বিশ্বায়নের বুমেরাং ও ট্রাম্প জমানা

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাথমিক বাছাইপর্বের প্রস্তুতি চলছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় আসার আয়োজনে ব্যস্ত। ইরান চুক্তি বাতিল, কিউবার সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতির বদলে আরও অবরোধ, ভেনেজুয়েলায় সরাসরি সামরিক বাহিনীকে উসকানি কিংবা সামরিক আগ্রাসনের হুমকি, জবরদস্তি করে অন্য তহবিল থেকে টাকা নিয়ে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলা, ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের আগ্রাসনে প্রত্যক্ষ মদদদান, চীনের ওপর খবরদারি ও বাণিজ্যযুদ্ধের পাশাপাশি সামরিক হুমকি বৃদ্ধি, বিশ্ব পরিবেশ চুক্তি থেকে প্রত্যাহার—সবই ট্রাম্প-সমর্থক যুদ্ধবাজ, বর্ণবাদী, সাম্প্রদায়িক ও বৃহৎ করপোরেট গোষ্ঠীগুলোকে চাঙা করেছে।

গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের মনোনয়নই ছিল অনেকের কাছে বড় বিস্ময়। তাঁর নির্বাচিত হওয়া ছিল আরও বেশি বিস্ময়ের। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মানুষ তো বটেই, বহু রিপাবলিকানও ট্রাম্পের ধরন হজম করতে পারেননি, যদিও ট্রাম্প তাঁদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অবস্থানকেই খুব স্থূলভাবে প্রকাশ করছেন।

মার্কিন রাজনীতিতে ট্রাম্পের এই উত্থান তাৎপর্যপূর্ণ। এ রকম স্পষ্ট ‘অপর’বিদ্বেষী, অ-শ্বেতাঙ্গ, অ-খ্রিষ্টান, অ-পুরুষ, অ-ব্যবসার প্রতি খড়্গহস্ত কেউ যখন অনেক ধাপ পার হয়ে সরকারপ্রধানের পদ পর্যন্ত পৌঁছায়, তখন তা থেকে সমাজের চিত্রই ভেসে ওঠে। বোঝা যায়, সমাজে এই রাজনীতির উল্লেখযোগ্য সমর্থন আছে। গত নির্বাচনের পর বিভিন্ন জরিপ ও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শ্বেতাঙ্গ পুরুষেরাই ট্রাম্পের প্রধান সমর্থক, যাঁদের মধ্যে অনেক শ্রমিকও আছেন।

ট্রাম্পের মূল স্লোগান ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। ট্রাম্প যখন বলেন, সব কারখানা দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে কিংবা যখন বলেন, ‘উইল মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’, তখন দেশের শ্রমজীবী মানুষের একটি অংশও তাঁর প্রতি সমর্থন বোধ করে। কারণ তাদের ধারণা, এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্প তাদের কাজের ব্যবস্থা করবেন। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি আর দানবাকার সামরিক শক্তির এই দেশে কাজের সমস্যা হলো কোথায়?

একদিকে বিশ্ব পুঁজিবাদের ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণ ও আর্থিকীকরণ (ফিন্যান্সিয়ালাইজেশন), অন্যদিকে নাগরিক পরিষেবা ও সর্বজন সম্পদের দ্রুত ব্যক্তিমালিকানাধীনকরণের মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে তথাকথিত নব্য উদারতাবাদী পর্বের পুঁজিপন্থী পুনর্গঠন জোরদার হয়েছে গত কয়েক দশকে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানীয় জল ও জ্বালানি শক্তি ব্যবহার সক্ষমতার জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যয়কে বোঝা হিসেবে দেখিয়ে সামরিক বাজেট, করপোরেট সংস্থাগুলোকে দেওয়া ভর্তুকি আর কর ছাড়ের সুবিধাগুলো বাড়ানো হচ্ছে। কৃচ্ছ্রসাধনের হাতিয়ার তাক করা হচ্ছে জনগুরুত্বসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় ব্যয়গুলোর প্রতি।

পাশাপাশি বিশ্বায়নের নামে পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণ হয়েছে দ্রুত। যেখানে কর কম বা কর ফাঁকি দেওয়া যায়, যেখানে মজুরি কম, মুনাফা সর্বোচ্চ করার সুবিধা বেশি, যেখানে দুর্নীতিবাজ সরকার ও আমলাদের দিয়ে যা খুশি করা যায়, পুঁজি চলে গেছে সেখানেই। পুঁজির বিনিয়োগ সুবিধা একচেটিয়া করতে বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক সংস্কারের চাপ দেওয়া হয়েছে, কোথাও দেনদরবার, কোথাও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বহুজাতিক পুঁজির পথ প্রশস্ত করা হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের সব হাত, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবি, সিআইএ, থিংক ট্যাংক, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ, মিডিয়া—সবই কাজে লাগানো হয়েছে। সেই ধারায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পুঁজিবাদী কেন্দ্র দেশগুলোর বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠান তাদের কারখানা ও বাণিজ্যিক তৎপরতা সব প্রান্তস্থ দেশে নিয়ে গেছে।

যেভাবে এই কাজগুলো হয়েছে, তাতে প্রান্তস্থ দেশে উন্নয়নের নামে প্রাণ-প্রকৃতি বিনাশী মূলধন সংবর্ধন হয়েছে দ্রুত, বৈষম্য আর বিপদ বেড়েছে। অন্যদিকে এই একই কারণে কেন্দ্র দেশগুলোতে স্থিতিশীল কাজের সুযোগ কমে গেছে, বেড়েছে বেকারত্ব কিংবা খণ্ডকালীন চুক্তিভিত্তিক ভাসমান অনিশ্চিত কাজ। পুঁজি যখন কোনো দিকে অতিরিক্ত মুনাফার সন্ধান পায়, তখন লাগামছাড়াভাবে সেদিকেই ছুটতে থাকে, এর ফলে অতি বিনিয়োগসহ নানাবিধ ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। এসব অসংগতি ও অস্থিরতা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য।

গত কয়েক দশকে শিল্প খাতের তুলনায় আর্থিকসহ পরিষেবা খাতের বিকাশ ঘটেছে বহুগুণ। এসব খাতে কাজ খুবই অস্থায়ী ধরনের, নিরাপত্তাহীন এবং অধিকাংশের মজুরিও অনেক কম। আউটসোর্সিং এসব খাতে কর্মসংস্থানের অন্যতম ধরন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ কর্মসংস্থান এ রকম অনিশ্চিত, অনির্দিষ্ট। এদের বড় অংশ আবার অভিবাসী, যেকোনো সংকটের প্রথম শিকার। কর্মসংস্থানের সংকটে জর্জরিত পুরোনো নাগরিকদের কাছে এই অভিবাসীদের ভয়ংকর প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা খুবই সহজ। চরম প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির জন্য এই পরিস্থিতি খুবই সুবিধাজনক। তাই একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বা স্থিতিশীল কর্মসংস্থান, অন্যদিকে অভিবাসী ঘৃণাই প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু। এর ওপর ভর করেই ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছেন। আসলে পুঁজির গতি পরিবর্তন তার আগ্রহের বিষয় নয়, সাধ্যেরও অতীত; জাতীয়তাবাদী-বিদ্বেষী আওয়াজ তাঁর রাজনীতি।

বস্তুত, সত্তরের দশক থেকেই বিশ্বজুড়ে নব্য উদারতাবাদী বা সঠিকভাবে বললে গোঁড়া পুঁজিবাদী দর্শনের আধিপত্য তৈরি হয়েছে। তিনটি পর্বে তার শক্তি বৃদ্ধি ঘটেছে: এক. সত্তরের দশকে এর সূত্রপাত, আশির দশকে একে ধাক্কা দিয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিগ্যান ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থ্যাচার কর্তৃত্বাধীন রাষ্ট্রশক্তি। দুই. সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে পুঁজিবাদী কেন্দ্রের ক্ষমতা একচেটিয়া হয়েছে এবং তিন.২০০১ সাল থেকে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃহৎ করপোরেট স্বার্থ প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধ-সন্ত্রাসের বিস্তৃতি ঘটিয়েছে।

মার্কিন প্রয়োজনে তৈরি করা মুসলিম সন্ত্রাসীরা এই পর্বে বিশ্ব সন্ত্রাসের ভালো উপলক্ষ হয়েছে। ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ থাবায় একে একে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়াকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে। এই মডেলেই পুষ্টি পেয়েছে ধর্ম ও জাতির নামে সন্ত্রাস। ইউরোপে শরণার্থীপ্রবাহ এসবেরই পরিণতি, ইউরোপ-আমেরিকাজুড়ে খ্রিষ্টান ও শ্বেতাঙ্গ চরমপন্থীদের জোরদার বিস্তার একই সময়ের দৃশ্য। একজন বিশেষজ্ঞ পশ্চিমা দেশগুলোতে তিন ধরনের জাতি-বর্ণবিদ্বেষী গোষ্ঠীর অস্তিত্ব শনাক্ত করেছেন। এগুলো হলো: এক. প্রত্যক্ষভাবে ফ্যাসিস্ট বা নব্য নাৎসি ভাবধারায় গঠিত; দুই. আধা ফ্যাসিবাদী পার্টি, প্রত্যক্ষভাবে না বললেও ফ্যাসিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচি দ্বারা পরিচালিত এবং তিন. চরম ডানপন্থী পার্টিগুলো, যেগুলো বর্ণবাদী, অন্য ধর্মবিদ্বেষী, অভিবাসীবিরোধী কর্মসূচি দ্বারা পরিচালিত।

বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও এই ধারা এখন অনেক জোরদার। ভারত, বাংলাদেশেও আমরা তা প্রত্যক্ষ করছি। ধর্মীয় বর্ণগত বা জাতীয়তাবাদী আওয়াজে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সঙ্গে পরিবেশ ও মানুষ বৈরী পুঁজিপন্থী উন্নয়ন ধারার ঐক্য প্রবল। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রান্তে এই রাজনীতির মধ্যে সংহতিও বেশ শক্ত। সে জন্য ট্রাম্পের সঙ্গে মোদি, নেতানিয়াহু, ব্রাজিল ও ভেনেজুয়েলার পুঁজিপন্থী গোষ্ঠীর পরস্পরের ঐক্য, ইউরোপজুড়ে বর্ণবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মৈত্রী, সৌদি রাজতন্ত্রের সঙ্গে সখ্য খুব নিবিড়।

সন্দেহ নেই, এসব প্রবণতা থেকে ট্রাম্পের আবার ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনাই জোর পাচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গত নির্বাচনে প্রকাশিত আরেকটি লক্ষণও বিশেষভাবে খেয়াল করার বিষয়। সেবারই মূলধারার প্রার্থীদের মধ্যে বার্নি স্যান্ডার্স প্রথম একচেটিয়া পুঁজি, সাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধবিরোধী কথা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা বলেছেন এবং বিপুল সমর্থনও পেয়েছেন। বার্নি স্যান্ডার্স হঠাৎ করে এসব কথা বলার সাহস পেলেন কোথায়? তাঁর সমর্থনের ভিত্তি কোথায়?

প্রকৃতপক্ষে বার্নি স্যান্ডার্সকে তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে শ্রমিক, নারী, অভিবাসীদের দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, সন্ত্রাস, বৈষম্যবিরোধী লড়াই; ‘আমরা ৯৯ %’ শিরোনামে কয় বছরের চিন্তা ও আন্দোলনের বিস্তার। এসব লড়াইয়ে বিভিন্ন পরিচয়ের মানুষ বৈষম্য ও নিপীড়নবিরোধী নতুন বিশ্বের দাবি তুলেছে, পুঁজির হিংস্রতার বিপরীতে মানুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আওয়াজে ঐক্য গড়েছে। আপাতদৃষ্টিতে তা এখন দুর্বল দেখা গেলেও তার প্রকাশ ঘটছে নানাভাবে, লড়াই থামেনি। দুনিয়াজুড়েই স্বৈরতন্ত্র, সহিংসতা, রক্ষণশীলতার পাশাপাশি মানুষের বৈশ্বিক সংহতির পক্ষে অনেক নতুন উপাদান, বাঁকবদল দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রও তার বাইরে নয়।

(১৬ মে ২০১৯ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত)

Footer 1

Anu Muhammad
Professor of Economics
Jahangirnagar University

আনু মুহাম্মদ, Anu Muhammad

Footer 2

প্রচ্ছদপ্রবন্ধবই পত্রবক্তৃতাসাক্ষাৎকার • ভিডিও চিত্র | Landing
Email: This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

Developed by AM.Julash