বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন নিষ্ঠুর বলে মৃত্যুও নির্মম। স্বাভাবিক জীবনের গ্যারান্টি নেই বলে স্বাভাবিক মৃত্যুরও গ্যারান্টি পাওয়া যায় না। নিমতলী-চুড়িহাট্টা থেকে বনানী, সড়ক থেকে ভবন, কারখানা থেকে অফিস, বন থেকে সাগর সর্বত্রই তাই আমরা দেখি ‘উন্নয়নের’ মৃত্যুকূপ। সীমাহীন লোভ, জনস্বার্থের প্রতি চরম অবজ্ঞা, ক্ষমতার দাপট ও দুর্নীতি, সর্বোপরি জবাবদিহির ভয়ংকর অনুপস্থিতিই এ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। জনগণের ওপর নজরদারি বাড়ানোর জন্য শত হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করলেও কারখানা, ভবন, সড়কসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিধানের কোনো নজরদারি ব্যবস্থা নেই, তদারকি নেই, জবাবদিহি নেই। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্ষম ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেই। আর বিপদ, অনিয়ম, দুর্নীতি, দায়িত্বহীনতার সবকিছুকে অস্বীকার করা সরকারের একটা রোগে পরিণত হয়েছে। অনেকে বলেন, এ রাষ্ট্র অদক্ষ। না, এ নিষ্ক্রিয়তা দক্ষতার সমস্যা নয়। কেননা এই একই সময়ে এ রাষ্ট্র জননিপীড়নে, সম্পদ লুণ্ঠন ও পাচারে, নির্বাচনসহ সব প্রতিষ্ঠান দখলে উল্লেখযোগ্য দক্ষতা ও সক্রিয়তা দেখিয়েছে।

দেশে উন্নয়নের নামে সব পর্যায়ে বিচার-বিবেচনাহীন অদূরদর্শী লোভী দায়দায়িত্বহীন প্রকল্প অনুমোদন করা হচ্ছে, নির্মাণ ও ক্রয় চলছে। পারমাণবিক বিদ্যুতের ঝুঁকি ও বিপদের যে কোনো সীমা-পরিসীমা নেই, তা সর্বজনবিদিত। বাংলাদেশের মতো ঘন জনবসতি, পানি ও আবাদি জমির ওপর বিপুলভাবে নির্ভরশীল একটি দেশে এ ঝুঁকি বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক বেশি। এ সত্য অগ্রাহ্য করে রূপপুরে বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প করা হচ্ছে, একে অভিহিত করা হচ্ছে ‘জাতীয় গৌরব’ হিসেবে।

অথচ এ প্রকল্পের কোনো পরিবেশ সমীক্ষা প্রকাশ করা হয়নি, প্রত্যক্ষ ঝুঁকির মধ্যে বসবাসরত প্রায় এক কোটি মানুষের কাছে এর সমস্যা, বিপদ ও ঝুঁকির কথা গোপন রাখা হয়েছে, বদলে একটানা উন্নয়নের মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে। এলাকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান, সংবাদ সম্মেলন, সভা-সমিতি করার ব্যাপারে জারি করা হয়েছে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা। বিশেষজ্ঞরা যেসব উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সেগুলোর কোনো সদুত্তর না দিয়ে সরকার হাসি-তামাশা করে যাচ্ছে। পারমাণবিক বর্জ্যসহ বিভিন্ন ঝুঁকির বিষয় অনিষ্পন্ন রাখা হয়েছে।
এই ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় তিন বছরের ব্যবধানে ৩২ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এজন্য  বিপুল ঋণের ভার বহন করতে হবে বাংলাদেশকে। আগামী কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকা খরচ এবং সুদসমেত ঋণ পরিশোধের খরচ মিলিয়ে এ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ হবে সবচেয়ে ব্যয়বহুল। বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে ডিকমিশনিংয়ের জন্যও আছে বিশাল খরচ, সেই সঙ্গে আছে ক্রমাগত শুকিয়ে যেতে থাকা পার্শ্ববর্তী পদ্মা নদীর পানি ব্যবস্থাপনাগত ঝুঁকি। অর্থাৎ যেকোনো সময়ে চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকির প্রশ্ন বাদ দিলেও শুধু অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক বিবেচনায় নিলেও এ বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক বোঝা ও মহাবিপদ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। সরকার একদিকে বলেই যাচ্ছে রূপপুরে কোনো দুর্ঘটনা হবে না, অন্যদিকে যেকোনো দুর্ঘটনার দায় থেকে রক্ষার জন্য রাশিয়া-ভারতের এ প্রকল্পে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য করা হয়েছে দায়মুক্তি আইন।
প্রাণ-প্রকৃতি-দেশবিনাশী আরেকটি বড় দৃষ্টান্ত সুন্দরবনবিনাশী রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। গত আট বছরে সুন্দরবনবিনাশী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প কীভাবে বাংলাদেশের জন্য ভয়ংকর রকম সর্বনাশা, তার অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আমরা সরকারের কাছে হাজির করেছি। সরকার সেগুলো উপেক্ষা করছে আর দেশ-বিদেশে দিয়ে যাচ্ছে একের পর এক মিথ্যা তথ্য। বাংলাদেশের জন্য, দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের কোটি কোটি মানুষের জন্য সুন্দরবন একটি জীবন-মরণ প্রশ্ন। সবাই জানেন যে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন পরিবেশগত দিক থেকে, প্রাণবৈচিত্র্যের দিক থেকে অতুলনীয়। সেজন্য এটি  ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্বঐতিহ্য হিসেবে ঘোষিত। শুধুু তাই নয়, এ বন বাংলাদেশের জন্য অসাধারণ একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। উপকূলের কয়েক কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা সম্পদ সুন্দরবনের অস্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া এ রকম  অতুলনীয় সম্পদ হেলায়, লোভে, দায়িত্বহীনতা আর জেদ দিয়ে ধ্বংস করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।

শুধু রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, এ কেন্দ্রের কারণে প্রলুব্ধ হয়ে দেশের বনগ্রাসী-ভূমিগ্রাসী কতিপয় গোষ্ঠী তিন শতাধিক বাণিজ্যিক প্রকল্প দিয়ে সুন্দরবন ঘিরে ফেলেছে। সুন্দরবনের চারপাশে ৩২০টি শিল্প-কারখানা অনুমোদন দেয়ার পরও সরকার ইউনেস্কোকে বলেছে, সরকার সেখানে কোনো ভারী শিল্প-কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেয়নি। সরকারের ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই সেখানে পরিবেশ বিপর্যয়কারী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। সেজন্য বাংলাদেশ রক্ষাকারী সুন্দরবন বিনাশ আর বন-জমি গ্রাসে জড়িত ব্যক্তি, কোম্পানি, আমলাদের ঠেকানোর কোনো চেষ্টা দেখা যায় না।

এর পরও কোনো প্রকার সমীক্ষা না করে দেশের পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে উপকূল রক্ষাকারী বন/পরিবেশ বিনাশ করে মহেশখালী, বরগুনা ও পটুয়াখালীতেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। বরগুনার সমীক্ষাবিহীন প্রকল্প সম্পর্কে মন্ত্রী বলেছেন, তিনি এ বিষয়ে জানতেন না! জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। উপকূলজুড়ে কয়লাবিদ্যুতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে কমানোর বদলে সেই বিপদ আরো বৃদ্ধির মহাযজ্ঞ করছে সরকার। 

দক্ষিণবঙ্গের এ পরিস্থিতির পাশে উত্তরবঙ্গ নিয়েও চলছে নানা অপতত্পরতা। ফুলবাড়ীর কয়লাখনি নিয়ে বিতাড়িত এশিয়া এনার্জি বা জিএসএম নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তারা যে শুধু বেআইনিভাবে ফুলবাড়ী কয়লা খনি নিয়ে লন্ডনে শেয়ারবাজারে ব্যবসা করে যাচ্ছে তা নয়, এ খনি নিয়েই তারা সম্প্রতি ঢাকায় চীনের ‘পাওয়ার চায়না’র সঙ্গে চুক্তি করেছে। বাংলাদেশের সম্পদ নিয়ে বিদেশী কোম্পানি বিদেশে জালিয়াতি ব্যবসা করে, সরকার কিছুই বলে না, আর এ চুক্তির বিষয়েও মন্ত্রণালয় বলছে তারা কিছুই জানে না!

ঘুষ, দুর্নীতি, মামলা-হামলা, প্রলোভন ইত্যাদির মাধ্যমে নানাভাবে চেষ্টা করেও জনগণের প্রতিরোধের মুখে জিসিএম বারবার পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। তাই এবার তারা বাংলাদেশ সরকারের ওপর চীন ও চীনা কোম্পানির বিদ্যমান প্রভাব ও যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত কয়লা খননের অপতত্পরতা নতুন করে শুরু করেছে। এছাড়া বড়পুকুরিয়া, দীঘিপাড়া কয়লা খনি নিয়েও বিভিন্ন চক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতে ২০১০ সালে দায়মুক্তি আইন করা হয়েছিল। এর জোরেই একের পর এক অসম্ভব ব্যয়বহুল ক্ষতিকর প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাপেক্সকে সমর্থন না দিয়ে বহুগুণ বেশি দামে দেয়া হচ্ছে গ্যাজপ্রমসহ বিদেশী কোম্পানিকে। গ্যাস সংকট সমাধানের নামে এলএনজি আমদানি শুরু হয়েছে। আর এর সূত্র ধরেই বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প-কারখানা, ক্যাপটিভ পাওয়ারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরবরাহকৃত গ্যাসের দাম দ্বিগুণ বৃদ্ধির আয়োজন করা হয়েছে। এতে করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, যাতায়াত, বিদ্যুৎসহ দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ আরেক দফা বাড়বে। 

সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির অসীম জোগান থাকলেও এ নিয়ে সরকারের ‘শোকেস’ ভিন্ন উদ্যোগ দেখা যায় না। কারণ তাতে কয়লা ও পারমাণবিক প্রকল্পের বিশাল দুর্নীতির কোনো যৌক্তিকতা থাকে না। সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানির কোনো খরচ নেই। আর পরিবেশের জন্য তা বন্ধু। প্রযুক্তি উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো আরো নিরাপদ হচ্ছে, দামও কমছে। এসবের দাম তেল-কয়লা কিংবা পরমাণু বিদ্যুতের মতো ভবিষ্যতে বৃদ্ধি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ভারতে সৌরবিদ্যুৎ এখন সাড়ে ৩ টাকারও কম খরচে উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশ এ খাত উন্নয়নে মনোযোগী না হয়ে এই বিদ্যুৎ বেশি দামে কেনার চুক্তি করছে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে। অথচ বাংলাদেশে জমির অভাব থাকলেও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা খুব কম সময়েই করার মতো প্রযুক্তি এখন আছে। এজন্য বিভিন্ন গোষ্ঠী ও ব্যক্তির বেদখলকৃত রাষ্ট্রীয় জমি, রেলওয়ের বেদখল হওয়া জমি, বাসাবাড়ির ছাদ, নদীর ধার প্রভৃতি জায়গার দিকে মনোযোগ দিলেই হবে। ভারত ও চীন উভয়েই ব্যাপক উদ্যোগ নিচ্ছে কয়লাবিদ্যুৎ থেকে সরে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে। আর তাদেরই পরিত্যক্ত কয়লাবিদ্যুৎ প্লান্ট বাংলাদেশকে ডাস্টবিন বানাতে যাচ্ছে।

যে দেশে শতাধিক মানুষ মৃত্যুর পরও ১০ বছরে পুরান ঢাকায় ভয়াবহ গুদাম সরানো হয় না, আবারো অকালমৃত্যুর মুখে পতিত হয় মানুষ, যেখানে একের পর এক বহুতল ভবন হয় কোনো রকম নিয়মকানুন ছাড়া, যেখানে বাস-ট্রাক চলতে থাকে ফিটনেস-লাইসেন্স ছাড়া এবং প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়, সেখানে বলা হয়, এর চেয়ে লাখো গুণ বিপজ্জনক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে সব ঝুঁকিমুক্ত! যে সরকার সচিবালয়ের পাশের নদীকে ড্রেনে পরিণত হওয়া ঠেকাতে পারে না, তারা বলতে থাকে, বছরে ৪৭ লাখ টন কয়লা পুড়লেও সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না! রামপাল-রূপপুরসহ প্রাণ-প্রকৃতিবিনাশী বিভিন্ন প্রকল্প যত অগ্রসর হচ্ছে ততই বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদের ওপর এক ভয়াবহ বিপদ ঘনীভূত হচ্ছে। গ্যাস অনুসন্ধানে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিকাশে জাতীয় সক্ষমতা বাড়ালে বিদ্যুতের দামও কমবে, বিদ্যুতের নামে সারা দেশের মানুষকে মৃত্যুকূপে ঠেলে দেয়ার দরকার হবে না।

আমরা মানুষ মরার বা মারার উন্নয়ন নয়, মানুষ বাঁচার ও তার জীবন নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করার উন্নয়ন চাই।