সদ্য সমাপ্ত ডাকসু নির্বাচনে সরকারি প্রকল্পে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা বাংলাদেশের জন্য আরেকটি কলঙ্কিত অধ্যায় তৈরি করল। তবে এই নির্বাচন নামে দখলদারিত্ব স্থায়ীকরণ প্রকল্পের বিরোধিতার মধ্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা তৈরি করেছেন এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

১৯৯১ সালে নির্বাচিত সরকারের শাসনামল শুরু হওয়ার পর থেকে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে এই সময় থেকে যেসব রাজনৈতিক দল শাসক দল হিসেবে ক্ষমতায় বসেছে তারা দেশে প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাল্লা দিয়ে নিজেদের কর্তৃত্বে আনার কাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। সেই ধারায় বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে নিজেদের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্য। তাই তাদের শাসনামলে সরকারি ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য নিশ্চিত করার জন্যই ছাত্র সংসদ নির্বাচন করা হয়নি। হলে হলে সরকারি ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নির্মাণ কাজে চঁাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত থেকেছে সরকারি ছাত্র সংগঠন। এই পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে সর্বশেষ এই সরকারের আমলে। বিভিন্ন হলে সিট বণ্টন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণ কাজে চাঁদাবাজি, নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অপরাধ মাত্রাতিরিক্ত আকার নেওয়ার পেছনে সরকার তো বটেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।

এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের দাবি মানার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডাকসু নির্বাচন দেওয়া হয়। প্রথম থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ভূমিকায় এটা স্পষ্ট হয় যে, জবরদস্তিমূলকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা সন্ত্রাসী আধিপত্য বজায় রেখেছে, তাদেরই বৈধ কর্তৃত্ব দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কাজ করছে। হলে হলে গণরুমে প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীদের থাকতে বাধ্য করে, অসহায়ত্বের সুযোগে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে রিজার্ভ আর্মি হিসেবে। বোঝা যাচ্ছিল ২৯/৩০ ডিসেম্বরের ‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনের বিশ্ববিদ্যালয় সংস্করণ নির্মাণের জন্য সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এতে সফল হলে সে অনুযায়ী অন্যান্য বিশ^বিদ্যালয়ে সংসদ নির্বাচন ঘোষণা করা হবে। ৩০ ডিসেম্বরের কলঙ্কিত নির্বাচনে আমলা, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং সরকারি দল ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনকে একটি প্রহসনে পরিণত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে এই আশঙ্কা অনেকেই করতে চাননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন যেহেতু শিক্ষকরা চালান ন্যূনতম একটা মান সেখানে থাকবে, এরকম একটা প্রত্যাশা ছিল কারও কারও মধ্যে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষক হওয়ার চাইতে দলের প্রতিনিধি বা ছাত্রলীগের প্রতিনিধি হিসেবেই নিজেদের ভূমিকা স্পষ্ট করেছে। এটা শিক্ষক হিসেবে লজ্জার বিষয়।

২৯/৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের তামাশা বা প্রহসনের পর যেকোনো নির্বাচন নিয়েই এখন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উপজেলা, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেটার প্রতিফলনও দেখা গেছে। সরকার ভোটারদের অধিকার হরণ করেছে, জবাবে ভোটার নাগরিকরা অহিংস পথে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া বন্ধ করে তার জবাব দিচ্ছেন। নির্বাচনগুলো হাস্যকর করে তুলছে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে। ইতিহাসে এটাও প্রতিরোধের একটি ধরন হিসেবে চিহ্নিত হবে।

নির্বাচন প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের বেশ কিছু ন্যায্য দাবি ছিল। গণরুমের দখলদারিত্ব, প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে অনুগত বাহিনী তৈরি ও হলে হলে যে ভয়ের রাজত্ব ছাত্রলীগ তৈরি করে রেখেছে সেটার কারণে হলগুলোতে শিক্ষার্থীরা সুষ্ঠুভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না সেটা সবাই জানতেন। এ কারণেই অ্যাকাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র সরিয়ে নেওয়ার দাবি ছিল। এই দাবি না মানার মধ্য দিয়েই প্রশাসন বার্তা দিয়ে দিয়েছিল যে, তারা ছাত্রলীগকে জিতিয়ে আনতে চায়। ১১ মার্চ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে শিক্ষার্থীরা যাতে ভোট দিতে না পারে সে জন্য কৃত্রিম লাইন করা, আগের রাতে বাক্সে ব্যালট ভরা, হলে হলে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি, হুমকি ও নজরদারি রাখা এ সব কিছুর মধ্য দিয়ে ডাকসু নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

ভোটকেন্দ্র স্থাপন নিয়ে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের আপত্তির মুখেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হলের ভেতরে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে এই নির্বাচন প্রক্রিয়াকেই সুষ্ঠু ও সব শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যেসব শিক্ষক যুক্ত তাদের বিরুদ্ধেও ব্যালট বাক্সে আগে থেকেই ব্যালট পেপার ভরা, ভয়ের পরিস্থিতি বজায় রাখা, সরকারি ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যোগসাজশ করে ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়াকে অস্বচ্ছ করার অভিযোগ আছে। যে শিক্ষকরা ব্যালট বাক্স ভরানো বা বিভিন ধরনের অনিয়ম-কারচুপির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের অপরাধ নৈতিক স্খলনের মধ্যেই পড়ে।

ভয়ের রাজত্ব তৈরি করাটা সরকার তার সাফল্য হিসেবে দেখতে পারে। এখানে সাধারণ শিক্ষক অনেকেই আছেন যারা ভয়ের কারণে বা মেরুদণ্ডহীনতার কারণে সরকার বা ছাত্রলীগ যা বলে তাই করেন। শিক্ষক হিসেবে তাদের আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই। আর একটা অংশ আছে যারা আত্মসমর্পিত। এটা খুব হতাশাজনক। বর্তমান সময়ে এটাই সবচেয়ে বড় সংকট যে বিদ্বৎসমাজের একটি বড় অংশ চরম অন্যায়ে সহযোগিতা করছেন বা নীরব থাকছেন।

তবে হাতুড়ি বাহিনী, হেলমেট বাহিনী, পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা, কতিপয় শিক্ষকদের ছড়ানো ভয়ভীতি অতিক্রম করেও শিক্ষার্থীরা সামনে আসছে, প্রতিবাদ করছে। এটাই বড় আশার জায়গা। আমরা দেখলাম, মেয়েদের হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ অনেক শক্তিশালী। কারণ মেয়েদের হলে সরকারি ছাত্র সংগঠন একই মাত্রায় ভয়ের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ছেলেদের হলে আশ্রয়হীন শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে অস্ত্র প্রদর্শনসহ সহিংসতার মাধ্যমে একটা চরম ভয়ের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে অনেক আগে থেকেই। তারপরও সেখান থেকেও প্রতিবাদ এসেছে। আবার প্রকৃত শিক্ষক হিসেবে ভূমিকা নিয়ে সামনে এসেছেন কয়েকজন।

প্রকৃতপক্ষে বিশ^বিদ্যালয় বর্তমানে নিয়ন্ত্রণ করে সরকারের সমর্থনপুষ্ট কতিপয় মাস্তান, আর তাদের টিকিয়ে রাখে তাদের আজ্ঞাবহ মেরুদ-হীন সুবিধাবাদী প্রশাসন। সরকারের দেখানো পথে এরা বিশ্ববিদ্যালযের নির্বাচনকেও কলঙ্কিত করল। যে শিক্ষক নামের ব্যক্তিরা এর সঙ্গে জড়িত তাদের জন্য ঘৃণা ও ধিক্কার। নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে শিক্ষকতা থেকে অব্যাহতি তাদের ন্যূনতম প্রাপ্য। বিশ^বিদ্যালয়কে রক্ষা করতে হলে এই মাস্তান ও মেরুদ-হীনদের বিরুদ্ধে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আরও ঐক্যবদ্ধ সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। যারা হলে হলে নির্যাতনের ক্যাম্প বানায়, গণরুমের নামে তৈরি করতে চায় দাসবাহিনী, যারা বিশ^বিদ্যালয়কে চাঁদাবাজ, যৌন নিপীড়ক, সন্ত্রাসীদের আখড়া বানায়, যারা বিশ^বিদ্যালয়কে ভয় আর কর্তৃত্বের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চায়, যারা স্বাধীন চিন্তা আর সৃজনশীলতার পথ রুদ্ধ করতে চায় তাদের জবরদস্তি ক্ষমতায় বৈধতা না দিয়ে যেসব শিক্ষার্থী ও শিক্ষক প্রতিবাদ করেছেন তারাই বিশ^বিদ্যালয় নামক প্রতিষ্ঠানের আশার বাতি।