downloadআলোকিত বাংলাদেশ: ব্রিটেন সম্প্রতি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এর অর্থনৈতিক কারণ কী কী?

আনু মুহাম্মদ: ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। ব্রিটেন এক সময় বিশ্বের ‘এক নম্বর শক্তি’ ছিল। ব্রিটেনের প্রভাব কমতে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্নভাবে বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রে চলে আসে এবং ‘এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তি’তে পরিণত হয়। সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি উপনিবেশ ছিল ব্রিটেনের। সে উপনিবেশগুলোকে ভিত্তি করেই ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লব হয় এবং অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। উপনিবেশ হারানোর পর তার যে দুর্বলতা এবং এর সঙ্গে যোগ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার ক্ষয়ক্ষতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি উদীয়মান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পরিবর্তিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এ অবস্থায় যুক্তরাজ্য যেটা করল তা হলো তার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক যোগসূত্রটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই স্থাপিত হলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করেই যুক্তরাজ্য তার হৃত রাজনৈতিক সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়া বা বিশ্ব অর্থনীতিতে টিকে থাকার জন্য চেষ্টা চালাতে থাকে। কিন্তু পরবর্তী বিশ্ব ইতিহাস সম্পূর্ণ অন্যরকম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে। ব্রিটেন এ অবস্থায় সর্বক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লেজুড়বৃত্তি করতে থাকে। অন্যদিকে ইউরোপের অন্যান্য দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করে একটি নিজস্ব শক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করতে থাকে। যুক্তরাজ্য সব সময় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের একটি অনিচ্ছুক অংশীদার ছিল। ব্রিটেন কখনোই খুব আগ্রহ নিয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিল না।

একটু লক্ষ করলে দেখবেন, ভারতে যুক্তরাজ্যের যে পরিমাণ বিনিয়োগ তার চেয়ে যুক্তরাজ্যে ভারতীয়দের বিনিয়োগ অনেক বেশি। বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছে যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগকারীরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। এটা ব্রিটেনের অধিবাসীদের এক ধরনের হীনমন্যতায় ফেলে দিয়েছে। ব্রিটেনের অধিবাসীরা মনে করছিলেন যে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। তারা আরও মনে করছিল যে, ব্রিটেন স্বাধীনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছে না। ব্রিটেন নিজেদের অনেকটাই বঞ্চিত বলে মনে করছে। এ বঞ্চিত হওয়ার বোধটাই ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। ব্রিটেন যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে পুরোপুরি প্রবেশ করেনি তার বড় প্রমাণ হচ্ছে ২০০০ সালে যখন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন একক মুদ্রা ইউরো চালু করল তখনও ব্রিটেন তার মুদ্রা পাউন্ড চালু রাখে। বাণিজ্য ক্ষেত্রেও তারা নিজেদের কিছুটা হলেও পৃথক করে রাখার চেষ্টা করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ব্রিটেনের দৃষ্টি ছিল সব সময়ই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে আমরা দেখি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা করে ব্রিটেন তার পেছনে পেছনে চলে। এটাই তাদের নীতি হয়ে দাঁড়ায়। এর মাধ্যমেই যুক্তরাজ্য নিজেকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। এভাবেই তারা বিশ্বের দুই নম্বর শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করেছে; কিন্তু এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বরং এতে তার ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে যুক্তরাজ্য এক সময় বড় ধরনের জটিলতায় পতিত হবে। আগামীতে ব্রিটেনকে তো ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য করতেই হবে। বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে বিবেচনায় রেখে তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করেছে। বিনিয়োগ করেছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে যারা ব্রিটেনের রাইজিং ওয়ার্ক ফোর্স তারা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে ইউনিয়নভুক্ত অন্যান্য দেশেও কর্মসংস্থান করতে পেরেছে। ব্রিটেনের রাইজিং ওয়ার্ক ফোর্সের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রটা সীমিত হয়ে যাবে। তারা চাইলেই অন্যান্য দেশে গিয়ে কর্মসংস্থান করতে পারবে না। আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন, ব্রিটেনের রাইজিং ওয়ার্ক ফোর্স ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ছিল। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ব্রিটেনকে জটিলতায় পড়তে হবে। আগে তারা যত সহজে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে বিনিয়োগ করতে পারত, এখন তা পারবে না। প্রতিটি দেশের সঙ্গে নতুন করে দরকষাকষি করতে হবে। এ দরকষাকষির ক্ষমতা ব্রিটেনের কতটা থাকবে তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের যেরকম বার্গেনিং ক্যাপাসিটি ছিল একক দেশ হিসেবে ব্রিটেনের নিশ্চয়ই তা থাকবে না। বাইরের কোনো দেশকে যদি এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন নাকি যুক্তরাজ্য তা হলে সঙ্গত কারণেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পাল্লাটাই ভারি হবে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ব্রিটেনের অবস্থান কেমন হবে সেটাই প্রশ্ন বটে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে বাদ দিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে চাইবে না। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেন বেরিয়ে যাওয়ার কারণ ইউনিয়নের মধ্যে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে শুকাবে বলে মনে হয় না। কারণ ব্রেক্সিটের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নবিরোধী এত প্রচারণা চালানো হয়েছে যে, তা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের জন্য ছিল অত্যন্ত বিব্রতকর। কাজেই আগামীতে যুক্তরাজ্যকে তারা কোনো ধরনের ছাড় দেবে না।

আলোকিত বাংলাদেশ: ব্রিটেনের এ সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কেমন প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

আনু মুহাম্মদ: ব্রিটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাড়তি সমস্যা সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন হচ্ছে একটি বড় বাজার। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বাংলাদেশের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জিএসপি সুবিধা প্রদান করে থাকে। ব্রিটেন আগামীতে বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা দেবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এছাড়া আগে আমাদের ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি করলেই চলত। এখন ব্রিটেনের সঙ্গে আলাদাভাবে চুক্তি করতে হবে। ব্রিটেন একই ধরনের সুবিধার আওতায় চুক্তি করবে কিনা সেটা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশী প্রবাসীরা সবচেয়ে বেশি। তারা আগামীতে অভিবাসীদের প্রতি কেমন আচরণ করে সেটাও দেখার বিষয়। রেমিট্যান্স এবং মাইগ্রেশনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার পর ব্রিটেনে বর্ণবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। বেকারত্ব বৃদ্ধি পেলেও বর্ণবাদও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সামনে আরও ঘটনা ঘটতে পারে। স্কটল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ড যদি ব্রিটেন থেকে বেরিয়ে যায় তাহলে ব্রিটেনের গুরুত্ব আরও কমে যাবে। ব্রিটেন যেহেতু বাংলাদেশের একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক অংশীদার, তাই তারা বিপাকে পতিত হলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে বাধ্য।

আলোকিত বাংলাদেশ: বাংলাদেশে সম্প্রতি কিছু মারাত্মক জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এটা কি আগামীতে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আহরণের ক্ষেত্রে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

আনু মুহাম্মদ: জঙ্গি হামলার তো নানা ডাইমেনশন আছে। সরকারি ভাষ্যে যেভাবে বলা হচ্ছে তা আমরা কতটা গ্রহণ করতে পারি সেটাও বলা মুশকিল। তবে সাধারণভাবে দেখলে, জঙ্গি হামলার ঘটনা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের একটি সঙ্কট। তবে জঙ্গি সমস্যা বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়। বিশ্বব্যাপীই কোনো না কোনোভাবে জঙ্গি সমস্যা বিরাজ করছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটি একটু ভিন্ন ধরনের। গুলশানে বা তারও আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, মূলত জাপান, ইতালি ইত্যাদি দেশের নাগরিকদের টার্গেট করে হামলা চালানো হয়েছে। জাপান এবং ইতালির মতো দেশ বাংলাদেশে প্রচুর বিনিয়োগ আছে। জাপান ও ইতালীয় নাগরিকের ওপর হামলা হওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে। জাপান বা ইতালির নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চাইবে না। এতে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা হতে পারে। তবে এটাও ঠিক যে, বিনিয়োগ যদি লাভজনক হয় তাহলে তারা কিছুটা ঝুঁকি নিয়েও বিনিয়োগ করতে চাইবে। সে হিসেবে বিনিয়োগ হয়তো সেভাবে কমবে না, তবে শ্লথ গতি তৈরি হতে পারে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশিরা হয়তো বাংলাদেশকে নতুন নতুন শর্ত দিতে পারে।

আলোকিত বাংলাদেশ: রামপাল বিদ্যুৎ প্লান্ট প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন আগে সংবাদ সম্মেলন করলেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে আপনাদের বর্তমান অবস্থান কী?

আনু মুহাম্মদ: রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রশ্নে আমাদের অবস্থান পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ যেহেতু এটা সুন্দরবনের জীবন-মরণের সমস্যা। সুন্দরবন আমাদের জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন। সুন্দরবনকে আবর্তন করে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে। সুন্দরবনের সঙ্গে প্রায় ৪ কোটি মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি যুক্ত। যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সুন্দরবন আমাদের রক্ষা করে। সুন্দরবন দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক দান। সুন্দরবনের ইকো-সিস্টেম নষ্ট হলে সারা দেশেরই প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় সুন্দরবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই সুন্দরবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশকেই অরক্ষিত করে ফেলা। কাজেই সুন্দরবনের প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দেয়ার প্রশ্নই আসে না। সরকার বলছে, তারা সব ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলা করেই রামপাল বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপন করবে। কিন্তু আমরা এ প্রতিশ্রুতিতে আস্থা স্থাপন করতে পারছি না। এছাড়া প্রকল্পটি যেভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এ প্রকল্পে বাংলাদেশের লাভের কিছু নেই। বাংলাদেশের পুরোটাই হচ্ছে ক্ষতি। যে প্রকল্প করা হয়েছে তার মোট ব্যয়ের ১৫ শতাংশ নির্বাহ করবে বাংলাদেশ এবং ১৫ শতাংশ জোগান দেবে ভারত। এছাড়া ৭০ শতাংশ ব্যয় নির্বাহ করা হবে ভারতীয় ঋণে। এ ঋণের সার্বভৌম গ্যারান্টার হচ্ছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ এই ঋণ পরিশোধে কোনো ধরনের সমস্যা হলে তার দায় বর্তাবে বাংলাদেশের ওপর। এ প্রকল্প থেকে যে লাভ হবে কাগজপত্রে বলা হচ্ছে তার ৫০ শতাংশ বাংলাদেশ পাবে এবং অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ পাবে ভারত। কিন্তু বাস্তব অবস্থা তার চেয়ে অনেক খারাপ। কারণ আমরা যদি দেখি তাহলে বুঝতে পারব, প্রকল্পের ম্যানেজমেন্ট এবং সব কিছুর মালিক এলটিডিসি’র হাতে। এখানে যে কনস্ট্রাকশন হবে তা থেকে যে লাভ হবে তা পাবে ভারতীয় একটি কোম্পানি। এ প্রকল্পে যে ঋণ দেয়া হবে তার যে মুনাফা হবে তা পাবে ভারত। এখানে যে কয়লা সাপ্লাই হবে তা আসবে ভারত থেকে। অর্থাৎ এ প্রকল্প থেকে ভারতীয় বিভিন্ন কোম্পানি ব্যাপকভাবে লাভবান হবে। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার তা হবে বাংলাদেশের। বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা নষ্ট হবে। পরিবেশ দূষিত হবে। বাংলাদেশ তার বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে হারাবে।

আলোকিত বাংলাদেশ: আপনাদের আন্দোলনের কারণে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে মানুষের মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাপকভিত্তিক গণসচেতনতা তৈরি হয়েছে। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এ ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করতে চাচ্ছে। কিন্তু আপনারা বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে যেতে চাচ্ছেন না। এর কারণ কী?

আনু মুহাম্মদ: মানুষের মাঝে রামপাল ইস্যু নিয়ে যে স্বতঃস্ফূর্ততা দেখছি, এটাই আমাদের শক্তির জায়গা। এটি একটি ভালো বার্তা দেয় যে, বাংলাদেশের মানুষের কাছে যদি তথ্য পৌঁছানো যায় তাহলে তারা যথেষ্ট সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন করে থাকে। এ বিপুল জনসমর্থন যদি সক্রিয় প্রতিবাদে পরিণত হয়, তা হলে সুন্দরবন রক্ষা করা সম্ভব। আমরা দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনে শরিক হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছি। আমরা প্রায় ৬ বছর ধরে এ আন্দোলন করে আসছি। আরও কেউ যদি এ ইস্যুতে আন্দোলন করতে চায়, তা হলে তারা তা করতে পারেন। কিন্তু বিএনপির সঙ্গে আমাদের কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব নয় এই কারণে যে, এ ধরনের জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বিএনপির অতীত রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়। তারা জাতীয় স্বার্থবিরোধী অনেক চুক্তি করেছে। ফুলবাড়ীতে আন্দোলনরত জনতার ওপর তারা গুলি চালিয়েছিল। ফুলবাড়ী আন্দোলনের সময় আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্য করতে পারিনি, যদিও সে সময় আওয়ামী লীগ আমাদের আন্দোলন সমর্থন করেছে। ঠিক একই কারণে বিএনপি এখন রামপাল ইস্যুতে সমর্থন দিলেও তাদের সঙ্গে আমরা ঐক্য করতে পারি না। আমরা চাই রামপাল ইস্যুতে জাতীয়ভাবে একটি জাগরণ তৈরি হোক। সবাই তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে এতে অংশ নিক। বিএনপি ইচ্ছে করলে তার অবস্থান থেকে আন্দোলন করতে পারে। আমাদের কাছে যে রিপোর্ট আছে তাতে আমরা জানতে পেরেছি, আওয়ামী লীগের মধ্যেও অনেকেই আছেন যারা রামপাল ইস্যুতে সরকারি অবস্থান সমর্থন করেন না। কাজেই আমরা মনে করি, রামপাল ইস্যুতে জাতীয় ঐক্য এরই মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। এ জাতীয় ঐক্য আরও শক্তিশালী করে তাকে কাজে লাগিয়ে সুন্দরবন রক্ষা করতে হবে।

আলোকিত বাংলাদেশ: চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কতটা সম্ভব বলে মনে করেন?

আনু মুহাম্মদ: বিনিয়োগের তো অনেক ধরন আছে। কত ধরনের বিনিয়োগ হতে পারে। বাংলাদেশে এখন বিনিয়োগের অনেক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। কিন্তু সব বিনিয়োগই তো আর অর্থকরী হয় না। কোনো কোনো বিনিয়োগ আছে যা হয়তো দেশের সম্পদ বৃদ্ধি করে; কিন্তু এ জন্য দেশকে প্রচুর খেসারত দিতে হয়। এ ধরনের বিনিয়োগ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি আসলে টেকসই হয় না। আমাদের পরিবেশসম্মত বিনিয়োগকেই প্রাধান্য দিতে হবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা খুব একটা বাস্তবায়নযোগ্য বলে মনে হয় না। বিনিয়োগ যদি দেশের জন্য ক্ষতিকর হয় তাহলে সে ধরনের বিনিয়োগ কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

[১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬, আলোকিত বাংলাদেশে প্রকাশিত]