base 1516196161 xdftগত কিছুদিনে দেশের ভেতর একই সময়ে চাল, ডাল, তেল, মরিচ, পেঁয়াজ, মাছসহ অনেক পণ্যেরই দাম বেড়েছে অযৌক্তিকভাবে। বেড়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম, পরিবহন ব্যয়, বাসাভাড়া। এর একটি অংশের দাম বাজারে নির্ধারিত হয়, আর কোনোটির দাম নির্ধারণ বা বৃদ্ধি করে সরকার। এ দাম বৃদ্ধির কারণে দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ, সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, প্রকৃত আয়ের পতন ঘটছে। এর ধাক্কায় প্রান্তিক অবস্থানে থাকা মানুষেরা দারিদ্র্যসীমার নিচে পড়ে যায়। বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টিগ্রহণে নিম্নতম মাত্রা অব্যাহত রাখতে না পারায় অপুষ্ট ও অসুস্থ জনসংখ্যাও বাড়ে। প্রকট চাপ পড়ে নারী ও শিশুদের ওপর। কিন্তু কী কারণে কিছুদিন পরপর এ চাপ তৈরি হয়?

অর্থশাস্ত্রের সাধারণ ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উৎপাদন ব্যয় ছাড়াও জিনিসপত্রের দাম বাজারের চাহিদা-জোগানের ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। জোগান স্থির থেকে চাহিদা বাড়লে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, চাহিদা কমলে দাম কমে। অথবা জোগান যতটা আছে, চাহিদা যদি তার থেকে বেশি হয় তাহলে দাম আগের তুলনায় বেড়ে যায়। আবার অন্যদিক থেকে চাহিদা স্থির থাকলে মানে চাহিদার ক্ষেত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন হলো না কিন্তু জোগান বেড়ে গেল, তাহলে দাম কমে যাবে। অথবা জোগান যতটা আছে, তার চাহিদা সে রকম নেই, তাহলেও দাম কমে যাবে। 

এখন কোনো পণ্যের তা সে চাল, ডাল, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন কিংবা বাসাভাড়া যা-ই হোক না কেন, তার দাম যদি বাড়তে থাকে তাহলে প্রচলিত অর্থশাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী উৎপাদন ব্যয় স্থির থাকলে কারণ খোঁজার জন্য চাহিদা-জোগানের দিকেই তাকানো হয়। এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী দাম বাড়ার পেছনে তাহলে দুদিক থেকে দুটো কারণ কাজ করতে পারে— এক. জোগান কমে যাচ্ছে অথবা দুই. জোগান স্থির থাকলেও তার তুলনায় চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে।

জোগান কমে যেতে পারে কোনো কারণে যদি উৎপাদন কমে যায় কিংবা যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কোনো কারণে উৎপাদন বিনষ্ট হয় কিংবা যদি উৎপাদন-পরবর্তী বিপণন কোনো না কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। চাহিদা বেড়ে যেতে পারে দুভাবে: এক. কোনো নির্দিষ্ট উপলক্ষ ধরে কোনো নির্দিষ্ট একটি বা একগুচ্ছ পণ্যের চাহিদা বেড়ে যেতে পারে কিংবা দুই. সাধারণভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার ফলে নিকৃষ্ট পণ্য ছাড়া বাকি সব পণ্যেরই চাহিদা বেড়ে যেতে পারে।

প্রথম কারণটি বিশেষ উপলক্ষ ধরে হয় বলে তা সাধারণ চিত্র হওয়ার কথা নয়। যেমন— রমজান মাসে বাংলাদেশে মুড়ি, পেঁয়াজ, ছোলার চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু এ চাহিদা বৃদ্ধি যেহেতু নির্দিষ্ট সময়ের এবং আগে থেকেই জানা, সেজন্য এর জোগানও বেড়ে যায়। রমজান মাসে বিভিন্ন স্থান থেকে যে পরিমাণ মুড়ি এবং দোকানে দোকানে বুট, পিয়াজু উৎপাদন হয়, বছরের আর কোনো সময়ই তা হয় না। এর ফলে বর্ধিত চাহিদা উপস্থিত হলেও অধিকতর বর্ধিত জোগান আসার কারণে দাম বাড়ার কথা নয়। তবুও বাড়ে। রমজান মাস যদিও সংযমের মাস, কিন্তু রোজা রাখার সুবাদে খাওয়াদাওয়ার প্রতি একটু বিশেষ মনোযোগ দেন একেবারে অক্ষম ছাড়া সবাই। বহু পার্টি হয়। তার ফলে মাছ, মাংস, দুধ, মিষ্টি, সবজি ইত্যাদির চাহিদা বাড়ে। জোগানও বাড়ে। কিন্তু দামও বাড়ে।

রমজান মাসের মতো বিশেষ সময়ের বা উপলক্ষের কালে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি তাই অর্থনীতির চাহিদা-জোগান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এখানে বিশেষ ভূমিকা পালন করে ভোক্তাদের জিনিসপত্র ক্রয়ের ব্যাপারে চাহিদা অনমনীয়তা। অর্থাৎ দাম বাড়লেও চাহিদা এখানে কমে না। এবং এ অনমনীয়তা বা বাধ্যবাধকতার সুযোগটিই গ্রহণ করতে চেষ্টা করেন ব্যবসায়ীরা। এ দাম বাড়ার ক্ষেত্রে আবার এক ধরনের সামঞ্জস্যও দেখা যায়। সামঞ্জস্য মানে মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাজারে খুব একটা তারতম্য দেখা যায় না। তাতে বোঝা যায় যে, এ মূল্যবৃদ্ধি বৃহৎ পাইকারি পর্যায় থেকে হচ্ছে— স্বয়ংক্রিয় বা বিচ্ছিন্নভাবে নয়।

ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণভাবে অর্থনীতিতে গড় চাহিদা বৃদ্ধি পেতে পারে। ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির আরেক নাম প্রকৃত আয় বৃদ্ধি। টাকা-পয়সার আয় বাড়লেই ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যদি দামস্তর বেড়ে যায়, মূল্যস্ফীতি হয়, টাকার মূল্য বা ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, তাহলে টাকার অংকে আয় বাড়লেও প্রকৃত আয় কমে যেতে পারে। বাংলাদেশে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির যে হার সরকারিভাবে জানানো হচ্ছে, তা আরো বেশি হওয়ার কথা, বর্তমান সরকারি হার দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় কৃষক, শ্রমিক (শিল্প ও অশিল্প), পেশাজীবীসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ক্ষেত্রে আমরা বরং প্রকৃত আয়ের নিম্নগতি দেখি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আয়ের এ গতি বিবেচনা করলে কোনোমতেই বলা যায় না যে, গড় চাহিদা বেড়েছে। পণ্যের ক্ষণে ক্ষণে, ধীরে কিংবা লাফিয়ে মূল্যবৃদ্ধি সুতরাং এটা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তবে ‘বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে প্রকৃত আয় কমে গেছে’— এ তথ্যে কারো কারো খটকা লাগার কারণ আছে। কিছু প্রশ্ন তাদের মুখে ভিড় করতে পারে। যেমন: ১. তাই যদি হয় তাহলে এত কেনাকাটা, এত বাজার কী করে চলছে? ২. কী করে নিম্নমধ্যবিত্ত পর্যায়েও নতুন নতুন পণ্য যোগ হয়েছে?

পরিস্থিতির এই আপাত স্ববিরোধিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর উত্তর পেতে গেলে অর্থনীতির ধরনে পরিবর্তন কী কী হয়েছে, সেদিকে তাকাতে হবে। দেখতে হবে প্রতিটি পরিবারে কীভাবে একজনের বদলে একাধিক জনের কাজ খোঁজার প্রবণতা, নির্দিষ্ট আয়ের বাইরে আয়ের নানা পথ অনুসন্ধান, প্রবাসী আয়ের যোগ, বিভিন্ন ধরনের ঋণবাজার বিস্তার এবং সর্বোপরি বাজার সম্পর্কের বিকাশ ও পণ্যকরণের সম্প্রসারণ ইত্যাদি। কীভাবে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে এবং দাম বাড়ার চাপে মানুষের শ্রমসময় বাড়ানো হচ্ছে, সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হতে পারে। 

জোগান কম হলে কোনো পণ্যের দাম বাড়তে পারে। কিংবা কোনো পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি তার দাম বাড়ার চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আমরা চাল, ডাল, চিনি, সবজি, পেঁয়াজ ইত্যাদির জোগানধারা খেয়াল করলে এটা স্পষ্টতই দেখি যে, জোগান কম হচ্ছে তা নয়। দেশের ভেতর যেসব পণ্য উৎপাদনে নানা কারণে ঘাটতি হচ্ছে, সেসব পণ্য জোগানে বৈধ আমদানি বা চোরাচালান (অবৈধ আমদানি) বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। তাহলে সমস্যা হয় কোথায়? কেন হঠাৎ হঠাৎ লাফিয়ে লাফিয়ে মূল্যবৃদ্ধি ঘটে?

আবার এমন অনেক পণ্যের বাজারদর চড়া থাকছে, যেগুলো দেশে উৎপাদিত এবং উৎপাদনের স্তরে সেই পণ্যের দাম ভোক্তাপর্যায়ে দামের তুলনায় অনেক কম। যখন ঢাকার বাজারে মাছ, সবজি, চাল ইত্যাদির দাম বাড়ছে, তখন চাঁদপুর বা দিনাজপুরসহ দূরবর্তী অঞ্চলের উৎপাদকের প্রাপ্তি দাম বাড়ছে না। তাহলে বর্ধিত দাম যাচ্ছে কোথায়?

এ অনুসন্ধানেই আমরা পাব মুক্ত বাজারের আড়ালে কতিপয় গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ও একচেটিয়া কর্তৃত্বের সন্ধান। কতিপয় আমদানিকারক, কতিপয় পাইকার, পণ্য বাজারজাত প্রক্রিয়ায় খাজনা বা চাঁদাবাজগোষ্ঠী কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে মুনাফার আকার বাড়ে। উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত পণ্যের যে যাত্রা, সেখানেই অযৌক্তিক দাম বাড়ার বড় কারণ ঘটে। উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে সম্পর্কহীন কিন্তু প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সরকারি দলের নানা বাহিনী, পুলিশ প্রভৃতির সংখ্যা ও সক্রিয়তা আগের থেকে অনেক বেশি। ঘাটে ঘাটে তাদের চাহিদা পূরণের পুরো ভার নিরীহ অসংগঠিত ক্রেতাদের ওপরই পড়ে। এর সঙ্গে যোগ হয় প্রভাবশালী আমদানিকারক ও পাইকারি জোগানদারদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের সফল কারসাজি।  

জীবনযাত্রার অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে আরো কারণ আছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবির মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় ‘দাতা সংস্থা’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এ পরিচয় নিয়ে নির্ভরশীলতা ও চিন্তার আধিপত্য তৈরি করে, নানা উন্নয়ন কর্মসূচি বা সংস্কারের নামে এসব প্রতিষ্ঠান বস্তুত বহুজাতিক সংস্থাসহ দেশী-বিদেশী করপোরেটগোষ্ঠীর স্থান ও অধিক মুনাফার পথ তৈরি করতে নিয়োজিত থাকে। তাই তাদের কর্মসূচিতে সবসময় থাকে বেসরকারীকরণ, আমদানি বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় খাতে ভর্তুকি হ্রাস, শিক্ষা, চিকিত্সার অবিরাম বাণিজ্যিকীকরণ, গ্যাস-তেল বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া, পানির দাম বৃদ্ধি, সড়কে টোল বৃদ্ধি ইত্যাদি। সরকার তাদের সাজানো পথ ধরেই হাঁটে। কেননা সেখানেই প্রভাবশালীগোষ্ঠীর লাভ। তার ফলে দাম বাড়ে অনেক সেবা পণ্যের। এসব কর্মসূচি সবসময়ই দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, নাগরিকদের ব্যয় বৃদ্ধি এবং সব মিলিয়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। দেশীয় চাঁদাবাজদের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে কিংবা জনগণের পকেট কাটায় এদের ভূমিকাও কোনো অংশে কম নয়।

[১৮ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে বণিকবার্তায় প্রকাশিত]