দেশের সব প্রতিষ্ঠানের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বর্তমান সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষমতাধর সরকার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশেষত ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর থেকে গত পাঁচ বছর এই ক্ষমতা একচ্ছত্রকরণ অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। সরকার সর্বস্তরে একচেটিয়া ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ, দমন-পীড়নকে যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে ‘উন্নয়ন’ যাত্রার ছবি উপস্থিত করে।

বর্তমান সরকার উন্নয়নের যে ধারা জোরদার করেছে, সেই ধারা বা উন্নয়ন মডেল কোনো নতুন মডেল নয়; এটি চলছে কয়েক দশক ধরেই,
বিশেষত আশির দশক থেকে তা স্পষ্ট অবয়ব নিয়েছে। পুঁজিবাদ বিকাশের এই মডেল বর্তমানে ‘নিও লিবারেল মডেল’ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। নামে লিবারেল বা উদারনৈতিক হলেও তা শুধু পুঁজির জন্যই উদারনৈতিক, মানুষ ও প্রকৃতির ওপর আগ্রাসী, দৃষ্টিভঙ্গিতে কট্টর রক্ষণশীল। এই মডেল অনুযায়ী কতিপয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মুনাফা বৃদ্ধির জন্য দুনিয়া উন্মুক্ত, উন্মুক্ত স্থান-বন-নদী-পাহাড়-শিক্ষা-চিকিৎসা-কৃষি-জমি। সবকিছু মুনাফা
বৃদ্ধির জন্য কতিপয়ের দখলে যাবে, তাতে সর্বজনের জীবন-জীবিকা-প্রাণ-প্রকৃতি-বায়ু-পানি-নিরাপত্তার যে দশাই হোক না কেন। সর্বজনের
জন্য রাষ্ট্র বা সরকারের দায়িত্ব ব্যাপকভাবে সংকুচিত করে তার জায়গা দেওয়া হবে বিভিন্ন বাণিজ্যিক গোষ্ঠীকে।

যা বর্তমান সরকারের কৃতিত্ব হিসেবে দেশ-বিদেশের করপোরেট গোষ্ঠীর কাছে স্বীকৃত তা হলো জোর কদমে, নির্দ্বিধায়, জনমতের তোয়াক্কা না করে, আইন-বিধি অগ্রাহ্য করে, দেশের জন্য ফলাফল পাত্তা না দিয়ে দ্রুত এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের দৃঢ়তা। এই দৃঢ়তা নিয়েই এবারের নির্বাচনে সরকারি দলে ও আশপাশে মনোনয়ন নিশ্চিত করেছেন এমন অনেকে যঁাদের বিরুদ্ধে ব্যাংকঋণ ফেরত না দেওয়া, শেয়ারবাজারে ধস নামিয়ে লাখ লাখ মানুষকে পথে বসিয়ে দেওয়া, মাদক ব্যবসা, খুন ও নদী-বন দখলের অভিযোগ রয়েছে। এঁরা সবাই এই উন্নয়ন মডেলের প্রধান নায়ক, সুবিধাভোগী ও এই মডেল অব্যাহত রাখার প্রধান শক্তি। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এঁদের ক্ষমতা বৃদ্ধির আয়োজন হয়েছে, এই ক্ষমতা বৃদ্ধি নিশ্চিতভাবেই এই ‘উন্নয়ন’ ধারাকে আরও শক্তিশালী করবে। সামনে আমরা তাই দেখব আরও সর্বজনের সম্পদ ব্যক্তির হাতে হস্তান্তর, দেখব বন-নদী বিনাশ, দেখব জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মানুষের প্রান্তিকীকরণ।

এই মডেলে আর্থিক প্রবৃদ্ধি খুব দ্রুত হয়, জৌলুশ বাড়ে। কমিশন, দুর্নীতির বহুমাত্রিক রূপ এর মাত্রা বাড়ায়। এর চুইয়ে পড়া ফলাফলে সুবিধাভোগী, উচ্ছিষ্টভোগী মধ্যবিত্তের মধ্যেও নতুন সম্পদশালী তৈরি হয়। যেমন শিক্ষা ও চিকিৎসা বাণিজ্যিকীকরণের ফলে শুধু এর ব্যবসায়ীরা নয়, শিক্ষক-চিকিৎসকদের একটি অংশের আয় সুবিধাও বেড়েছে। জমি দখলের উন্মাদনায় জমির দাম বেড়ে উন্নয়নের মায়া বা ইলিউশন তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগ পথে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা না থাকায় তার প্রসার ঘটে জনগণের জন্য নানা বিপজ্জনক পথে। ফাটকাবাজারি পথে আয়রোজগারের সম্ভাবনা তৈরি হয়। অন্যদিকে সরকারের আয় বৃদ্ধির জন্য করজাল সম্প্রসারিত হয়, পাবলিক সার্ভিসের দাম বাড়ে। এই বর্ধিত আয় বিতরণ হয় সমাজে মত প্রভাবক শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে নানা মাধ্যমে। এরাই হয়ে দাঁড়ায় এই মডেলের প্রধান সমর্থক ও প্রচারক।

এই মডেলে আন্তর্জাতিক পুঁজিও খুব স্বচ্ছন্দবোধ করে। প্রবেশে বাধা কম, খরচ কম, আর সরকার যদি এমন হয় যে পরিবেশগত বা সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি যার কাছে তুচ্ছ, কমিশন বা সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে যা খুশি তাই করে উচ্চ হারে মুনাফা বাইরে পাঠানো যায়, তাহলে সেসব দেশে তাদের আগ্রহ বেশি থাকে। বাংলাদেশে এখন রামপাল, রূপপুরসহ ভারত, চীন, জাপান, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণপ্রকৃতিবিনাশী বহু প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে। ভারত রাজনৈতিকভাবেই অনেক প্রভাবশালী, চীনের প্রভাব প্রধানত টাকার জোরে। প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই এর আর্থিক ভাগীদারের সংখ্যা অনেক, ক্ষমতাবানদের চাহিদাও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। সে কারণেই সড়ক, সেতুসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যয়বহুল।

 ‘উন্নয়নের গণতন্ত্র’ নামে একটি ধারণা এখন সরকারিভাবেই প্রচার করা হচ্ছে। কর্তৃত্বমূলক শাসনের সাফল্য হিসেবে উন্নয়ন দশক পালন করছে সরকার। স্বৈরশাসন ও উন্নয়ন দশক—এই দুইয়ের সম্মিলিত রূপ আমরা এর আগে আরও দুবার দেখেছি। প্রথমটি জেনারেল আইয়ুব খানের নেতৃত্বে গত ষাটের দশক, দ্বিতীয়টি জেনারেল এরশাদের নেতৃত্বে আশির দশক।

আগের দুই দশকের সঙ্গে বর্তমান দশকের ধারাবাহিকতা যেমন আছে, তেমনি পার্থক্যও আছে। ধারাবাহিকতা হলো সব দশকেই অবকাঠামো উন্নয়নে বহু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, অস্বচ্ছভাবে অর্থ ছড়ানো হয়েছে। আর আগের দুই দশকের সঙ্গে বর্তমান দশকের বড় পার্থক্য হলো, আগের দুই স্বৈরশাসকের সংগঠিত জনভিত্তি ছিল না। এই দুই সময়েই সামরিক শাসনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর এই স্বৈরশাসকেরা নিজেদের জনভিত্তি তৈরি করতে চেষ্টা করেছেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবলে। আইয়ুব আমলের ‘বনিয়াদি গণতন্ত্র’ কাঠামোয় ইউনিয়ন পর্যন্ত ক্ষমতার জাল, এরশাদ আমলে উপজেলা-ব্যবস্থা সেসব চেষ্টার কিছু দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে বর্তমান সরকার শক্তিশালী ও সংগঠিত জনভিত্তি নিয়েই ক্ষমতায় এসেছে। আগের দুই দশকে কোনো বৃহৎ রাজনৈতিক দল শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিল না, পরে দল গঠন করা হয়েছে। এবার বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে পুরোনো সক্রিয় বৃহৎ রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র তৎপরতার কেন্দ্রে আছে। প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত তাই এই সরকারের সমর্থন ভিত্তি আছে। আগের দুই দশকে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক ঐক্যের ভিত্তিতে বিপুল গণ-আন্দোলন তৈরি হয়েছিল, এই সরকারের বিরুদ্ধে এ রকম কোনো গণ-প্রতিরোধ তৈরি হয়নি, কারণ এই সরকারের জনসমর্থনও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় আছে। স্বৈরশাসন যখন জনসমর্থনের ওপর ভর করে পরিচালিত হয়, তখন এর পরিণতি কী হয় তার উদাহরণ ইতিহাসে রয়েছে।

বর্তমান উন্নয়ন ধারা নির্বাচনকেও ‘বাজার নির্বাচন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এটা ঠিক যে ভোটার এমনকি প্রার্থী কেনাবেচা শুধু আজকের বিষয় নয়, অনেক আগেও এ ধরনের কথা শোনা যেত। তবে আগে যা ছিল ব্যতিক্রম, নিন্দনীয়; এখন তা সাধারণ ও সমাজস্বীকৃত বিষয়। এখন নির্বাচনের শুরু থেকে তার পরবর্তী সব তৎপরতা আর্থিক লেনদেন, লাভ, কেনাবেচা ইত্যাদি দ্বারা নির্ধারিত। বাজার নির্বাচনের এই রূপ আগে এভাবে দেখা যায়নি। যে কারণে বাজার প্রতিযোগিতায় সরকারি দলের বহু পুরোনো রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীরাও ছিটকে বাইরে চলে যাচ্ছেন, সেই জায়গা দখলে নিচ্ছেন বাজার তৎপরতায় সফল ব্যক্তিরা।

নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। এর ১০০ গুণ বেশি অঙ্কও অনেকের আসল ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম। নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহ প্রকাশ করতেই এর থেকে বেশি টাকা খরচ হয়। প্রথমে মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরির জন্যই খরচ করতে হয় অনেক টাকা, মনোনয়নপত্র কেনার সময় সমর্থক এবং সহযোগীদের নিয়ে বহর তৈরিও অনেক ব্যয়বহুল। মনোনয়ন পাওয়ার ঘটনা যেমন একটা বিরাট সাধনা
ও ধরাধরির বিষয়, তেমনি তা অনেক টাকারও বিষয়। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রার্থীকে নিজ নিজ দলে বড় অঙ্কের টাকা জমা দিয়েই মনোনয়ন নিশ্চিত
করতে হয়। তারপর শুরু হয় আসল খরচের পর্ব। কত টাকা খরচ হয়? কোটি তো বটেই, একক, দশক না শতক? ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেই এখন কোটি টাকার কথা শোনা যায়। দশক শতক তো সংসদ নির্বাচনে আসবেই। এই টাকার সঙ্গে আয়ের উৎস মেলাতে গেলে খুবই সমস্যা। প্রচলিত ভাষায় ‘কালো’, ভদ্র ভাষায় অপ্রদর্শিত এবং প্রকৃত অর্থে চোরাই টাকাই তাই হয়ে দাঁড়ায় নির্বাচনের প্রধান চালিকা শক্তি। বলাই বাহুল্য, এই অর্থ বিনিয়োগ মাত্র, বহুগুণ তুলে আনার মাধ্যম। বর্তমান উন্নয়ন ধারাই এই অর্থের সৃষ্টি করেছে, তা আবার এর বহুগুণ বৃদ্ধির জন্যও সুবিধাজনক।