আসল বুদ্ধিমত্তার মানুষদের কথা

d04481c6ba18e58843552dd19b1dbb31 5a2d3095cf8b7কোটি টাকা দিয়ে আনা ‘সোফিয়া’কে নিয়ে সরকারের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো। সেই উচ্ছ্বাস সংবাদমাধ্যমের উত্তেজনার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে। বিজ্ঞাপন হিসেবে খরচটা একটু বেশিই হয়েছে। এর আগে রেস্টুরেন্ট ওয়েটার হিসেবে আমদানি হয়েছে রোবট। তার বিজ্ঞাপন খরচ আর প্রাপ্তি কেমন হলো জানি না। মনে পড়ে, এ দেশে যখন প্রথম কম্পিউটার আসে, তখন বহু দোকানে বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো, কম্পিউটার দিয়ে চোখ দেখা হয়, হাত দেখা হয়! বোঝানোর চেষ্টা হতো, কম্পিউটার মানুষের চেয়ে বেশি বোঝে এবং তা অভ্রান্ত। ভক্তির দেশে প্রযুক্তি পূজার আবহাওয়াও তৈরি করা সম্ভব।কোটি টাকা দিয়ে আনা ‘সোফিয়া’কে নিয়ে সরকারের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো। সেই উচ্ছ্বাস সংবাদমাধ্যমের উত্তেজনার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে। বিজ্ঞাপন হিসেবে খরচটা একটু বেশিই হয়েছে। এর আগে রেস্টুরেন্ট ওয়েটার হিসেবে আমদানি হয়েছে রোবট। তার বিজ্ঞাপন খরচ আর প্রাপ্তি কেমন হলো জানি না। মনে পড়ে, এ দেশে যখন প্রথম কম্পিউটার আসে, তখন বহু দোকানে বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো, কম্পিউটার দিয়ে চোখ দেখা হয়, হাত দেখা হয়! বোঝানোর চেষ্টা হতো, কম্পিউটার মানুষের চেয়ে বেশি বোঝে এবং তা অভ্রান্ত। ভক্তির দেশে প্রযুক্তি পূজার আবহাওয়াও তৈরি করা সম্ভব।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সোফিয়াকে নিয়ে এই প্রচার-সাফল্যের সময় আসল বুদ্ধিমত্তার মানুষেরাও কিছু কথা বলেছেন। ব্লগার ও গবেষক পারভেজ আলমের পর্যবেক্ষণ এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য। তাঁর লেখার কিছু অংশ এ রকম, ‘...হংকং-এর ধোলাইখালে তৈরি মানুষের একটা সিমুলেশন একটি দেশের নাগরিকত্ব লাভ করেছে, আরেকটি দেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের হয়ে কথা বলছে। এমন নাগরিকই তো এখন চায় রাষ্ট্রগুলো। মানুষ নয়, সিমুলেশন। সিমুলেশন যেখানে মানুষ হয়ে উঠছে, সেখানে আমাদের সোশ্যাল নেটওয়ার্কে সময় দেওয়া মানুষেরাও তো একেকটা সিমুলেশন হয়ে উঠছে।...সিমুলেশনদের নিজস্ব কোনো রাজনীতি নেই। তারা যেই পাত্রে থাকে, সেই পাত্রের আকার ধারণ করে। যার প্রতিনিধিত্ব করে, পুরোপুরি তার হয়ে কথা বলে। কারণ, তা না করলে তার কপি করা আইডেন্টিটিটা থাকবে না। সোফিয়াকে বাংলাদেশের জনগণের হাতে তুলে দিলে...সে বরং পেঁয়াজের দামের কথা বলত, গুম হওয়া মানুষের কথা বলত। সুন্দরবনের কথা বলত।’

গত কয়েক দশকে প্রযুক্তির বিকাশ হয়েছে অভাবনীয় মাত্রায়। সোফিয়া প্রযুক্তির বিকাশেরই একটি রূপ দেখাচ্ছে। এসব প্রযুক্তি মানুষের বহু কাজেই লাগানো সম্ভব। কে লাগাবে? যে লাগাবে, সে কী চায় সেটাই প্রশ্ন। আমাদের মনে রাখা দরকার যে প্রযুক্তির বিকাশ যা-ই ঘটুক না কেন, তা মানুষের বুদ্ধিমত্তারই সম্প্রসারণ। মানুষের চিন্তা, কল্পনা আর ক্ষমতা থেকেই এই অগ্রযাত্রা। মানুষই তা পরিচালনা করে। মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে কী হয়, তার গল্প আছে ফ্রাংকেনস্টাইনের দানবের মধ্যে। কিন্তু দানবেরাই যদি মানুষের দুনিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে প্রযুক্তির যত বিকাশ হয়, ততই মানুষের বিপদ বাড়ে। আবার এই বিকাশ মানুষের সামনে তার সম্ভাবনাও উপস্থিত করে। তখন মানুষকে চোখ খুলে দেখতে হয় তার জীবন-জগৎ কারা চালায়। কারা তার মেধার ওপর ভর করে তার জীবন বিনাশ করে।

যে বিশ্বে আমরা বাস করি, সেখানে বিজ্ঞানী বিজ্ঞান গবেষণার প্রধান অংশ সমরাস্ত্র আর যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত। গত কিছুদিন আমরা ড্রোনের কথা অনেক শুনেছি। ড্রোন মানুষের অনেক কাজে লাগতে পারে, কিন্তু ড্রোন আমরা চিনি যত্রতত্র খুব সহজে মানববিধ্বংসী বোমা ফেলার বাহন হিসেবে। পারমাণবিক প্রযুক্তি তো মানুষেরই আশ্চর্য আবিষ্কার, যা দুনিয়ার ওপর বড় বোঝা আর আতঙ্ক হয়ে আছে। ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ যুদ্ধের নামে দুনিয়াজোড়া সন্ত্রাসে নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্র গত ৫০ বছরে পারমাণবিক কর্মসূচিতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছে। প্রতিবছর বিশ্বে সামরিক খাতে যে খরচ হয়, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী তার ১ শতাংশ দিয়ে সারা বিশ্বের সব মানুষের বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু সেই কাজ হয় না।

সারা বিশ্বব্যবস্থা এখন আরও বেশি যুদ্ধমুখী। ট্রাম্পের নেতৃত্বে মার্কিন প্রশাসন যুদ্ধের জন্য পাগল। মধ্যপ্রাচ্যে তার সঙ্গে আছে ইসরায়েল আর সৌদি আরব। তার কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র কেনার চুক্তি করেছে সৌদি আরব। সেই অস্ত্র দিয়ে সৌদি রাজতন্ত্র প্রতিদিন মারছে ইয়েমেনের মানুষ। আর এদিকে নাগরিকত্ব দিয়েছে কৃত্রিম সোফিয়াকে। ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জেরুজালেমে ইসরায়েলের রাজধানী প্রতিষ্ঠায় প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ভূমিকা নিয়ে মার্কিন প্রশাসন পুরো এলাকায় সহিংসতা উসকে দিয়েছে, শান্তি প্রতিষ্ঠার সব সম্ভাবনার মাথায় কুড়াল মারছে।

সত্য আড়াল করতে বিজ্ঞাপনী প্রচারণার জুড়ি নেই। ধ্বংসকে উন্নয়ন, চোরকে সাধু, সন্ত্রাসীকে সন্ত্রাসবিরোধী, নকলকে আসল—সবই প্রতিষ্ঠা করা যায়, যদি মানুষের চিন্তার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যন্ত্রকে নিয়ে যখন মাতামাতি, তখন দেশে আসল বুদ্ধিমত্তার মানুষেরা তাই গুম, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, দারিদ্র্যে, অপমানে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছেন। প্রযুক্তি শেখানো নিয়ে যখন কুস্তাকুস্তি হচ্ছে, তখন গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্যসহ চিন্তার ভিত্তি নির্মাণ হয় যে শিক্ষায়, তাকে করে ফেলা হচ্ছে ফেলনা। একদিকে পরীক্ষা ও বইয়ের ভারে কাবু শিশুরা, অন্যদিকে প্রশ্ন ফাঁস, কোচিংয়ে নাস্তানাবুদ শিক্ষা।

উচ্চশিক্ষাও অনিয়ম, দুর্নীতি আর বাণিজ্যে কাবু। এর প্রতিবাদ করতে গেলে সাধারণ বহু পুরোনো দাবি পূরণের জন্যও আসল মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। প্রকৌশলী মওদুদ রহমান আর জুরাইনের উদ্যোগী সংগঠক মিজানুর রহমানের তাই আরেক রকম প্রশ্ন, ‘১২ কোটি টাকা দিয়ে আনা “সোফিয়া” দেখতে লাইন আর ১২ দিন ধরে অনশনে থাকা ওয়ালিদ একা বসে আছে।’এটা আশ্চর্যই যে ১৯৯১ সাল থেকে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। প্রতিটি সরকারের সময় সেই সরকারের ছাত্রসংগঠনের রাজত্ব নিশ্চিত করতেই এ ঘটনা। হল দখল, টেন্ডার, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, যৌন হয়রানি তাই ক্রমাগত বেড়েছে। উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান জিম্মি হয়ে থেকেছে ছাত্র-শিক্ষক মাস্তানদের হাতে। গত কয়েক বছরে তা অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। প্রযুক্তির ব্যবহার তো দেখছি। ২০১৫ সালের পয়লা বৈশাখে যৌন হয়রানির সময় সব সিসিটিভি কার্যকর ছিল। কিন্তু কাউকে ধরা বা শাস্তির খবর পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন বহুদিন থেকেই এ অবস্থা পরিবর্তনের জন্য ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করছে। কাজ হয়নি। সন্ত্রাস, দখল, যথেচ্ছাচারে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতায় অস্থির হয়ে অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনশন করেছেন একজন ‘সাধারণ’ শিক্ষার্থী।

এত সহজ দাবি, এত স্বীকৃত অধিকার মেনে নিতে প্রশাসনের বাধা কোথায়? তারা কি এই অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুবিধাভোগী হিসেবেই নিজেদের দেখতে চায়? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি মাস্তান আর মেরুদণ্ডহীনদের দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহলে কী শিক্ষা দেবে এসব প্রতিষ্ঠান? আর নিজেদের সক্ষমতাই-বা কী দাঁড়াবে? বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত কে ধারণ করবে?

আমরা জানি, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির যে বিকাশ হচ্ছে, তাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক সুলভ, নিরাপদ করা সম্ভব। বিদ্যুৎ দরকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য, অর্থনীতিকে গতি দেওয়ার জন্য; দেশকে বিপদগ্রস্ত করার জন্য নয়, মানুষ ও প্রকৃতির অপরিমেয় ক্ষতি করার জন্য নয়। কিন্তু সরকার তার মহাপরিকল্পনা (পিএসএমপি ২০১৬) অনুযায়ী মহাবিপদের উচ্চ ব্যয়বহুল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, সুন্দরবন-বিনাশী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয়বহুল, পরিবেশবিধ্বংসী, ঋণনির্ভর, বিপজ্জনক পথ গ্রহণ করছে। এর বিপরীতে কম দামে পরিবেশবান্ধব উপায়ে নিরাপদ বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পথ শনাক্ত করে গত ২২ জুলাই জাতীয় কমিটি বিকল্প মহাপরিকল্পনার খসড়া প্রকাশ করেছে। কিন্তু সরকার এ ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপারে অনাগ্রহী। আগ্রহী পরিত্যক্ত বিপজ্জনক কয়লা ও পারমাণবিক প্রযুক্তিতে। কারণ, এর সঙ্গে দেশ-বিদেশের অনেকের ব্যবসা জড়িত।

৭ ডিসেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অর্থশাস্ত্র পাঠচক্র বিশ্বায়ন, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে এক বক্তৃতার আয়োজন করেছিল। বক্তা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের (স্প্রিংফিল্ড) ইমেরিটাস প্রফেসর বাকের আহমদ সিদ্দিকী। বর্তমান বিশ্বায়নের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে তিনি দেখালেন, প্রযুক্তির বিকাশের মধ্য দিয়ে দ্রুত একটি অতি-উৎপাদনশীল প্রাচুর্যময় বিশ্বের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশের মধ্য দিয়ে মানুষ এমন সুলভ ও নিরাপদ বিদ্যুতের দিকে যাচ্ছে, যাতে প্রান্তিক ব্যয় শূন্যের কাছাকাছি চলে যাবে। প্রযুক্তির বিকাশে বহু বাজারের পণ্যের জোগান এত বেশি হতে থাকবে যে তার বিনিময়মূল্য হয়ে দাঁড়াবে প্রায় শূন্য।

কিন্তু মানুষের এই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা বন্দী হয়ে আছে একচেটিয়া বাণিজ্যিক স্বার্থের কাছে। তাদের মুনাফা যেখানে নেই বা যে প্রযুক্তির বিকাশে তার মুনাফা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, তাকে সে পেটেন্ট করে আটকে রাখে, নষ্ট করে। প্রযুক্তি নিয়ে যায় ধ্বংস, অপ্রয়োজনীয় ভোগ আর অপচয়ের দিকে। যে প্রযুক্তির বিকাশের মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বের মানুষ নিজেদের ঐক্য ও সংহতি গড়ে তুলতে পারে, তাকে লাগানো হয় মানুষে মানুষে বিবাদ, হিংসা আর বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজে। যে প্রযুক্তি মানুষকে দিতে পারে অপার স্বাধীনতা, তাকে কাজে লাগানো হয় অবিরাম নজরদারি আর মানুষকে শৃঙ্খলিত করার জন্য।

বিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের বুদ্ধিমত্তা, মস্তিষ্কের ক্ষমতার খুব কম অংশই এখন পর্যন্ত কাজে লাগানো হয়েছে। আরও অনেক ক্ষমতা কাজে লাগার অপেক্ষায়। প্রতিটি মানুষই তাই অসীম ক্ষমতাধর। অথচ বিশ্বজুড়ে তাদেরই বিপুল অধিকাংশ দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, যুদ্ধ, নির্যাতন, বঞ্চনা, নিয়ন্ত্রণ আর অপমানের শিকার। আসল বুদ্ধিমত্তার মানুষ গুরুত্ব পেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যন্ত্রসহ সব প্রযুক্তির বিকাশ দুনিয়াকে সত্যিই আনন্দময় করতে সক্ষম হবে। তবে সেই ক্ষমতা কাজে লাগাতে হলে জগৎটা মানুষের হাতে আনতে হবে।

Footer 1

Anu Muhammad
Professor of Economics
Jahangirnagar University

আনু মুহাম্মদ, Anu Muhammad

Footer 2

প্রচ্ছদপ্রবন্ধবই পত্রবক্তৃতাসাক্ষাৎকার • ভিডিও চিত্র | Landing
Email: This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

Developed by AM.Julash