সর্বজন বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ, অর্থ নয় মেধার ভিত্তিতে সহজে প্রবেশযোগ্য, সর্বজনের স্বার্থে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা। কিন্তু বিভিন্ন সরকারের ভূমিকা দেখে মনে হয়, এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে দেওয়ার বদলে এখানে সরকারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই লক্ষ্য। চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির জগৎ, তারুণ্য, স্বাধীন মত—এগুলোর প্রতি ভয় ছাড়া এর আর কী কারণ থাকতে পারে। এ কারণেই সরকারনির্বিশেষে সরকারি ছাত্রসংগঠনের ভূমিকা অভিন্ন দেখা যায়।

সে জন্যই হল দখলে রাখা, সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, বিভিন্ন অপরাধে সক্রিয়তা অমুক-তমুক নেতার দোষের বিষয় নয়, এগুলো ঘটে সরকারি দলের পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণে রাখার সামগ্রিক নীতিমালা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে। এই কাজ স্বচ্ছন্দে চালানোর জন্য দরকার মাস্তান তোষণকারী মেরুদণ্ডহীন লোভী কিছু ‘শিক্ষক’, সরকার তাঁদের দিয়েই তাই প্রশাসন সাজাতে চায়।

গত কয়েক বছরে এই পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। সারা দেশে একদলীয় কর্তৃত্ব, চরম অসহিষ্ণুতা ও নিপীড়নের কালে বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠেছে মাস্তান ও মেরুদণ্ডহীনদের অবাধ রাজ্য। গণরুম, গেস্টরুমের মতো টর্চার সেল গঠন করে নিজেদের ‘রিজার্ভ আর্মি’ বানানো, ভয়ের রাজত্ব তৈরি করে নিজেদের ও সহযোগী কর্তাদের যথেচ্ছাচার অবাধ করার চেষ্টাই প্রধান। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বাণিজ্যিকীকরণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের খোলের মধ্যে প্রাইভেটাইজেশনের দাপট।

তাই বহু রকম বিপদের মধ্যে আছে সর্বজন বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিলাম, এমনকি শিক্ষক হিসেবেও বহু বছর যা দেখেছি তার তুলনায় অর্থ বরাদ্দ, ভবন নির্মাণ, শিক্ষক ও বিভাগ সংখ্যা, শিক্ষার্থী সংখ্যা, প্রযুক্তির ব্যবহার, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ—সবই এখন অনেক বেশি। অর্থাৎ বলা যায় ভৌত অবকাঠামো, যোগাযোগ এবং সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে যখন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাবনা অনেক বেড়েছে, তখনই সামগ্রিক নীতিমালা ও শিক্ষা বৈরী পদক্ষেপ এসব প্রতিষ্ঠানকে অস্তিত্বের হুমকির মধ্যে ফেলেছে। কীভাবে?

প্রথমত, গত কয় বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। বিভিন্ন পুরোনো ও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগের সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু তুলনায় শিক্ষক, ক্লাসরুম, প্রয়োজনীয় উপকরণের অবিশ্বাস্য ঘাটতির কারণে বহু বিভাগই খুঁড়িয়ে চলছে কিংবা চলছে না। উপাচার্যসহ শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যেই সমস্যা বহুবিধ। ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক ক্ষেত্রে এমন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা মাসের বেশির ভাগ সময় ঢাকাতেই থাকেন। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরপর দুই উপাচার্য এর নিকৃষ্ট উদাহরণ।

দ্বিতীয়ত, গত কয় বছরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বহুসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ কথা সর্বজনবিদিত যে একজন ভুল শিক্ষক নিয়োগ হলে তার পরিণতিতে কমবেশি ৪০ বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যে ভুল/কু/অশিক্ষা প্রবেশ করে। সেই শিক্ষার্থীরাই আবার শিক্ষক বা পেশাজীবী হয়। তারা যে ভুল শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে দিকনির্দেশনা পায়, তা তাই আবার পুনরুৎপাদন করতে থাকে। এসব নিয়োগ আরও ক্ষতিকর নতুন বিশ্ববিদ্যালয় বা নতুন বিভাগের ক্ষেত্রে। শুরুতেই যদি কোনো বিভাগে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্বল ভিত্তি তৈরি হয়, তাহলে
তার ভবিষ্যৎ গতি ঠিক করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। সেটাই ঘটছে।

ভুল শিক্ষক নিয়োগের পেছনে তিনটি কারণ শনাক্ত করা যায়: ১. বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের ক্ষমতার প্রভাব/গ্রুপ দলাদলি/ভোটারের সংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিবেচনা। ২. সরকারি দলের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করা। এবং ৩. নিয়োগের ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও আর্থিক লেনদেনেরও কথা উঠছে।

তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্যিক তৎপরতা দ্রুত বাড়ছে। একের পর এক উইকেন্ড এবং ইভনিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে সর্বজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে তৈরি হচ্ছে একের পর এক প্রাইভেট বা বাণিজ্যিক বিভাগ। শিক্ষা ও গবেষণার চেয়ে অর্থ উপার্জন, টাকার পেছনে ছোটা তাই অনেক ক্ষেত্রে প্রধান প্রবণতা। দুর্নীতি-অনিয়ম জায়গা পাচ্ছে এখানেই।

চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশ্বব্যাংকের ঋণে এবং তাদের ছকে প্রণীত ২০ বছর মেয়াদি কৌশলপত্রের ধারাবাহিকতায় উচ্চশিক্ষার ‘মান উন্নয়নে’ বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। এসব কর্মসূচি অর্থ বরাদ্দ ও অর্থ ব্যয় নিয়ে যতটা ব্যস্ততা তৈরি করে, ততটা শিক্ষা ও গবেষণা নিয়ে নয়। বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন যেমন ভবন, অঙ্গসজ্জা, এসি ইত্যাদিতে ব্যস্ততা বেড়েছে; বরাদ্দ অনুযায়ী উচ্চ দরে নানা কিছু কেনাকাটা, সেগুলোর ভাউচার সংগ্রহ আর হিসাব মেলানো অনেকের এখন প্রধান ব্যস্ততা। অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল তদারকি, বানানো রিপোর্ট লেখা এবং একই জায়গায় ঘুরপাক খাওয়া, মাঝে কিছু লোকের অর্থ উপার্জনের অভ্যাস তৈরি—এগুলোই প্রধান কাজ। কোন বিভাগের কী প্রয়োজন তা নয়, কারা ভালো প্রজেক্ট জমা দিতে পারল, সেটাই এসব প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দের প্রধান পথ। কেনাকাটা শেষ, রক্ষণাবেক্ষণের বাজেট নিয়ে টানাটানিতে দামি যন্ত্রপাতি অচল হয়ে পড়ার ঘটনা অনেক পাওয়া যাবে। স্বাধীন কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনুসন্ধান চালালে এর মধ্যে অনেক অনিয়ম ধরা পড়বে। বলা বাহুল্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আনতে পারেনি এসব কর্মসূচি।

দেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন অচলাবস্থা চলছে। একের পর এক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার নিয়োজিত উপাচার্যের নেতৃত্বে নানা অপকর্মের খবর প্রকাশিত হচ্ছে; শত বাধা, হুমকি সত্ত্বেও শিক্ষার্থী এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষকেরাও প্রতিবাদ করছেন। আবরার খুনের ভয়ংকর চিত্র প্রকাশিত হওয়ার পর আরও বহু নির্যাতন সেলের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ উদ্ধারে এসব লাঠিয়াল বাহিনী এবং তার পৃষ্ঠপোষক প্রশাসন নিয়ে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা অপরিবর্তিত আছে।

দেশে চারটি পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা-জাহাঙ্গীরনগর-রাজশাহী ও চট্টগ্রাম পরিচালিত হওয়ার কথা ১৯৭৩-এর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ দ্বারা। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নির্বাচিত হওয়ার কথা থাকলেও এখন কোনোটিতেই নির্বাচিত উপাচার্য নেই। বাকি ৪০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হওয়ার আইন দ্বারাই চলছে। সেখানে সব উপাচার্য সরকারই নিয়োগ দিয়ে থাকে। দুই ধারার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই এখন তাই একাকার। অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলেন, উপাচার্য হতে গেলে সরকারের তো বটেই, এমনকি সরকারি লাঠিয়াল ছাত্রসংগঠনের সন্তুষ্টি অর্জন করাও গুরুত্বপূর্ণ।

নানা প্রতিষ্ঠানের যাচাই-বাছাইয়ের পরই উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। গোয়েন্দা সংস্থা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং আচার্য বা রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এতগুলো প্রতিষ্ঠানের ছাঁকনি দিয়ে তাদের দৃষ্টিতে যোগ্যতম ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তব অবস্থা থেকে দেখা যাচ্ছে, উপাচার্য হওয়ার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হচ্ছে সরকারের প্রতি আনুগত্যের অসীম ক্ষমতা। শিক্ষা ও গবেষণার বদলে ক্ষমতা ও অর্থের লোভ, আত্মসম্মানবোধের অভাব, মাস্তান তোষণ এবং মেরুদণ্ডহীনতা—এগুলোও বিশেষ যোগ্যতা মনে হয়। নইলে সরকার–সমর্থকদের মধ্য থেকে বেছে বেছে এ ধরনের লোকই কেন নিয়োগ দেওয়া হয়। বরিশাল, গোপালগঞ্জের ভিসিরা তাড়া খেয়ে পালিয়েছেন। রংপুরের ভিসি তো বেশির ভাগ সময় ঢাকাতেই থাকেন। রাজশাহীসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ ঘুরছে। বুয়েটের উপাচার্য, সেখানকার শিক্ষকদের পদত্যাগের দাবি সত্ত্বেও গদি আঁকড়ে বসে আছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার নিযুক্ত উপাচার্য ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে সরকারি ছাত্রসংগঠনের মাধ্যমে প্রকাশিত দুর্নীতির এত বড় অভিযোগের পরও সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন তাই অচলাবস্থা আর উত্তেজনা। নির্দোষ, দুর্নীতির কালিমামুক্ত প্রমাণ করতেও তো বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত কমিটিসহ কিছু উদ্যোগ নেওয়া সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব ছিল। কিন্তু সরকারের যথারীতি নির্লিপ্ততার কারণে পরিস্থিতির অবনতিই হচ্ছে কেবল।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সন্ত্রাস আর অচলাবস্থার মুখে নিষ্ক্রিয় থাকা কি সরকারের ইচ্ছাকৃত? দায়িত্বে অবহেলা, না প্রিয় দুর্নীতিবাজ সন্ত্রাস তোষণকারীদের রক্ষার চেষ্টা? সর্বজন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপদ নিয়ে সর্বজনের মনোযোগ না বাড়লে বিপদ বাড়বেই কেবল। এসব বিশ্ববিদ্যালয় ডুবলে ক্ষমতাবানদের কী আসে যায়?

( ০৩ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে দৈনিক প্রথম  আলোতে প্রকাশিত)