বাংলাদেশের উত্তর সীমানার শেষ প্রান্তের কাছে ফুলবাড়ী। আর দক্ষিণ সীমানার প্রান্তে সুন্দরবন। এই উত্তর–দক্ষিণের মধ্যেই সমগ্র বাংলাদেশ। এই দুটি নামই সুন্দর, দুটিই ভীষণ বিপদে—তাই বাংলাদেশও। ফুলবাড়ীসহ ছয় থানা বাংলাদেশের প্রাণপ্রকৃতিরই একটি ছবি। তিন ফসলি জমি, মাটির ওপর ও নিচে সমৃদ্ধ পানিসম্পদ, প্রাণবৈচিত্র্য, পরিশ্রমী মানুষ—সবই। আর দক্ষিণে সুন্দরবন সারা বিশ্বেই স্বীকৃত একটি অতুলনীয় প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে। জলজ বন, অসাধারণ প্রাণবৈচিত্র্য, অতুলনীয় বাস্তুসংস্থানে বিশিষ্ট, প্রাকৃতিক সুরক্ষাপ্রাচীর হিসেবে বহুকাল ধরে মানুষ ও সম্পদের রক্ষাকারী এই মহাপ্রাণ সুন্দরবন। দুই প্রান্ত আর দুই প্রান্তের ভেতরের প্রাণপ্রকৃতি মানুষ একে একে নানা আয়োজনে নির্বোধ ও লোভী দস্যুবৃত্তির শিকার হয়ে যাচ্ছে। এসব আয়োজনের শিরোনাম: ‘উন্নয়ন’।

উন্নয়ন বলতে বোঝায় বিদ্যমান সম্পদ ও সক্ষমতাকে বাড়ানো; জীবনকে আরও সহজ, আরামদায়ক ও নিরাপদ করা; জ্ঞানবিদ্যা, যোগাযোগ ও বিনোদনের জগৎ প্রসারিত করা। যদি দেখা যায় সম্পদ ও সক্ষমতা আরও বিপর্যস্ত হচ্ছে, যদি দেখা যায় জীবন আরও কঠিন, অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে, যদি দেখা যায় চারপাশের জগৎ আরও বিপর্যস্ত হচ্ছে, তাহলে তাকে কি আমরা উন্নয়ন বলতে পারি? ফুলবাড়ী ও সুন্দরবনের ওপর চাতুরীপূর্ণ প্রকল্পগুলো তার দৃষ্টান্ত।

ফুলবাড়ী থেকে জনগণের তাড়া খেয়ে পালিয়েছিল এশিয়া এনার্জি নামে ভুঁইফোড় এক বিদেশি কোম্পানি। অস্ট্রেলিয়ার বিএইচপির মতো অভিজ্ঞ সংস্থা যা বাংলাদেশে করা সম্ভব নয় বলে চলে গেছে, সেই উন্মুক্ত খনি করবার প্রকল্প নিয়ে হঠাৎ ১৯৯৭ সালে এশিয়া এনার্জি কোম্পানি গঠিত হয় এবং ফুলবাড়ীসহ ছয় থানার বিশাল খনির কাজ পেয়ে যায়। তারা লাইসেন্স পায়; ‘পরিবেশগত সমীক্ষা’ করার আগেই ছাড়পত্রও পায়। এরপর ২০০৫ সালে কাজ শুরু করতে গেলে জনপ্রতিরোধের মধ্যে পড়ে। ঘটনাবলি যেভাবে অগ্রসর হচ্ছিল, তাতে জনগণ যদি নিষ্ক্রিয় থাকত, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়ে যে উত্তরবঙ্গের বহু স্থানে এখন পানির সংকট, তা হাহাকার পর্যায়ে যেত। বহু নদীনালা, খালবিলের অবস্থা বুড়িগঙ্গার চেয়ে ভয়াবহ হতো। খনি ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের আবাদি জমি নষ্ট ও অনাবাদি হওয়ার কারণে খাদ্য উৎপাদনে ভয়াবহ নিম্নগতি সৃষ্টি হতো। জীবিকা ও ঘরবাড়ি হারিয়ে লাখ লাখ মানুষ নতুন করে ঢাকার রাস্তায় আশ্রয় নিতেন। কয়লা রপ্তানির প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সুন্দরবনও বিপর্যস্ত হতো।

২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট প্রায় লাখ মানুষের মিছিল–সমাবেশ হয় এর বিরুদ্ধে। হামলা, খুন আর জখম করেও কোম্পানিমুখী সরকার থামাতে পারেনি মানুষকে। গণ-অভ্যুত্থান ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩০ আগস্ট তৎকালীন সরকার ওই কোম্পানি বহিষ্কার, উন্মুক্ত খনি নিষিদ্ধসহ ৭ দফা দাবি মেনে জনগণের সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিল। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এই চুক্তির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে তা বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় অপতৎপরতা থামেনি। আশার কথা, প্রতিরোধও জীবন্ত আছে।
তাড়া খাওয়ার পর ঘাপটি মেরে বসে এশিয়া এনার্জি নাম পাল্টে হয়েছিল গ্লোবাল কোল ম্যানেজমেন্ট (জিসিএম)। লাইসেন্স এখন আর কার্যকর নেই, তবু ফুলবাড়ী দেখিয়ে এই কোম্পানি বছরের পর বছর লন্ডনে শেয়ার ব্যবসা করে যাচ্ছে। বেআইনিভাবে ফুলবাড়ী খনি দেখানোই তাদের একমাত্র সম্বল। কেননা, ১৯৯৭ সালের পর এই ২২ বছরেও এই কোম্পানি দুনিয়ার আর কোথাও কোনো খনির কাজ পায়নি। এটা খুব বিস্ময়কর যে দেশে সরকার থাকতে কী করে একটি বিদেশি কোম্পানি দেশের সম্পদ নিয়ে বিদেশে অবৈধভাবে শেয়ার ব্যবসা করতে পারে। দেখা যাচ্ছে, শেয়ার ব্যবসার মুনাফার একাংশ ছড়িয়েই দেশে কোম্পানি তার খুঁটি ধরে রেখেছে। শুধু তা–ই নয়, ফুলবাড়ী খনি নিয়ে একটি চীনা কোম্পানির সঙ্গে তারা চুক্তিও করেছে গত নভেম্বর মাসে। অথচ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, তাঁরা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। (বণিক বার্তা, ২৩ জানুয়ারি ২০১৯) চীনা বিভিন্ন কোম্পানি এখন টাকার থলে আর সব বিষাক্ত প্রকল্প নিয়ে হাজির বাংলাদেশে।

সুন্দরবনবিনাশী রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পও তাই। গত কয় বছরে দেশ–বিদেশের বিশেষজ্ঞরা বিস্তারিত তথ্য ও যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে প্রাকৃতিক রক্ষাবর্ম হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতিকে যে সুন্দরবন রক্ষা করে, এবং অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের আধার হিসেবে যা প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখে, সেই সুন্দরবনকে ধ্বংস করবে এই প্রকল্প। এটাও দেখানো হয়েছে যে ভারতীয় কোম্পানি (এনটিপিসি) নিজ দেশের আইন ভঙ্গ করে বাংলাদেশের জন্য সর্বনাশা এই প্রকল্পে চালকশক্তি হিসেবে যুক্ত হয়েছে। ভারতীয় কোম্পানি বাংলাদেশে সুন্দরবনের ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে। বাফার জোন বিবেচনা করলে এই দূরত্ব ৪ কিলোমিটার। অথচ ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রণীত পরিবেশ সমীক্ষা বা ইআইএ গাইডলাইন ম্যানুয়াল ২০১০ অনুযায়ী, কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বাঘ বা হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল, জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল, জাতীয় উদ্যান, বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য কিংবা অন্য কোনো সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা অনুমোদন করা হয় না। ভারতীয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ‘তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনসংক্রান্ত গাইডলাইন, ১৯৮৭’ অনুসারেও কোনো সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা যায় না। এ জন্য গত কয়েক বছরে ভারতের কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুতে তিনটি বিদ্যুৎ প্রকল্প আটকে গেছে।

ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসির এই প্রকল্প সম্পর্কে ভারতের স্বাধীন বিশেষজ্ঞরাও ব্যাখ্যা করে বলছেন, তা কীভাবে মহাবিপর্যয় ঘটাবে (প্রথম আলো, ১৬ এপ্রিল ২০১৭)। শ্রীলঙ্কাও এ কারণে তার উপকূলে এনটিপিসির একটি কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে এই প্রকল্পের জোরে সুন্দরবনের ‘ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া’ বলে স্বীকৃত অঞ্চলে আরও শতাধিক বনগ্রাসী-ভূমিগ্রাসী বাণিজ্যিক প্রকল্প নিয়েছে দেশি দখলদারেরা। পাশাপাশি অনেক বেশি ব্যয়, অসম্ভব ঝুঁকি নিয়ে, কোম্পানিকে দায়মুক্তি দিয়ে তৈরি হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ভুল গৌরবে মানুষকে আচ্ছন্ন করে অচিন্তনীয় বিপদে ফেলা হচ্ছে দেশকে। সবই হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে।

বিদ্যুৎ–সংকট সমাধানে অনেক ভালো পথ অবশ্যই আছে। সর্বজনের সম্পদে শতভাগ জাতীয় মালিকানা ও শতভাগ সম্পদ দেশের কাজে ব্যবহার, দুর্নীতি করার দায়মুক্তি আইন বাতিল করে ‘খনিজসম্পদ রপ্তানি নিষিদ্ধকরণ আইন’ প্রণয়ন, পিএসসি প্রক্রিয়া বাতিল করে স্থলভাগে ও সমুদ্রে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে জাতীয় সংস্থাকে প্রয়োজনীয় সুযোগ, ক্ষমতা ও বরাদ্দ প্রদান, রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র মেরামত ও নবায়ন, উন্মুক্ত খননপদ্ধতি নিষিদ্ধসহ ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ, নবায়নযোগ্য ও অনবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পদের সর্বোত্তম মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি জ্বালানি নীতি প্রণয়ন, দীর্ঘ মেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি মূলধারায় নিয়ে আসা ইত্যাদিই যথাযথ পথ। এর মাধ্যমেই দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই, সুলভ, নিরাপদ এবং জনবান্ধব উন্নয়নধারা তৈরি করা সম্ভব। ২০১৭ সালে এ জন্য ‘তেল–গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ–বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’ একটি বিকল্প খসড়া পরিকল্পনাও প্রকাশ করেছে।

কিন্তু সরকার যাচ্ছে উল্টো পথে, যা ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ, বন-পানি-মানুষ-পরিবেশবিধ্বংসী এবং ঋণনির্ভর। এতে কিছু দেশি–বিদেশি গোষ্ঠীর লাভ হলেও দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে ভয়াবহ অনিশ্চয়তা, বিপদ ও বিপন্নতার দিকে। এগুলো মানববিধ্বংসী অস্ত্রের মতোই মানুষ ও প্রকৃতিবিধ্বংসী প্রকল্প।

গায়ের জোরে যতই ঢোল পেটানো হোক, দেশকে যা বিপন্ন করে তা উন্নয়ন নয়।
(১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত)