ঘটনাটা আরও অনেক ঘটনার মতোই। রাতে কোনো সময় কিংবা ভোরে মাইক্রোবাসসহ দলে–বলে এসে ত্রাস সৃষ্টি, হুমকি-ধমকি ও জোরজবরদস্তি করে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া। এরপর প্রথমে অস্বীকার করা, পুলিশের নির্লিপ্ত ভাব, কয়েক ঘণ্টা বা কিছুদিন পর গ্রেপ্তার দেখানো। এরপর রিমান্ড। বিশ্ববিখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী, শিক্ষক ও লেখক ডক্টর শহিদুল আলমের ক্ষেত্রেও এই মডেলেই কাজ হয়েছে। তবে অপহরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সংখ্যা ছিল আরও বেশি। সিসিটিভি ভাঙা হয়েছে, বাড়ির প্রহরীদের বাঁধা হয়েছে। পরের দিন ৬ আগস্ট সকালে শহিদুলের সন্ধান মিলল, মানে সরকার থেকে আটকের খবর স্বীকার করা হলো। বিকেলে তাঁকে দেখা গেল কোর্টে, খালি পায়ে। হাঁটার শক্তি নেই। এক রাতে সুস্থ, সক্ষম, সক্রিয় ও সরব মানুষকে অচল বানানোর চেষ্টায় নির্যাতনের বহু প্রশিক্ষণ যে তাঁর ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে, এরই প্রমাণ শহিদুলের শরীরে—আশঙ্কা করি, আরও করার ইচ্ছায় তাঁকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। তবে হাইকোর্টের নির্দেশে চিকিৎসার জন্য তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপক্ষ এই আদেশ বাতিলের আবেদন করেছে, যার শুনানি হবে আজ।

এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম প্রশ্ন হলো কেউ যদি প্রচলিত আইন অনুযায়ী অপরাধ করে, তাহলে তো আইনসম্মতভাবেই সরকারের গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের এখতিয়ার আছে। গৃহস্থবাড়িতে ডাকাতের মতো হামলার কারণ কী? কেন ক্রসফায়ার, গুম নিয়ে অবিরাম মিথ্যাচার? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নামে পরিচিত প্রতিষ্ঠানের লোকজনদের কেন এত বেআইনি কাজে আগ্রহ? সরকারের কেন এই পথে এত উৎসাহ?

এর আগের দুদিন শহিদুল পথে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ছবি তুলতে গেছেন, তাড়া খেয়ে আক্রান্ত হয়ে সেই নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর ভয়াবহ আক্রমণের চিত্র সবাইকে জানাতে চেষ্টা করেছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ উপস্থিত করেছেন। শহিদুলের মত তো তাঁরই হবে, সেটা তো সরকার বা অন্য যে কারও সঙ্গে না-ও মিলতে পারে। এই না মেলাটাই কি শহিদুলের অপরাধ? আর এতে যদি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, তাহলে কারা দায়ী? যারা রামদা, লাঠি, হেলমেটসহ সন্ত্রাসীদের বর্বর হামলায় পাঠাচ্ছে—তারা; না যঁারা এ অবস্থার কথা গণমাধ্যমে জানাচ্ছেন, তঁারা?

সরকারকে বলি, শহিদুলের কোনো সাক্ষাৎকার বা বক্তব্য যদি আপনাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে না হয়, তাহলে আপনাদের পাল্টা বক্তব্য উপস্থিত করাই তো যুক্তিযুক্ত ছিল। কথার উত্তর কথা, লেখার উত্তর লেখাই তো হওয়ার কথা। আইনি প্রক্রিয়াতেও তা হতে পারত। যারা তথ্য ও মতের মোকাবিলা করতে পারে না, তারাই অসহিষ্ণু হয়, আর কথা বা লেখার জন্য গুম, খুন বা অত্যাচার—এটা তো জঙ্গিবাদী মতাদর্শ।

গত কিছুদিনে তরুণেরা অনেকগুলো বিষয় নিয়ে রাস্তায় এসেছেন। সর্বশেষ নিরাপদ সড়কের দাবি কিংবা বলা যায় বেঁচে থাকার দাবি। বাংলাদেশে বছরে প্রতিবছর পাঁচ থেকে সাত হাজার মানুষ খুন হয় রাস্তায়—এর চার গুণ বেশি মানুষ জখম হয়, অনেকের অবস্থা হয় মৃত্যুর চেয়েও খারাপ এবং এসব দুর্ঘটনা ঘটে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লাইসেন্স ছাড়া চালক, খারাপ রাস্তা, চালকদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা, প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভর করে ফেলা ইত্যাদি কারণে। সব কটিরই সমাধান সম্ভব, অথচ এর সমাধানে কোনো নজরই দেখা যায়নি সরকারের। বছরের পর বছর একই অবস্থা চলায়, দুর্নীতি-লুণ্ঠন-সন্ত্রাস সব সমাধানের পথ বন্ধ করে দেওয়ায় যে ক্ষোভ, তারই প্রকাশ ঘটেছে স্কুলের ছোট ছেলেমেয়েদের আন্দোলনে।

সাত দিন ধরে সড়কে ছিল কিশোর বাহিনী। কোনো বিশৃঙ্খলা করেনি, ভাঙচুর করেনি। সরকারের আশ্বাস বাস্তবায়নের পথ দেখতে চেয়ে নিজেরাই দিনভর পরিশ্রমের পথ বেছে নিয়েছে। লাইসেন্স, ফিটনেস দেখেছে, রাস্তায় শৃঙ্খলা এনেছে। এই শিক্ষার্থীদের জন্য রাস্তায় চলাচলে কারও সমস্যা হয়নি, বরং আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সড়ক চলাচল, বিনা পয়সায় তারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছে। মন্ত্রীরা উল্টো পথে গিয়ে, আইন ভেঙে পুলিশ কর্মকর্তাসহ সরকারি বড় কর্মকর্তা, ভিআইপি, সিআইপি ধরা খেয়েছেন এই কিশোরদের হাতে। বহু গাড়িচালকের লাইসেন্স নেই কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ, ফিটনেস নেই। জনগণের সমস্যা হয়েছে বরং সরকার-সমর্থিত মাফিয়া চক্রের ধর্মঘটের কারণে, সরকারের সন্ত্রাসী তৎপরতার কারণে। তারা লাইসেন্স ও ফিটনেস ছাড়াই বাস ও দেশ চালাতে চায়—সমস্যা সেখানেই! সে জন্য সমাজের সর্বাত্মক সমর্থনে শক্তিপ্রাপ্ত এই আন্দোলনের মধ্যেও ‘সড়ক দুর্ঘটনায়’ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চালক, পথচারীসহ ১০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন।

আর সর্বজনের স্বার্থে কাজ করতে গিয়ে শ্রমক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, ঘর্মাক্ত সেই শিশু-কিশোরদের ওপরই পুলিশ সহযোগে সরকারি সন্ত্রাসীরা হামলা করেছে। নিরস্ত্র, দায়িত্বশীল, সুশৃঙ্খল, শান্তিপূর্ণ, প্রতিবাদী ও গঠনমূলক ভূমিকা দিয়ে যে কিশোর ছেলেমেয়েরা সারা দেশ এবং বিশ্বের মানুষের সামনে এক মুগ্ধ বিস্ময় ও আশাবাদিতা তৈরি করেছে, তাদের ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়েছে তারা। কিশোরদের সমর্থনে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পথে নেমেছে, তখন আক্রমণ আরও উলঙ্গ হয়েছে। ৪, ৫, ৬ আগস্ট ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে এসব হামলার ঘটনা ঘটেছে। গুলি, যৌন আক্রমণ, লাঠি, চাপাতি—কোনো কিছুই বাদ দেয়নি এরা। সাংবাদিকেরাও রেহাই পাননি। যেন সরকারকে যেকোনো মূল্যে লুটেরা, চাঁদাবাজ, খুনিদের রক্ষা করতেই হবে! তিন শতাধিক শিশু-কিশোর শিক্ষার্থী ছেলেমেয়ের শরীরে এখন সরকারি পুলিশ কিংবা সন্ত্রাসীদের আঘাত। হেলমেট, চাপাতি, বন্দুকসহ আক্রমণকারীদের এত এত ছবি থাকতেও সরকার তাদের শনাক্ত করতে নারাজ, অনুপ্রবেশকারী বলতে থাকবে কিন্তু কাউকে ধরবে না—এটাই সরকারের অবস্থান।

এ পরিপ্রেক্ষিতে আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন, বর্তমান সময়ে আইনের শাসন হয়ে দাঁড়িয়েছে এ রকম—যারা প্রকাশ্যে বন্দুক, রামদা, হাতুড়ি নিয়ে মানুষ মারবে, তারা সরকারের সব রকম বাহবা পাবে আর যারা তাদের হাতে ক্ষতবিক্ষত হবে বা যারা মানুষ হিসেবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, হুমকি-হামলা ছাড়াও তাদের বিরুদ্ধে মামলা হবে, রিমান্ড হবে, রাতের অন্ধকারে তুলে নেওয়া হবে। সরকার কি এ অবস্থাকেই আইনের শাসন বলছে?

আমার তৃতীয় প্রশ্ন, সরকারের কেন এত ভয়? সরকারকে গত কিছুদিন থেকেই খুব ভীতসন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে। স্কুলের ছেলেমেয়েদের ভয়, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে ভয়, প্রশ্নকে ভয়, যেকোনো মতামতকেই ভয়, ক্যামেরা আর সাংবাদিকদের ভয়, ফেসবুক-ইন্টারনেটে ভয়। সরকারের এই ভয়ই বাড়িয়েছে অসহিষ্ণুতা, বাড়িয়েছে দমন-পীড়নের মাত্রা। বর্তমান ডিজিটাল কালে কোনো তথ্যই তো দেশের সীমানায় আটকে থাকবে না। যে সরকার নিজেদের সাফল্যগাথায় ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং মহাশূন্যে উপগ্রহ স্থাপনকে উচ্চস্থান দেয়, তারাই এখন ইন্টারনেট-ফেসবুক-আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ভয়ে সন্ত্রস্ত। কেন?

আমার চতুর্থ প্রশ্ন, সরকার কি ভুলে গেছে যে দেশে এখনো সংবিধান আছে? বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ীই প্রত্যেকের আইনসম্মত অধিকার নির্ধারিত আছে। রাতের আঁধারে বাড়িঘরে হামলা করে পরিচয় অস্পষ্ট রেখে কাউকে তুলে নেওয়া যায় না, যখন-তখন তুলে নিয়ে নির্যাতন করা বা খুন করার অধিকার রাষ্ট্রকে এই সংবিধানও দেয়নি। উপরন্তু সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেকের তাঁর মতপ্রকাশের অধিকার আছে। সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেকের প্রতিবাদ, সমাবেশের অধিকার আছে। সরকার তাহলে কেন বারবার সংবিধান লঙ্ঘন করছে?

মাঝেমধ্যে ভাবতে চাই, সরকারের উপদেষ্টা শুভাকাঙ্ক্ষী বুদ্ধিজীবীদের সবাই নিশ্চয়ই বিকল বা অন্ধ হয়ে যাননি। এঁরা নিশ্চয়ই সরকারকে থামাতে চেষ্টা করবেন। কিন্তু দেখি, এঁরাও কিশোর-তরুণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে হাতুড়ি, রামদা, চাপাতি, পিস্তল, লাঠি হাতে সরকারি সন্ত্রাসীদেরও চোখে দেখেন না। তুলে নিয়ে নির্যাতন, হেফাজতে নির্যাতন, পথে পথে নির্যাতন তাই চলছেই। কিন্তু মিথ্যা কথার তোড়ে, নিয়ন্ত্রণের জালেও ভয়ংকর নির্মম দৃশ্যাবলি ঢাকা যাচ্ছে না। ক্যামেরা ভেঙে, সাংবাদিক রক্তাক্ত করে, মিডিয়ার ওপর রক্তচক্ষু দিয়ে কি সত্য ঢাকা যায়? মানুষের স্মৃতি, রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা কি মুছে ফেলা যায়?
(09 আগস্ট 2018 তারিখে প্রথম আলেতে প্রকাশিত)