১৯৫৬ সালে মেক্সিকোর বন্দর থেকে রওনা হয়ে কিউবা মুক্ত করার দৃঢ় পণ নিয়ে দেশে প্রবেশ করেছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো এবং তাঁর সহযোদ্ধারা। কিউবায় সিয়েরা মেইস্ত্রা পাহাড় থেকে শুরু হয়েছিল তাঁদের গেরিলা যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয় তিন বছরের মাথায়। ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কিউবা প্রবেশ করে নতুন ইতিহাসে। কিন্তু পাহাড় থেকে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য যে পোশাক নির্ধারণ করেছিলেন ফিদেল, তার আর পরিবর্তন হয়নি। ফিদেল বলেন, ‘যুদ্ধের তো শেষ হয়নি। পোশাক কী করে বদলাই?’ যুদ্ধ করতে করতেই মৃত্যুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন ফিদেল।

বস্তুত কিউবা বিশ্বের সামনে অনেক আগেই নিজের থেকে বহু বহুগুণ বড় হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র এই বিশ্বে যে দানবীয় সাম্রাজ্যবাদের মুখ হিসেবে হাজির, তার এত পরাক্রমকে থোড়াই কেয়ার করে তার নাকের ডগায় শুধু নিজে মানুষের সমাজ গড়ে তোলেনি; একের পর এক পদচিহ্ন রেখে যাচ্ছে। ‘শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা’ ভেঙে লাতিন আমেরিকায় কিউবা অনেক শক্তিশালী সহযাত্রী তৈরি করেছে।

বিপ্লবপূর্ব কিউবা কুখ্যাত ছিল ক্যাসিনো আর জুয়ার দেশ হিসেবে। এ দ্বীপরাষ্ট্রকে পরিণত করা হয়েছিল পশ্চিমা লুটেরা ও অপরাধীদের একটি প্রমোদ কেন্দ্রে। তারা নিজেরাই এ দেশকে অভিহিত করত বেশ্যালয় হিসেবে। কিউবা বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি ছিল কিউবার মানুষকে সম্মান ও মর্যাদা এনে দেবে। সেই বিপ্লবের অব্যাহত বিকাশের মধ্য দিয়ে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য রূপান্তর হতে থাকল মানুষের দেশ হিসেবে।

জনগণের শ্রম ও সম্পদ লুণ্ঠন করে বিদেশীদের পাশাপাশি কিউবান ক্ষুদ্র একটি বিপুল ধনবান গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। মার্কিন-কিউবা অনেকগুলো বড় ব্যবসাই ছিল অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতিতে ভরা। এসব প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করতে থাকে রাষ্ট্র।

বৃহৎ প্লানটেশন জাতীয়করণ করা হয়। এর মধ্যে কাস্ত্রো পরিবারের প্লানটেশনও ছিল। ফিদেলের অনেক আত্মীয় যে এখন মায়ামিতে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী বাহিনীর সহযোগী, তার কারণ বুঝতে গেলে এই জাতীয়করণ পর্বটিকে দেখতে হবে।

বরাবর রাষ্ট্রীয় নীতি ছিল গ্রামীণ জনগণের যত বেশি সম্ভব অংশগ্রহণ এবং তাদের নিজেদের মতামতের ভিত্তিতেই অগ্রসর হওয়া। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে ব্যাপক আলোচনা এবং প্রয়োজনে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত সংশোধন করা হয়। ভূমি মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা ছাড়াও শিক্ষা, চিকিত্সা, আবাসন ও সামাজিক যৌথতার ক্ষেত্রে গ্রামীণ পুনর্গঠনে বিশেষত ক্ষুদ্র কৃষক ও ভূমিহীন মজুর নারী-পুরুষের সর্বোচ্চ মাত্রায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। ফলে কোনো আমলাতন্ত্র বা কোনো চাপিয়ে দেয়ার সংস্কৃতি বা প্রশাসনিক চর্চা কিউবায় প্রথম থেকেই দাঁড়াতে পারেনি।

১৯৬০ সালে প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের নির্দেশ মোতাবেক সে সময় থেকে প্রস্তুতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট কেনেডির সময়ে ১৯৬১ সালের এপ্রিলে শুরু হয় সিআইএ কিউবান প্রতিবিপ্লবী যৌথ সরাসরি হামলা। ১৯৬১ সাল থেকে আরোপিত মার্কিন অবরোধের উদ্দেশ্যই ছিল কিউবাকে বাকি দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে পিষে মেরে ফেলা। এমন পরিণতি নিয়ে আসা, যাতে আর কখনো এ অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে। যাতে কেউ বিপ্লবের স্বপ্ন না দেখে।

তবে শত চেষ্টা সত্ত্বেও মার্কিন এই অবরোধ কখনই আন্তর্জাতিক সমর্থন পায়নি। সবচেয়ে বড় কথা হলো যে, অবরোধ, হামলা, মনস্তাত্ত্বিক চাপ, আতঙ্ক ছড়ানো, অন্তর্ঘাত, হত্যা, হত্যার চক্রান্ত কোনো কিছুই কিউবার মানুষদের ভীত করতে পারেনি, দমাতে পারেনি। তার ফলে একদিকে দেশের অভ্যন্তরে সব মানুষের অসীম শক্তিকে ক্রমাগত সজীব রাখা, জোরদার করা, ঐক্যবদ্ধ রাখা; অন্যদিকে অবরোধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেশের ভেতর এক অসম্ভব পরিবর্তনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা এবং অব্যাহত হুমকির মধ্যে নিজেদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় রাখা। নিজেদের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে সারা দুনিয়ায় জানানো, সব দেশের মানুষের সমর্থন নিশ্চিত করে মোকাবেলা করা এক ভয়ঙ্কর দানবকে।

ফিদেল কাস্ত্রো জীবনে যে কত সাক্ষাত্কার দিয়েছেন, তার হিসাব করা কঠিন। এর মধ্যে বেশির ভাগ সাক্ষাত্কার দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিক ও গবেষকদের। তাঁরা দিনের পর দিন, সপ্তাহ, মাস অপেক্ষা করে সাক্ষাত্কার নিয়েছেন কিন্তু যখন ফিদেল সময় দিতে পেরেছেন তখন প্রতিটি বিষয় ধরে ধরে ব্যাখ্যা করেছেন। এ রকম এক সাক্ষাত্কারে মার্কিন এক অধ্যাপক ও সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন কিউবার একনায়কত্ব নিয়ে। ফিদেল তাঁদের বলেছেন, ‘একনায়ক সে-ই যে নিজে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং তা চাপিয়ে দেয়। এ রকম সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার আছে পোপের। আর আছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের, যে এক আদেশে যেকোনো দেশ দখল ও ধ্বংস করে। এমনকি তার ব্রিফকেসে পৃথিবী ধ্বংস করার কোডও রেখেছেন। এর চেয়ে বড় একনায়ক আর কে হতে পারে?’ তিনি বিশ্বব্যাপী এবং খোদ আমেরিকা মহাদেশে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত গণহত্যা আর বর্বরতার হিসাব দিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের এখানে একা একা কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো উপায় নেই। এখানে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ব্যাপক আলোচনা ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একেবারে তৃণমূল থেকে বহু পর্যায় পার হয়ে সব সিদ্ধান্ত হয়। একক সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো ক্ষমতা আমার নেই।’ বললেন, ‘কিউবার মানুষ দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমালোচক। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত তারা সমালোচনা করে। এবং এর মধ্য দিয়েই আমাদের সবার কাছে সবার পরীক্ষা দিতে হয়।’  

কিউবা বিপ্লব সম্পর্কে ফিদেল বলেন, বিপ্লব নিজেই তো একটা শিল্প। এ শিল্প পুরো লাতিন আমেরিকার আত্মাকে স্পর্শ করেছে, যা ৫০০ বছরের অব্যাহত নিষ্পেষণে ক্ষতবিক্ষত ছিল। এ বিপ্লব পুরো অঞ্চলের শিল্পের ভাষা বদলে দিয়েছে। ষাট, সত্তর, আশি, নব্বইয়ের দশকের বড় বড় লেখক-শিল্পী তাই মানুষের এই যন্ত্রণার মধ্যে নিজেকে স্থাপন করেছেন। কিউবার একজন লেখক যেমন বলেছেন, জনগণের মধ্যে যাওয়া বা জনগণের জন্য লেখা এগুলো কোনো কাজের কথা নয়। লেখক তো নিজেই জনগণ। ভেতর থেকেই তার স্ফুরণ। পাবলো নেরুদা, মার্কুইজ, আলিয়া, ফুয়ন্টেস সবাই তাই জৈবসত্তাতেই এই শিল্প নির্মাণে সহযোগী।   

প্রাণী হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য গান লাগে না; কবিতা, গল্প, সাহিত্য কিংবা ছবি বা চলচ্চিত্র, সুর-ছন্দ কিছুই লাগে না। কিন্তু এগুলোই মানুষের প্রাণ। শুধু খাদ্য খেয়ে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে, বেশি বেশি অর্থ থাকলে বেশি বেশি হূষ্টপুষ্ট হওয়া সম্ভব কিন্তু কবিতা, গান-সুর-তাল, চিত্ররেখার জায়গা না থাকলে তা প্রাণহীন। এগুলো মানুষের ভাবজগৎ, যেখান থেকে মানুষ দেখে, বিচার করে, সৃষ্টি করে, বিশ্লেষণ করে, পথ সন্ধান করে। এগুলোই আসলে মানুষকে মানুষ হিসেবে ভূমিকা পালনে সক্ষম করে তোলে। কিউবা বিপ্লব নিজের দেশে তাই খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য যত মনোযোগ দিয়েছে, তার সঙ্গে মনোযোগ দিয়েছে এসবের প্রতি— শিক্ষা, গবেষণা, শিল্পকলা, সিনেমা, গান ইত্যাদি।

কিউবায় এখনো অনেক সমস্যা আছে। ফিদেল থেকে শুরু করে কিউবার বিপ্লবী নেতারা কখনই আত্মসন্তুষ্টিতে ভোগেননি। তাঁরা যা অর্জন করতে চেয়েছেন, তার তুলনায় কিউবা এখনো পিছিয়ে। অবরোধের চাপে সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নও করা যায়নি। ন্যূনতম সবার জন্য নিশ্চিত করা হলেও খাদ্য নিয়ে হিসাবনিকাশ করতে হয়। বিদ্যুৎ নিয়ে সংযম পালন করতে হয়। কিন্তু কিউবা এগুলো নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে তার সর্বোচ্চ জনসম্পৃক্ততার জন্য। মায়ামি থেকে অবিরাম রেডিও-টিভির মাধ্যমে আর দুনিয়াজুড়ে নানা মাধ্যমে কিউবার বিরুদ্ধে এত প্রচারে কিউবা টালমাটাল হয়ে যায়নি কেন? কারণ কিউবার মধ্যকার সমস্যার যা এসব প্রচারণায় ব্যবহার করা হয়, তার মধ্যে যতটুকু সত্য, ততটুকু কিউবার মানুষ কিউবার প্রশাসনের কাছ থেকেই জানে। যেগুলো মিথ্যা সেটাও তারা ধরতে পারে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় দানবীয় শক্তির ক্রমাগত আক্রমণ ও চক্রান্তের মুখে কিউবার টিকে থাকাই এক বিস্ময়। কিউবা শুধু টিকে থাকেনি, পরিবেশসম্মত কৃষি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বে মডেল হয়েছে। সব নাগরিকের জন্য খাদ্য, বাসস্থান, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও চিকিত্সা নিশ্চিত করেছে। বর্ণবাদী, যৌনবাদীসহ বৈষম্য ও নিপীড়নের গোড়ায় আঘাত করেছে কিউবা। চিকিত্সা প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় কিউবা এখন বিশ্বের এক নম্বর দেশ। এই জ্ঞান ও সেবা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে কিউবার প্রায় ৭০ হাজার চিকিত্সক বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। কিউবায় শিক্ষা, চিকিত্সা জনগণের অধিকার হিসেবে সর্বাধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত, এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর এর মাধ্যমে কিউবা এই দুই ক্ষেত্রে এখন মহাসম্পদশালী যুক্তরাষ্ট্র থেকেও এগিয়ে।

কিউবার ব্যবস্থার প্রধান শক্তি হলো, রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের অবিচ্ছিন্নতা, এর কোনো কিছুই জনগণের কাছে আড়াল নেই (বাজারমুখী সংস্কারে নানা দেয়াল উঠছে এখন)। যেকোনো ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের সমস্যা— সেটা খোলাখুলি আলোচনায় আনার ফলে, তথ্য সব জনগণের সামনে সুলভ করার ফলে মানুষ জানে কোন সমস্যা কেন হচ্ছে। সব নীতিনির্ধারণে তাদের ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব ইউরোপ, চীন থেকে এ পরিস্থিতি একদমই আলাদা।

কমান্ড, নির্দেশ, চাপ, আইন, ভয় এগুলো দিয়ে কোনো বিপ্লবী ব্যবস্থা টিকতে পারে না। কিউবা সবাইকে নিয়ে সম্মিলিতভাবে শুধু নিজেদের জন্য নয়, দুনিয়ার সামনে মানুষের সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজ করে গেছে। আর এই যাত্রায় ফিদেল এক জীবনে ধারণ করেছেন বিশ্বের অসংখ্য জীবনের স্বপ্ন, তার বাস্তবায়নে শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করেছেন। এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।
(01 ডিসেম্বর 2016 তারিখে দৈনিক বণিক বার্তায় প্রকাশিত)