প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ভয়ংকর আক্রমণের মধ্যে সুন্দরবনই প্রধান ভরসা উপকূলের মানুষদের। এই সুন্দরবনের জন্য বারবার বাঁচে বহু লক্ষ মানুষের জীবন ও সম্পদ। অসংখ্য শিশু, নারী, পুরুষ বেঁচে থাকার সুযোগ পান। ‘উন্নয়নের’ নামে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার আর তাদের দেশি-বিদেশি সহযোগীরা এই সুন্দরবনকেই নাই করে দিতে উদ্যত। রামপালসহ সুন্দরবনবিনাশী শত প্রকল্প ঘিরে ফেলেছে এই

প্রাকৃতিক অসাধারণ রক্ষাবর্মকে।

৯ নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল আবারও প্রত্যক্ষ করল সুন্দরবনের শক্তি। যারা দেখেও দেখে না, বুঝেও বুঝতে চায় না, তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ সুন্দরবন কী, কেন তার কোনো বিকল্প নেই! ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশ উপকূল পার হয়ে যাওয়ার পর আবহাওয়া অধিদপ্তর সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, ‘ঘূর্ণিঝড়ের তিন দিক জুড়েই ছিল সুন্দরবন। সুন্দরবনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের নিজস্ব শক্তিও কমে আসে। এ কারণে উপকূল অতিক্রম করতে গিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের দীর্ঘক্ষণ সময় লেগেছে। ফলে পূর্ণ শক্তি নিয়ে বুলবুল বাংলাদেশের স্থলভাগে আঘাত করতে পারেনি।’ এরকম বুক পেতে দেওয়া সুন্দরবনকে আমরা বহুবার দেখেছি। সর্বশেষ এর আগে ‘২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা একইভাবে সুন্দরবনে বাধা পেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।’

কিন্তু সবাই বুঝলেও একমাত্র সরকার এই প্রবল সত্য বুঝতে অনিচ্ছুক। সরকারের কাছে বিশ্বঐতিহ্য আমাদের রক্ষক সুন্দরবন রক্ষার চাইতে ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা দেওয়া, তাদের কথা শোনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। তাই গত ১০ বছরে বহুরকম তথ্যপ্রমাণ হাজির করা সত্ত্বেও সরকার বুঝতে অরাজি যে, সুন্দরবন বিনাশ মানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির মুখে বাংলাদেশ অরক্ষিত হয়ে যাওয়া।

 

কে অস্বীকার করতে পারে যে, লবণ ও মিষ্টি পানির সমন্বিত প্রবাহে, ভূমি ও নদীর সম্মিলিত যোগে সুন্দরবন এক বিশেষ বাস্তুসংস্থান যা বিশ্বে বিরল এবং সেই কারণে প্রাণবৈচিত্র্যে তার সমাহার অনেক বেশি? পরিবেশ দূষণ হ্রাসেও তার ক্ষমতা অনেক। একদিকে তা খুব নাজুক উচ্চ সংবেদনশীলতার কারণে, আবার তা প্রবল শক্তিধর প্রকৃতির দুর্যোগ মোকাবিলায় তার ক্ষমতার কারণে। সেজন্যই বাংলাদেশের সুন্দরবন শুধু এদেশের নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্যই এক অতুলনীয় সম্পদ; সে কারণেই বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এবং বিশ্বঐতিহ্য এই সুন্দরবন এক অসাধারণ প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর হিসেবে কাজ করে; সে কারণেই উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫ কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদ এই সুন্দরবনের অস্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল। আমরা সবাই জানি বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ অন্যতম বিপদগ্রস্ত দেশ। এই বিপদের মোকাবিলায়ও আমাদের সবচেয়ে বড় অবলম্বন এই সুন্দরবন। তাছাড়া ৩৫-৪০ লক্ষ মানুষ তাদের জীবন-জীবিকার জন্য সুন্দরবন সংলগ্ন নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল। এগুলো বিনষ্ট হলে তাদের উদ্বাস্তু হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না। আমাদের হিসাবে প্রতিদিনই ঢাকা শহরে উন্নয়ন-দুর্যোগে বা পরিবেশ উদ্বাস্তু হিসেবে মানুষের ভীড় বাড়ছে। তাদের সংখ্যা বহুগুণ বাড়বে যদি সুন্দরবনের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়। কিন্তু এসব সত্য কেউ অস্বীকার করতে না পারলেও সরকার গায়ের জোরে তা অস্বীকার করেই যাচ্ছে।

শত ব্যাখ্যা-যুক্তি-প্রতিবাদ সত্ত্বেও এই সুন্দরবনকে হুমকির মধ্যে ফেলে সুন্দরবনের আঙিনায় বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প করা হচ্ছে। দেশ-বিদেশের বহু বিশেষজ্ঞ বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা পরিবহন ও কয়লা পোড়ানোতে যে পানি, বায়ু এবং মাটি দূষণ হবে তাতে সুন্দরবনের অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে বিপন্ন হবে। শুধু তাই নয়, সুন্দরবনের ‘ইকোলজিকালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া’ বলে স্বীকৃত অঞ্চলেও শতাধিক বনগ্রাসী-ভূমিগ্রাসী বাণিজ্যিক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান টেলিটক অবিশ্বাস্য উদ্যোগ নিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে ৮টি টাওয়ার বসানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বিষাক্ত পণ্যবাহী জাহাজ পরিবহন এখনো অব্যাহত আছে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত পশুর নদীতে বারবার কয়লাবাহী, ছাইবাহী, তেলবাহী জাহাজ ডুবে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এর পরিণতিতে দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের বিপর্যয় সম্পর্কে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা। এইসব জাহাজডুবির পর, প্রতিটি ক্ষেত্রে, সরকারের ভূমিকা ছিল ন্যক্কারজনক।

 

আমরা এসব বিষয়ে অনেক দলিলপত্র বিভিন্ন সময়ে সরকারের কাছে উপস্থাপন করেছি, প্রধানমন্ত্রীর কাছেও এ বিষয়ে খোলাচিঠিতে সরকারি দাবির অসারতা খ-ন করে বিস্তারিত জানিয়েছি। এসবের কোনো জবাব আমরা পাইনি। উল্টো সরকার থেকে একই ভুল বারবার বলা হচ্ছে। ইউনেস্কোসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা একই বৈজ্ঞানিক তথ্য-যুক্তি দিয়ে একই ধরনের উপসংহারে আসছে বারবার। প্রকৃতপক্ষে সুন্দরবন বিনাশী রামপাল প্রকল্প এবং তার টানে আরও শত শত লোভী আয়োজনের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হয়েছে অনেক আগেই, এখন এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক ঐকমত্যও তৈরি হয়েছে। জলজ্যান্ত সত্য অস্বীকারের সংস্কৃতি, ক্রমাগত ভুল তথ্য উপস্থাপন আর আত্মঘাতী একগুঁয়েমির কারণে সরকার সমস্যা আরও জটিল করছে।

আমরা এটাও দেখিয়েছি যে, ভারতীয় কোম্পানি (এনটিপিসি) নিজ দেশের আইন ভঙ্গ করে বাংলাদেশের জন্য সর্বনাশা এই প্রকল্পে চালকশক্তি হিসেবে যুক্ত হয়েছে। এনটিপিসি বাংলাদেশে সুন্দরবনের ১৪ কিমির মধ্যে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করতে যাচ্ছে। বাফার জোন বিবেচনা করলে এই দূরত্ব ৪ কিমি। অথচ ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রণীত পরিবেশ সমীক্ষা বা ইআইএ গাইড লাইন ম্যানুয়াল ২০১০ অনুযায়ী, কোনো বাঘ/হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল, জৈববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল,  জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য কিংবা অন্য কোনো সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ২৫ কিমি’র মধ্যে কোনো কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন করা যায় না। ভারতীয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ‘তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত গাইডলাইন, ১৯৮৭’ অনুসারেও কোনো সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ২৫ কিমি’র মধ্যে কোনো কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা যায় না। এজন্য গত কয়েক বছরে ভারতের কর্নাটক, মধ্যপ্রদেশ ও তামিলনাড়–তে তিনটি বিদ্যুৎ প্রকল্প আটকে গেছে। শ্রীলঙ্কাও এই কারণে তার উপকূলে এনটিপিসির একটি কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করেছে। কয়েকদিন আগে কেনিয়া একই কারণে চীনের একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করেছে।

সবার জানা কথা আমরা বারবারই বলি যে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প আছে কিন্তু সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই। সুই থেকে রকেট সবই আমরা বানাতে পারব, কিন্তু সুন্দরবন আর বানাতে পারব না। দেশি-বিদেশি কিছু গোষ্ঠীর অর্বাচীন ও লোভী তৎপরতায় এই সুন্দরবনের সর্বনাশ তাই আমরা কীভাবে মেনে নিতে পারি? বরং যে সুন্দরবন সমগ্র বাংলাদেশকে রক্ষা করে সেই সুন্দরবন রক্ষা করা আমাদের সবার অবশ্য কর্তব্য। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এটা আমাদের দায়। সেই দায় থেকেই গত দশ বছর ধরে আমরা সুন্দরবনবিনাশী সকল অপতৎপরতা বন্ধ করবার জন্য সরকারকে বারবার অনুরোধ করছি। বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে বহু বিকল্প প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

 

বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে অনেক ভালো পথ অবশ্যই আছে। সর্বজনের সম্পদে শতভাগ জাতীয় মালিকানা ও শতভাগ সম্পদ দেশের কাজে ব্যবহার, দুর্নীতি করবার দায়মুক্তি আইন বাতিল করে ‘খনিজসম্পদ রপ্তানি নিষিদ্ধকরণ আইন’ প্রণয়ন, পিএসসি প্রক্রিয়া বাতিল করে স্থলভাগে ও সমুদ্রে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে জাতীয় সংস্থাকে প্রয়োজনীয় সুযোগ, ক্ষমতা ও বরাদ্দ প্রদান, রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট মেরামত ও নবায়ন, উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি নিষিদ্ধসহ ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ, নবায়নযোগ্য ও অনবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পদের সর্বোত্তম মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি জ্বালানি নীতি প্রণয়ন, দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি মূলধারায় নিয়ে আসা ইত্যাদিই যথাযথ পথ। এর মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই, সুলভ, নিরাপদ এবং জনবান্ধব উন্নয়ন ধারা তৈরি করতে সম্ভব। ২০১৭ সালে এ জন্য ‘তেল গ্যাস খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’ একটি বিকল্প খসড়া পরিকল্পনাও প্রকাশ করেছে, সরকারের কাছেও তা জমা দেওয়া হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন করলে কদিন পরপর গ্যাস আর বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হয় না, পরিবেশবিনাশী প্রকল্প দিয়ে বাংলাদেশকে বিপদগ্রস্ত করতে হয় না। বরং সুলভে পরিবেশবান্ধব উপায়ে দেশের শতভাগ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে।

কিন্তু সরকার যাচ্ছে উল্টোপথে : ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ, বন-পানি-মানুষ-পরিবেশবিধ্বংসী এবং ঋণনির্ভর প্রকল্পে। এতে কিছু দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর লাভ হলেও দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে ভয়াবহ অনিশ্চয়তা, বিপদ ও বিপন্নতার দিকে। এগুলো মানববিধ্বংসী অস্ত্রের মতোই মানুষ ও প্রকৃতি বিধ্বংসী প্রকল্প। গায়ের জোরে যতই ঢোল পেটানো হোক দেশকে যা বিপন্ন করে তা উন্নয়ন নয়! যেসব প্রকল্প সুন্দরবনসহ নদী বন ধ্বংস করে তা উন্নয়ন নয়, মানববিধ্বংসী প্রকল্প। তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সব নাগরিকের কর্তব্য।

( ১২ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে দৈনিক দেশরূপান্তরে প্রকাশিত)