২৬ নভেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সুন্দরবন রক্ষার মহাসমাবেশে হাজির হয়েছিলেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ। রামপাল প্রকল্পসহ সুন্দরবনবিনাশী সব অপতৎপরতা বন্ধ এবং জাতীয় কমিটির ৭ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ কর্মসূচি শুরু হয়েছে এর আগে ২৪ নভেম্বর। ওই দিন দেশের সাতটি প্রান্ত থেকে জনযাত্রা শুরু হয়েছিল। সরকার যদি যুক্তি-তথ্য, জনস্বার্থ, জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট হুমকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের করণীয়, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, মানুষের স্বার্থ, দেশের অস্তিত্ব বিষয়ে গুরুত্ব দিত, তাহলে এত বছর ধরে এই আন্দোলন করতে হতো না।
রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং তার অনুসরণে শতাধিক বাণিজ্যিক বনগ্রাসী-ভূমিগ্রাসী প্রকল্প ঘিরে ফেলেছে সুন্দরবন। বাংলাদেশ অংশে ৩৫ লাখ মানুষের জীবিকা, উপকূলীয় অঞ্চলের পাঁচ কোটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, বাঘ, হরিণ, মৌমাছি, ডলফিনসহ অসংখ্য প্রাণের বসতি, প্রাণবৈচিত্র্যের অতুলনীয় সম্ভার এই সুন্দরবনকে বিপুল মুনাফার লোভে গ্রাস করতে চায় দেশ-বিদেশের লুটেরা গোষ্ঠী। এদের কারণে বিশ্ব ঐতিহ্য, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর সুন্দরবন এখন মহাবিপদের মুখে। যেহেতু সুন্দরবন বাংলাদেশের অস্তিত্বের অংশ, সেহেতু বাংলাদেশের মানুষ কোনোভাবেই এর বিনাশ মেনে নিতে পারে না।
বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীন বিশেষজ্ঞেরা রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প যে সুন্দরবন বিনাশের কারণ হবে, সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট মত দিয়ে এই প্রকল্প বাতিলের সুপারিশ করেছেন। কীভাবে সুন্দরবনের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত কয়লা পরিবহনে পানি বিষাক্ত হবে, কীভাবে কয়লা পোড়ানোতে বায়ু দূষিত হবে, কীভাবে নদীর পানি ব্যবহারে জলজ প্রাণ বিনষ্ট হবে, কীভাবে ফ্লাই অ্যাশসহ বিভিন্ন দূষিত উপাদানে মাটি দীর্ঘস্থায়ী দূষণের শিকার হবে, কীভাবে ‘ক্ষতি হবে না’ মর্মে কোম্পানির দাবি ভুল ও প্রতারণামূলক—এসব বিষয়ে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ বিস্তারিত বলেছেন। একই কারণে পরপর কয়েকটি সতর্কবার্তা দেওয়ার পর ইউনেসকো তার চূড়ান্ত প্রতিবেদনেও একই মত প্রকাশ করেছে। সরকারি দেনদরবার ও অনুরোধ-উপরোধে তাদের অবস্থানের পরিবর্তন হয়নি।
সুন্দরবনের ভয়াবহ এই সর্বনাশে ক্ষতি শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র মানবজাতির। কেননা, সুন্দরবন বিশ্ব প্রাণবৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষার অন্যতম শক্তি। জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের ঝুঁকি মোকাবিলায় সুন্দরবন প্রধান অবলম্বন। সে জন্য বাংলাদেশে ও বিশ্বের দেশে দেশে এই প্রকল্প বাতিলের দাবিতে স্বতঃস্ফূর্ত সভা-সমাবেশ-মিছিল-গবেষণা-তৎপরতা অভূতপূর্ব হারে বিস্তৃত হচ্ছে। তরুণদের মধ্য থেকে নিজেদের উদ্যোগে–শ্রমে তৈরি হচ্ছে তথ্যচিত্র, অ্যানিমেশন, প্রকাশনা। এ ছাড়া নতুন গান, নতুন নাটকসহ সৃজনশীলতার জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে সুন্দরবন বাঁচানোর তাগিদে।
আমরা জনগণের শক্তি, বৈজ্ঞানিক তথ্য-যুক্তি, সুন্দরবন ও দেশের প্রতি সর্বজনের দায় সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর ভর করে সুন্দরবন তথা দেশরক্ষার এই আন্দোলন পরিচালনা করছি। কিন্তু সরকার সব যুক্তি অগ্রাহ্য করে, দেশ ও মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উপেক্ষা করে দেশি-বিদেশি মুনাফালোভীদের স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। নৈতিকভাবে পরাজিত হয়ে সরকার ভয়ভীতি, হুমকি ও দমনপীড়নের পথ ধরেছে।
সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলনের ওপর অব্যাহত দমন–পীড়ন ও হুমকির মুখে ১৭ নভেম্বর তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির একটি প্রতিনিধিদল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বাংলাদেশের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সুন্দরবন আন্দোলনে গত কয়েক মাসে সরকারি দমন–পীড়ন সম্পর্কে কমিশনকে অবহিত করে এবং গত কয়েক মাসে সুন্দরবন আন্দোলনে নিপীড়ন, হামলা ও হুমকির তালিকাও কমিশনের কাছে হস্তান্তর করে। এই তালিকায় পুলিশ, ছাত্রলীগ কর্তৃক হামলা ও নির্যাতনের অনেক বিবরণ আছে। বিভিন্ন সভা, জমায়েত, আলোচনা সভা, সেমিনারে বাধা দেওয়া ছাড়াও সুন্দরবন আন্দোলন অব্যাহত রাখলে হত্যার হুমকি ইত্যাদির সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর প্রদত্ত কমিটির লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, ‘আমরা কয়েক বছর ধরে সুন্দরবনসহ জাতীয় সম্পদ রক্ষার জন্য আন্দোলন করে আসছি। আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে সরকারি দল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে হামলা ও নির্যাতন করা হচ্ছে, মত প্রকাশে বাধা দেওয়া হচ্ছে, বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ছড়িয়ে কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। আগামী দিনগুলিতে দেশের স্বার্থে সুন্দরবন রক্ষায় আমরা যেন শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের মত প্রকাশ করতে পারি, বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারি, সে ব্যাপারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সার্বিক সহযোগিতা ও সমর্থন কামনা করছি।’
২২ নভেম্বর জাতীয় কমিটির সংবাদ সম্মেলনেও সরকারকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, ‘বিজ্ঞাপনী মিথ্যাচার, হামলা, হুমকি ও নিপীড়নের তৎপরতা বন্ধ করুন, রামপাল রূপপুর, বাঁশখালী নয়, জাতীয় কমিটির ৭ দফাই বিদ্যুৎ–সংকটের সমাধান এবং টেকসই উন্নয়নের পথ দেখাতে পারে।’ উল্লেখ্য, এই ৭ দফার কেন্দ্রীয় বিষয় হলো, সর্বজনের সম্পদের ওপর সর্বজনের মালিকানা প্রতিষ্ঠার দাবি, প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশকে বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ এবং দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে দেশের স্বার্থে পুনর্বিন্যস্ত করার দাবি। এই ৭ দফা দাবির মধ্যে আছে: দেশের সম্পদের ওপর শতভাগ জাতীয় মালিকানা ও কর্তৃত্ব, জাতীয় সক্ষমতার বিকাশে প্রধান গুরুত্ব প্রদান, খনিজ সম্পদ রপ্তানি নিষিদ্ধ করে শতভাগ সম্পদ দেশের শিল্পায়ন ও বিদ্যুতায়নে কাজে লাগানো, দায়মুক্তি আইন বাতিল করে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, সৌর-বায়ু-বর্জ্যসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন নীতি ও কর্মসূচিকে মূলধারায় নিয়ে আসা, জাতীয় স্বার্থবিরোধী জনধ্বংসী প্রকল্প ও চুক্তির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদি।
আমরা ‘উন্নয়নের’ নামে প্রাণ ও দেশবিনাশী প্রকল্পের বদলে জনস্বার্থভিত্তিক প্রকল্প; জাতীয় সক্ষমতা বিনাশের বদলে তার বিকাশের; দেশকে ঋণ, দুর্নীতি ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ঠেলে দেওয়ার বদলে টেকসই উন্নয়নের কথা বলি। এই দেশের মালিক এ দেশের মানুষ। তাদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন করে যেসব প্রকল্প, সেগুলোকে আমরা কোনোভাবেই উন্নয়ন প্রকল্প বলতে পারি না। আমরা এ দেশকে অন্য কোনো দেশ তা ভারত, চীন, রাশিয়া বা যুক্তরাষ্ট্র যে-ই হোক না কেন, তাদের পরিত্যক্ত আবর্জনার স্তূপে পরিণত করতে দিতে পারি না, তাদের এবং দেশি লুটেরা দখলদার গোষ্ঠীর স্বার্থে এই দেশকে বিপন্নতার দিকে ঠেলে দেওয়ার মুখে কোনো সুস্থ বোধসম্পন্ন মানুষ নীরব থাকতে পারেন না।
সে জন্যই আমরা বলি, মহাপ্রাণ সুন্দরবন বাংলাদেশকে রক্ষা করে। অতএব, সুন্দরবনকে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব, সর্বজনের অবশ্যকর্তব্য। রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের সঙ্গে অন্যান্য বনগ্রাসী প্রকল্প ও অপতৎপরতা বন্ধের জন্য ‘সুন্দরবন নীতিমালা’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন আমাদের অন্যতম দাবি।
সর্বজনের স্বার্থে ক্রমবিকশিত এই কর্মসূচিতে দেশের সব পর্যায়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দিনে দিনে বাড়ছে। এই সমর্থনকে সক্রিয়তায় পরিণত করেই আমাদের সুন্দরবন ও দেশকে রক্ষা করতে হবে। কেননা, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প আছে, সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই। তাই সুন্দরবন আন্দোলনে বিজয়ী হওয়ারও কোনো বিকল্প নেই। সর্বজনের স্বার্থেই সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে।
(28 নভেম্বর 2016 তারিখে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত)