সার্বক্ষণিক ভয়ভীতি, সন্ত্রাস ও জোরজবরদস্তি উপেক্ষা করে গত ২৭ আগস্ট সন্ধ্যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের এক বিশাল মশাল মিছিল হয়। তাতে কয়েকজন শিক্ষকও যোগ দেন। যে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ক্যাম্পাসে সভা, সমাবেশ, মিছিল, আলোচনা সভা ও বিতর্ক বাড়ছে, তার মূল দাবি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিকল্পিত, অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এর কারণ ‘মাস্টারপ্ল্যান’ আর ‘অধিকতর উন্নয়ন পরিকল্পনা’র নামে সর্বজনের টাকা লুট এবং বিপজ্জনক নির্মাণকাজে কতিপয় গোষ্ঠীর তৎপরতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনা দিয়েই। আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর যে ছক করা হয়েছিল, তার মধ্যে শুধু দুটি পূর্ণাঙ্গ হল, কয়েকটি আবাসিক ভবন ও অস্থায়ী কিছু স্থাপনা দিয়েই ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে এর ক্লাস শুরু হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব নির্মাণকাজ ও সংস্কার হয়েছে, তার বেশির ভাগ হয়েছে অ্যাডহক ভিত্তিতে, তহবিল প্রাপ্যতা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। গত দুই দশকে এই ধারাতেই বেশ কয়েকটি হল ও একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। মাস্টারপ্ল্যানের মূল বিন্যাস ভেঙে স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। আর ডিজাইন ও নির্মাণকাজে অনিয়ম, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দুর্বল তদারকির কারণে বেশির ভাগ ভবনেই নানা সমস্যা দেখা যাচ্ছে ব্যবহার শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই। আলো-বাতাসের প্রাচুর্য যে ক্যাম্পাসে, তার বহু ভবনেই আলো-বাতাস ঢুকতে পারে না। যাঁরা এগুলোর জন্য দায়ী, তাঁদেরই আবার তৎপর দেখলে চিন্তিত হওয়ারই কথা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রায় ৭০০ একর এলাকার ওপর। এখানে বহু রকম ফল, ফুল ও ঔষধি গাছ আছে, আছে বহু রকম লতাগুল্ম, প্রাণী, পাখি, প্রজাপতি। লেক ও জলাভূমি থাকার কারণে আছে মাছসহ জলজ নানা প্রাণ। আসে পরিযায়ী পাখি। প্রাণবৈচিত্র্যের এ রকম সমৃদ্ধ সমাহার থাকার কারণে বহু বিভাগের জন্য এটি এক জীবন্ত গবেষণাগার। এখানে উন্নয়ন মানে যত্রতত্র যেমন-তেমন ভবন নির্মাণ হতে পারে না। কিন্তু সে রকমই হচ্ছে। অর্থপ্রাপ্তির ওপরই যেহেতু সিদ্ধান্ত নির্ভর করে, সুতরাং এসব বিবেচনা ছাড়াই নির্মাণকাজে উৎসাহ বেশি দেখা যায়। ভবন নির্মাণ আর বিভাগ খোলার মধ্যে কোনো সমন্বয়ও নেই। এ রকম বিভাগ এখন বেশ কয়েকটা আছে, যেগুলোর ক্লাসরুম, শিক্ষকদের বসার জায়গা নিয়ে ভয়াবহ সংকট চলছে বছরের পর বছর।

আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে হলে সিটসংখ্যা অনুযায়ীই প্রতিবছর শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। নতুন নতুন হল নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। পরপর বেশ কয়েকটি হল নির্মাণের পরও আবাসিক সংকট কাটেনি। কারণ প্রথমত, সেশনজটের কারণে যেসব বর্ষের শিক্ষার্থীদের পাস করে বের হয়ে যাওয়ার কথা, তাঁরা অনেকে হলে থাকছেন। দ্বিতীয়ত, বেশির ভাগ হলে শিক্ষকেরা নামমাত্র প্রশাসন চালান, আসলে সরকারি ছাত্রসংগঠন একক দাপটে রুম বিতরণ নিয়ন্ত্রণ করে। বিভিন্ন রুম দখল করে রাখলেও প্রশাসন চুপ। তৃতীয়ত, এসব কারণে বহু রুম প্রাক্তন শিক্ষার্থী, এমনকি কোথাও কোথাও অচেনা লোকজনের দখলে। এই অবস্থার প্রধান শিকার প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা। হিসাব অনুযায়ী সিট থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তাঁদের আশ্রয় নেই। যাঁদের আর কোনো উপায় নেই, তাঁদের গাদাগাদি করে রাখা হয় গণরুম নামে কথিত কোনো স্থানে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মেঝেতে। পড়ার টেবিল নেই, চলাফেরা চরম নিয়ন্ত্রিত, প্রায় রাতেই সেখানে নির্যাতনের আসর বসে। এই কৃত্রিম বা সৃষ্ট আবাসিক সংকট সরকারি ছাত্রসংগঠন নিজেদের আধিপত্য বৃদ্ধির কাজে লাগায়—মিছিল, সমাবেশে হাজির করা, নতুন মাস্তান প্রশিক্ষণ, ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করে অন্যদেরও ভয় দেখানো ইত্যাদি। এরাই যদি ‘অধিকতর উন্নয়ন’ নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে তার পরিণতি কী হবে?

এ রকম একটি প্রেক্ষাপটেই এসেছে ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার নতুন মাস্টারপ্ল্যানের পর্ব। প্রতিষ্ঠার পর এত বছরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নগর-পরিকল্পনা, পরিবেশবিজ্ঞান, প্রাণবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব, ভূগোল ও পরিবেশ, অর্থনীতি, চারুকলাসহ বহু বিভাগ আছে, যেখানকার শিক্ষকেরা এই মহাপরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিভাগকেই এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়নি, সিনেটেও যথাযথ আলোচনা হয়নি। এই মহাপরিকল্পনার জন্য যে প্রস্তুতি দরকার ছিল, বিভিন্ন বিষয়ে সমীক্ষা দরকার ছিল, দীর্ঘমেয়াদি প্রাক্কলন করে তার ভিত্তিতে সাজানো দরকার ছিল, তারও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। আজ পর্যন্তও মহাপরিকল্পনার বিষয়টি পরিষ্কার নয়।

এর মধ্যে কয়েকটি হলের জন্য টাকা ছাড় করার কথা শোনা যায় এবং কয়েকটি জায়গায় নির্বিচার গাছ কাটা শুরু হয়। সেই সঙ্গে হল নির্মাণে দরপত্র জমা দিতে গিয়ে হেনস্তার ঘটনায় পরিষ্কার হয় যে পুরো নির্মাণকাজই আগের মতো কিংবা তার চেয়েও খারাপভাবে একটি কোটারি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। তার অবশ্যম্ভাবী ফলাফল—নির্মাণ হবে নৈরাজ্যিক ও অত্যন্ত নিম্নমানের।

উন্নয়ন কার্যক্রম যৌক্তিক ও স্বচ্ছ করার জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সভা, মিছিল, সমাবেশের মুখে গত ১৭ জুলাই এক সভা ডাকা হয়। উপাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেই সভায়ও মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন না করে জোর দেওয়া হয় কয়েকটি হলের ডিজাইন নিয়ে বিজ্ঞাপনী অ্যানিমেশন প্রচারে। তারপরও মহাপরিকল্পনার উদ্যোগ নেওয়ায় এবং সরকারের কাছ থেকে বৃহৎ বরাদ্দ পাওয়ায় উপাচার্যকে অভিনন্দন জানিয়ে আমরা স্বচ্ছ, পরিকল্পিত ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার স্বার্থে দুটো সুপারিশ করি। এক. এ রকম একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ শিক্ষক ও বিভিন্ন বিভাগকে সম্পৃক্ত করা। দুই. তা বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা আনা। এর জন্য মহাপরিকল্পনার খসড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে রেখে অন্তত তিন মাস সময় দিয়ে সবার মতামত সুপারিশের ভিত্তিতে তা চূড়ান্ত করা; তত দিন গাছ কাটাসহ নির্মাণসংক্রান্ত তৎপরতা স্থগিত রাখা।

কিন্তু এই সাধারণ প্রস্তাব গ্রহণ না করে লুকোচুরি ও তাড়াহুড়া করার কী কারণ থাকতে পারে? এর ব্যাখ্যা পাওয়া গেল বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ‘দুই কোটি টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা’-সংক্রান্ত প্রকাশিত সংবাদে। এক দৈনিকে, ‘বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন’ ছাত্রলীগের এমন এক নেতার উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে এ রকম, ‘সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে বৈঠক হয়। ছাত্রলীগের তিনটি অংশের চার নেতাসহ উপাচার্যের সঙ্গে তাঁর পরিবারের দুই সদস্যও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে কে কত টাকা পাবে, সে বিষয়টি নিয়ে আমাদের মধ্যে দর-কষাকষি হয়েছিল।’ ...‘অবশেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে সভাপতি ৫০ লাখ, সাধারণ সম্পাদক ২৫ লাখ এবং তৃতীয় পক্ষ ২৫ লাখ করে টাকা পাবে’... ‘বাকি ১ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতারা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।’ (ডেইলি স্টার, ২৭ আগস্ট, ২০১৯) এর কয়েক গুণ অর্থ প্রভাবশালী লোকজনের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারার খবরও ঘুরছে ক্যাম্পাসে।

কাজ শুরুর আগেই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে বাকি দিন কী ঘটবে? এর প্রতিবাদকারীদের উন্নয়নবিরোধী বলে কিংবা তাঁদের ওপর সন্ত্রাস চালিয়ে কি এ রকম ভয়ংকর অন্যায়কে ধামাচাপা দেওয়া যাবে? কোনো শিক্ষক এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রমাণিত হলে তাঁর/তাঁদের শিক্ষক থাকার কিংবা কোনো প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকার অধিকার থাকতে পারে না। যেহেতু অভিযোগ সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন এবং সরকারের নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যকে ঘিরে, সেহেতু শেষ পর্যন্ত এসবের দায় সরকারের ওপরই বর্তায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত দুই কোটি টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারার খবরটিকে মনগড়া হিসেবে দাবি করায় বিষয়টি নিয়ে একটি তদন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

ফলে নির্মাণসংক্রান্ত সব তৎপরতা বন্ধ করে অতি দ্রুত এর সুষ্ঠু তদন্তের উদ্যোগ সরকার থেকেই আসা উচিত। এতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পাবলিক বা সর্বজনের বিশ্ববিদ্যালয়, এর উন্নয়নের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে, তা–ও সর্বজনের। এর সুষ্ঠু বিকাশের সঙ্গে দেশের সর্বজনের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বহু প্রজন্মের স্বার্থ জড়িত। তাই এই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যথেচ্ছাচার শিক্ষক-শিক্ষার্থী তো বটেই, দেশের কোনো নাগরিকই মেনে নিতে পারেন না।

(০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত)