ফ্রিদা কাহলোর শহরে

'মেক্সিকো সিটি’ নামে পরিচিত এই শহরের প্রতিষ্ঠা স্পেনীয় দখলদারদের হাতে। এই শহরের পাশেই ২৫ মাইল দূরে দখলপূর্ব প্রাচীন শহর তিওতিহুয়াকান (ঈশ্বরের জন্মভূমি) মেক্সিকোর প্রাচীন সভ্যতাকেন্দ্র। এখানে সূর্য আর চন্দ্র দেবতার উদ্দেশে নির্মিত পিরামিডগুলো সে সময়ের উন্নতমানের স্থাপত্য, নির্মাণশৈলী ও অর্থনৈতিক শক্তি নির্দেশ করে। প্রাচীন সভ্যতার স্মৃতি মুছে ফেলতে স্পেনীয়রা পত্তন করে নতুন শহর। মেক্সিকোজুড়ে দখলপূর্ব আর পরবর্তী শৈল্পিক নির্মাণের সহাবস্থান। মেক্সিকো সিটিতে দর্শনীয় ভাস্কর্য আর স্থাপত্যের ছড়াছড়ি।

প্রায় ১০ হাজার বছরের সমৃদ্ধ আজটেক ও মায়া সভ্যতার এই অঞ্চল স্পেনীয় দখলে যায় ১৫২১ সালে। ১৮১০ সালে মেক্সিকোর মানুষ স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৮৪৬-৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরাজয়ের পর মেক্সিকোর বিশাল অঞ্চল দখল করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। সেসব দখলকৃত অঞ্চলের মধ্যে আছে বর্তমানের টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো। নির্মম পরিহাস, এসব অঞ্চলই বর্তমান মেক্সিকোর অভিবাসীদের প্রধান গন্তব্য।

১৯ শতকের ত্রিশের দশকে বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক ছিল মেক্সিকো, প্রধানত বিভিন্ন মার্কিন কোম্পানি তেলক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করত। তেলক্ষেত্রের শ্রমিকদের ব্যাপক আন্দোলন ও ধর্মঘটের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ১৯৩৮ সালের ১৮ মার্চ তৎকালীন মেক্সিকান প্রেসিডেন্ট কারদেনাস সব তেলক্ষেত্র জাতীয়করণের নির্দেশে স্বাক্ষর করেন। জানা যায় যে ভেতর থেকে প্রতিরোধের আশঙ্কায় প্রেসিডেন্ট মন্ত্রিসভার সদস্যদের জানানোর আগে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এই ঘোষণা দেন। কারদেনাসের সমর্থনে এই শহরে লাখো মানুষ জমায়েত হয় রাস্তায়। প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য মানুষ চাঁদা দেওয়া শুরু করে, অর্থ ছাড়াও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল কাপড়, গয়না, গার্হস্থ্য সরঞ্জাম, গবাদিপশু, মুরগি ইত্যাদি।

এই শহরে আজ থেকে এক শ বছরের বেশি আগে ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতের বাংলা অঞ্চল থেকে এম এন রায় নামে পরিচিত ৩০ বছর বয়সী এক যুবক এসে হাজির হয়েছিলেন। ভারতকে স্বাধীন করতে তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের ধারায় যুক্ত ছিলেন। অস্ত্র ও সমর্থন সংগ্রহের জন্য তাঁকে বিভিন্ন দেশ সফরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। চীন, জাপান, জার্মানি হয়ে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত সর্বত্রই তাঁকে পুলিশের হয়রানি ও তাড়ার মধ্যে থাকতে হয়েছে। কয়েক বছরে বহু রকম চেষ্টা ব্যর্থ হয়। যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালে মার্ক্সীয় দর্শনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়, সেখানকার পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে তিনি মেক্সিকো সিটিতে আসেন। মেক্সিকো কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাকালে তিনি যুক্ত ছিলেন সে দেশের কমরেডদের সঙ্গে। মৃত্যুর পর প্রকাশিত তাঁর মেমোয়ার্স-এ তিনি মেক্সিকো সম্পর্কে লিখেছেন, ‘একটি স্থায়ী বিপ্লবের অবস্থায় থাকা এই দেশই সম্ভাবনার ভূমি মনে হলো। এরপর যদি আর কিছু না–ও করতে পারি, আমি এখানেই থেকে যাব এবং বিপ্লবে অংশ নেব। ভারত আমার একমাত্র মনোযোগের ক্ষেত্র আর ছিল না। আমি শুধু বিপ্লবকে আন্তর্জাতিক সামাজিক প্রয়োজন হিসেবে দেখতে শিখছিলাম।’

বিশ্ব বিপ্লবের লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত আরেক ব্যক্তিত্ব লিয়ন ত্রৎস্কি এই শহরেই আশ্রয় নিয়েছিলেন এর ২০ বছর পর। রুশ বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার পর বিপ্লবোত্তর সমাজতন্ত্র নির্মাণের পথ ও পদ্ধতি নিয়ে স্তালিনের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তীব্র হলে তিনি বিতাড়িত হন এবং একপর্যায়ে মেক্সিকোর 
বিপ্লবী ও শিল্পী দিয়েগো রিভেরার মধ্যস্থতায় রাজনৈতিক আশ্রয় পান। এই শহরেই তাঁর পরিচয় ও প্রেম হয় আরেক বিপ্লবী ও শিল্পী ফ্রিদা কাহলোর সঙ্গে। ত্রৎস্কি এই শহরেই নিহত হন ১৯৪০ সালে। এর ১৪ বছর পর কিউবার জেল থেকে মুক্ত হয়ে এই শহরে এসে হাজির হন ফিদেল কাস্ত্রো। আর্জেন্টিনা থেকে গুয়াতেমালাসহ বিভিন্ন দেশ হয়ে এই শহরেই হাজির হন চে গুয়েভারা। এখানে ফিদেল ও চের সাক্ষাৎ এবং বোঝাপড়া নতুন ইতিহাস নির্মাণের পথ তৈরি করে। এখান থেকেই কিউবা বিপ্লবের যাত্রা শুরু করেন তাঁরা।

মেক্সিকোর সংকট ও জাগরণকালে দিয়েগো রিভেরা ও ফ্রিদা কাহলো ছিলেন খুবই সক্রিয়। এখনো তাঁরা মেক্সিকোর মানুষের কাছে জীবন্ত। পুরোনো বিশাল একটি ভবনে মেক্সিকোর শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেখানে নেতাদের বন্দনা নয়, প্রথম ও তৃতীয় তলার সব দেয়ালে দিয়েগোর আঁকা চিত্র বা ম্যুরাল। এসব চিত্রে বিস্তৃতভাবে এসেছে মেক্সিকোর শ্রমজীবী মানুষের জীবন আর তাদের সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণ–পীড়নবিরোধী লড়াইয়ের চিত্র। মেক্সিকোর বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় ন্যাশনাল পাবলিক ইউনিভার্সিটিতেও জ্ঞানচর্চা আর নান্দনিকতার মিশেল ঘটেছে। অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক জানালেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বেতন–ফি নিয়ে চিন্তা করতে হয় না।

ফ্রিদা কাহলোদের বাসভবন যা ‘ব্লু হাউস’ নামে পরিচিত, তা এখন ফ্রিদা মিউজিয়াম। প্রতিদিন সেখানে সকাল থেকে লাইন ধরে শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে ভেতরে প্রবেশের জন্য। কোনো সন্দেহ নেই, এই ভবনের ভেতরে সময় কাটানো এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। জার্মান-হাঙ্গেরীয় বাবা আর মেক্সিকান আদিবাসী মায়ের সন্তান ফ্রিদার জন্ম ১৯০৭ সালে। ছয় বছর বয়সে পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে মাসের পর মাস ঘরে আটকে থাকতে হয়, তাঁর এক পা স্থায়ীভাবে দুর্বল হয়ে যায়। ১৮ বছর বয়সে এক ভয়ংকর সড়ক দুর্ঘটনায় শরীর দুমড়েমুচড়ে যায়। শরীরে ৩৩টি অস্ত্রোপচার লাগে। ক্রাচ ছাড়াও বাকি জীবনে তাঁর শরীরে বহু রকম বাঁধাছাঁদা রাখতে হতো। শরীর নিজে নিজে চলতে পারত না। ঘরে বা হাসপাতালে কেটেছে তাঁর জীবনের বড় সময়। এর মধ্যেই শুরু হয় তাঁর শিল্পীসংগ্রামী জীবন, কল্পনা, বেদনা, আনন্দ, সাহস, দৃষ্টির গভীরতা, গাঢ় রঙের খেলা। ইয়ুথ কমিউনিস্ট লিগের সদস্য থাকাকালে পরিচয় হয় দিয়েগোর সঙ্গে, বিয়ে করেন। ভাঙাচোরা শরীর নিয়েই তৈরি হয় তাঁর অসাধারণ সব শিল্পকর্ম। শুধু শিল্পকর্ম নয়, পোশাক ও সাজগোজেও তিনি ছিলেন উজ্জ্বল ও অনন্য। মায়ের অক্সাকানা জাতির শিকড়, যেখানে নারীর ভূমিকা ছিল নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের, তাঁর পোশাক ছাড়াও জীবন দর্শন নির্ধারণেও বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। সমাজের অনুশাসন, নারী-পুরুষ শ্রম বিভাজন, যৌনতা ইত্যাদি কোনো বিষয়েই তিনি সমাজ–নির্ধারিত বিধিনিষেধ বা সংস্কার গ্রহণ করেননি। সে হিসেবে তিনি ছিলেন মুক্ত মানুষ। তবে মনপ্রাণ দিয়ে সন্তান চেয়েছিলেন, শরীরের কারণে সম্ভব হয়নি।

ফ্রিদার ভবনে তাঁর বেশ কিছু শিল্পকর্ম রক্ষিত আছে। নিজের শরীর নিয়েই তাঁর বহু শিল্পীয় কাটাছেঁড়া, আর আছে রাজনৈতিক ভাষ্য, মানুষের লড়াই আর স্বপ্ন। তাঁর শোয়ার ঘরে একদিকে লেনিনের রুশ বিপ্লব ঘোষণার ছবি। বিছানার মুখোমুখি মার্ক্স, অ্যাঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন ও মাও-এর ছবি। মার্ক্সের সঙ্গে নিজের প্রতিকৃতি নিয়ে এঁকেছেন। জীবনের শেষ বছরে তিনি নিজের প্রতিকৃতির সঙ্গে স্তালিনকে রেখেও ছবি এঁকেছেন। বোঝা যায়, ত্রৎস্কির সঙ্গে প্রেম হলেও তাঁর স্তালিন ভাষ্য সম্পর্কে তিনি একমত ছিলেন না। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় নির্বাচিত সরকারকে উচ্ছেদ করে মার্কিন সিআইএ দীর্ঘমেয়াদি স্বৈরতন্ত্র কায়েম করে, গণহত্যার সূচনা করে। লাতিন আমেরিকাজুড়ে অন্যান্য শহরের মতো মেক্সিকো সিটিও প্রতিবাদে মুখর হয়। ফ্রিদা তখন মৃত্যুশয্যায়, হুইলচেয়ারে বসেও প্রতিবাদে যোগ দেন। এর ১০ দিন পরেই ঘুমের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

শরীরে একের পর এক আঘাত, নানা সংকট সত্ত্বেও কী প্রবল মানসিক শক্তি নিয়ে একজন মানুষ নিজের সৃজনশীলতার মধ্যে অসাধারণ হয়ে ওঠেন, অপরাজেয় থাকেন, তার অনন্য দৃষ্টান্ত ফ্রিদা। এই বিশ্বে বর্জ্য আর মুনাফার পাহাড়ের নিচে চাপা পড়া প্রাণ–প্রকৃতির লড়াই ফ্রিদার উত্তরসূরি সন্ধান করে। জীবনের শেষ আঁকা ছবিতেও ফ্রিদা নিজের ক্ষতবিক্ষত জীবনের রক্তাক্ত শক্তি প্রকাশ করেন—ভিভা লা ভিদা—জীবনের জয় হোক!

Footer 1

Anu Muhammad
Professor of Economics
Jahangirnagar University

আনু মুহাম্মদ, Anu Muhammad

Footer 2

প্রচ্ছদপ্রবন্ধবই পত্রবক্তৃতাসাক্ষাৎকার • ভিডিও চিত্র | Landing
Email: This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

Developed by AM.Julash