর বাইরে যে হাজার হাজার ছোট কুটির শিল্প আছে, যেগুলো দেশের চাহিদা মেটায় এবং যারা কখনোই কোনো সরকারি সুবিধা পায় না এবং যারা এখন পথে বসার দশা তাদের জন্য কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের জন্য সুবিধা ঘোষণা করেছে। কিন্তু যথারীতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রতি তাদের কোনো নজর নেই। ‘এমপি’ সাহেবদের যে বড় অংকের থোক বরাদ্দ দেওয়া আছে সেগুলোও বর্তমান সংকটে কোনো কাজে লাগানোর ঘোষণা নেই।

সরকারের বাইরে বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন, ব্যক্তি গোষ্ঠী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বেকার শ্রমজীবী মানুষকে সহায়তা করতে নানা উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এসেছেন, সেটাই এখন পর্যন্ত ভরসা। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল, আর এতে সরকারের দায়ও কমে না। সর্বজনের টাকা কেন সর্বজনের বিপদে তাদের জন্য খরচ হবে না?

(৩১ মার্চ ২০২০ তারিখে দৈনিক দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত)