আজ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপিত হচ্ছে। বাজেটের সময় হয়েছে—তা জনগণ বুঝতে পারে তাদের প্রাত্যহিক জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। বাজেটের সময় ঘনিয়ে এলেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ার খবর আসতে থাকে, নতুন নতুন করের খবরে এই দাম বাড়ে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বাজেট শেষ করার তাড়াহুড়ায় অপচয় হয়, বাজার চাঙা হয়। অর্থবছরের শেষ মাস জুন থাকায় এই সময়ে বৃষ্টি হয়, খানাখন্দে ভরা শহরে পানি জমে, তাড়াহুড়া করে সব প্রকল্প শেষ করতে অপচয় ও দুর্নীতির মহোৎসব শুরু হয় চারদিকে। জুনের মধ্যে বিল তোলার তাড়ায় খোঁড়াখুঁড়ি ভয়ংকর আকার ধারণ করে। অতিষ্ঠ মানুষের জীবন আরও বিপর্যস্ত হয়।
পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়াসহ হাতে গোনা কয়েকটি দেশ জুলাই-জুন অর্থবছর ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, চীন, ভারত, ইরান, যুক্তরাজ্য, নেপালসহ বাকি সবাই নিজ দেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন অর্থবছর নির্ধারণ করেছে। আগেও বলেছি, এখনো বলি, বাংলাদেশের অর্থবছর জুলাই-জুন রাখার কোনো যুক্তি নেই, এটি অবিলম্বে বদলানো দরকার। বাংলাদেশের জন্য অর্থবছর হতে পারে জানুয়ারি-ডিসেম্বর অথবা বৈশাখ-চৈত্র ধরে এপ্রিল-মার্চ। অর্থবছর বদলালেই অর্থনীতি বদলাবে না তা ঠিক, কিন্তু তা যৌক্তিক হবে, অপচয়–দুর্নীতির সুযোগ কিছু কমবে, মানুষের ভোগান্তিও কিছু কমবে।

যাহোক, এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে প্রতিবছরের মতো এই অর্থবছরেও আগের বছরের তুলনায় বাজেটের আকার বাড়বে। অনেক খাতেই বরাদ্দ বৃদ্ধি পাবে। বয়স বাড়ার মতোই অর্থনীতির আকার বাড়ছে, সুতরাং বাজেটের অঙ্কও বাড়বে এটা স্বাভাবিক। তাই আগের বছরের তুলনায় বড় বলে বাজেট যেমন বিরাট সাফল্যের স্মারক নয়, তেমনি তাকে অস্বাভাবিক বা উচ্চাভিলাষী বলার কিছু নেই। সরকারি দলিলপত্রে অর্থনীতির আকার যতটুকু দেখানো হয়, বাস্তবে অর্থনীতি আরও বড়। কেননা, দেশে হিসাববহির্ভূত অর্থনৈতিক তৎপরতা বহুবিধ। গৃহশ্রম, শিশুশ্রম, মজুরিবিহীন শ্রম থেকে অর্থনীতিতে যা যোগ হয় তা হিসাবের আওতায় আনার জন্য জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো সবাই সচেষ্ট আছে। কিন্তু দেশের অদৃশ্য, গোপন বা ‘কালো’ নামে অভিহিত, যার বড় অংশ আসলে চোরাই অর্থনীতি, হিসাবের আওতার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। এই অর্থনীতির সঙ্গে ক্ষমতাবান লোকজন জড়িত বলে তার মুখোশ সরানো কঠিন। এসব তৎপরতা যত হিসাবের মধ্যে আসবে, তত অর্থনীতির প্রকৃত চেহারা স্পষ্ট হবে। আসলে প্রশ্নটা বাজেটের আকার নিয়ে যতটা না, তার থেকে বেশি হওয়া উচিত তার গতি–প্রকৃতি নিয়ে। শুধু বরাদ্দের দিকে নয়, নজর দেওয়া দরকার তার গুণগত মানের দিকে।

এর মধ্যে মাথাপিছু আয় নিম্নমধ্যম আয়ের কাতারে নিয়ে গেছে বাংলাদেশকে। কয়েক বছর ধরেই অনেকগুলো অনুকূল উপাদান অর্থনীতির পরিমাণগত বিকাশে সহায়তা করেছে। এগুলোর মধ্যে কয়েক বছর ধরে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক দাম কম থাকা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়া অন্যতম। শেষ বছরেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ভালো ছিল, প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি শতকরা ১০ ভাগের ওপরে ছিল। প্রবাসী আয়প্রবাহ অব্যাহত থাকায় এখন বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। কৃষিজমি কমলেও উৎপাদন বেড়েছে। সবার গড় আয় বেড়েছে। তবে তার সুবিধা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কতটা পেয়েছে এবং সামনের বাজেটে পাবে সেটাই এক বড় প্রশ্ন।

বাংলাদেশের অর্থনীতি যাঁদের শ্রমে দাঁড়িয়ে আছে, তাঁরা হলেন প্রধানত কৃষক ও কৃষিশ্রমিক, গার্মেন্টসহ বিভিন্ন কারখানা ও অশিল্প শ্রমিক এবং লক্ষাধিক প্রবাসী শ্রমিক। লক্ষ করলে দেখা যাবে যাঁদের অবদান অর্থনীতিতে বেশি, তাঁরাই রাষ্ট্রের অমনোযোগ ও বৈরিতার শিকার। কৃষকেরা বিশাল উৎপাদন করেও দাম না পাওয়ার অনিশ্চয়তায় দিশাহীন। গার্মেন্ট শ্রমিকদের প্রায়ই দেখা যায় বকেয়া মজুরির জন্য রাস্তায় নামতে, রানা প্লাজা ধসের তিন বছর পরও নিহত-আহত শ্রমিকদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ ও কর্মসংস্থানের নিষ্পত্তি হয়নি। আর প্রবাসী শ্রমিক? হিসাবে দেখা যায়, গত ১৫ বছরে প্রায় ২৫ হাজার লাশ এসেছে দেশে। প্রবাসী শ্রমিক হওয়ার পথে গিয়ে দাসশ্রমে আটকে গেছেন অনেকে, সমুদ্রে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছেন, দেশে ও বিদেশে জালিয়াতদের পাল্লায় পড়ে কতজন সর্বস্বান্ত হয়েছেন, তার হিসাব নেই। এখনো দেশের ভেতর জাতীয় ন্যূনতম মজুরির অভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন কঠিন অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্যের মধ্যে আটকে আছে।

দেশে জিডিপির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিসহ সম্পদের বৃদ্ধি সত্ত্বেও শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে ১৬১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৫৫তম, স্বাস্থ্য খাতে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৯তম। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। জিডিপির এখনো শতকরা ২ ভাগের কম ব্যয় করে বাংলাদেশ। গত দেড় দশকে এই অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। ১০ বছর আগে যেখানে বাজেটের শতকরা ১৫ দশমিক ৯ ভাগ ছিল, চলতি অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ১১ দশমিক ৬ ভাগ। পাশাপাশি প্রাথমিকসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্দশা, শিক্ষকের অভাব, শিক্ষকদের ন্যূনতম বেতন প্রাপ্তির অধিকার অর্জনের জন্য বছরের পর বছর আন্দোলন করতে হচ্ছে। পাসের উচ্চহার শিক্ষার মান নিম্নগামী করেছে।

যাহোক, সর্বজনের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানি, পরিবেশসম্মত জ্বালানি ও নিরবচ্ছিন্ন সুলভ বিদ্যুৎ প্রাপ্তির জন্য জাতীয় সক্ষমতার বিকাশে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকলেও অন্য অনেক ক্ষেত্রে অযৌক্তিক মাত্রায় ব্যয় বৃদ্ধিতে বরাদ্দের অভাব হচ্ছে না। এ বছর অনেকগুলো বৃহৎ প্রকল্প বরাদ্দ আরও বৃহৎ হয়েছে। ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে যে মজুরি ও নির্মাণসামগ্রীর দাম সবচেয়ে নিচের দিকে থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে সেতু ও সড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় বিশ্বে সর্বাধিক। সরকারের খুবই আগ্রহের ফ্লাইওভার নির্মাণেও একই চিত্র। ভারত, চীন, মালয়েশিয়ায় ফ্লাইওভারে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় যেখানে ৪০ থেকে ৬০ কোটি টাকা, বাংলাদেশে সেখানে তা ১৩০ থেকে ৩১৬ কোটি টাকা। গত বছর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন বৃহৎ প্রকল্পে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা।

শুধু তাই নয়, অর্থকরী খাতে নৈরাজ্য, দুর্নীতি, অর্থ পাচার অভাবিত মাত্রা নিয়েছে গত কয়েক বছরেই। শেয়ারবাজার, বেসিক ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ ইত্যাদিতে অপরাধীদের যথাযথভাবে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা বা উদ্যোগহীনতার অভিজ্ঞতার ওপরই অচিন্তনীয় ঘটনা ঘটে বাংলাদেশ ব্যাংকে। দেশি-বিদেশি দুর্বৃত্তরা জাল বিছিয়ে বাংলাদেশকে কীভাবে অরক্ষিত করে ফেলেছে তার সাক্ষাৎ প্রমাণ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ চুরির ঘটনা। দেশের অর্থনীতির কেন্দ্র হিসেবে যে প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে সুরক্ষিত থাকার কথা, সেটি হলো বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে ছিদ্র তৈরি করা হয়েছে তার খবর ফিলিপাইনের পত্রিকায় বের না হলে বাংলাদেশের মানুষ আদৌ জানত কি না সন্দেহ আছে। ফিলিপাইনের পত্রিকায় এই খবর প্রকাশেরও অনেক পরে সরকারের উদ্বেগ দেখা যায়। ঘটনার প্রায় দেড় মাস পরে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়।

বৃহৎ প্রকল্পে ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি, আর্থিক খাত থেকে অভাবনীয় মাত্রায় লুণ্ঠন ও পাচার অব্যাহত থাকার কারণেই সরকারকে আরও বেশি বেশি আয়ের উৎস খুঁজতে হচ্ছে। যেহেতু চোরাই কোটিপতিদের থেকে কর আদায়ে সরকার অনিচ্ছুক বা অপারগ, সেহেতু সহজ পথ জনগণের ঘাড়ে বোঝা চাপানো। সে জন্যই জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়নি, সে জন্যই ভ্যাট অস্ত্র প্রয়োগ করা হচ্ছে বিস্তৃতভাবে। আর তাই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমলেও সামনের বছরে বাংলাদেশের মানুষকে ঘরভাড়া, গাড়িভাড়া, গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বেশি দিতে হবে। জিনিসপত্র কিনতে হবে আরও বেশি দামে।

আমাদের সব সময় মনে রাখা দরকার যে সরকারের কোনো টাকা নেই, দেশের সম্পদ বা অর্থের মালিকও সরকার নয়, এর সবই দেশের নাগরিকদের, সর্বজনের। সরকার শুধু ব্যবস্থাপক মাত্র। বছরের বাজেটের আয় তৈরি হয় জনগণের অর্থ দিয়েই। ঘাটতি তৈরি হলে সেটা মেটানো হয় দেশি-বিদেশি ঋণ দিয়ে। যা আবার জনগণকেই শোধ করতে হয় নানাভাবে। সামনের বাজেটে ঋণের বোঝা অনেক বাড়বে। জনগণ এই ঋণের বোঝা কেন বহন করবে, যদি তা তার জীবনের সমৃদ্ধি না আনে? কেন বাড়তি করের বোঝা গ্রহণ করবে, যদি তা শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত না করে?

জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে উচ্ছ্বাসে অনেক প্রয়োজনীয় বিষয় ঢাকা পড়ে যায়। বাজেট আলোচনায় এবারও জিডিপি প্রবৃদ্ধিই কেন্দ্রে থাকবে হয়তো। কিন্তু এ রকম আলোচনায় এই সত্যটি আড়াল হয় যে শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধির হিসাব দিয়ে প্রকৃত উন্নয়ন ও জনগণের জীবনের গুণগত মান পরিমাপ করা যায় না। সিপিডির বিশ্লেষণে যথার্থই দেখানো হয়েছে যে বর্তমান জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধরন প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিশ্চিত করতে পারছে না। তা ছাড়া এটি কাণ্ডজ্ঞানের বিষয় যে প্রবৃদ্ধিই শেষ কথা নয়, কী কাজ করে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি নষ্ট করে ইটখোলা বা চিংড়িঘের, জলাভূমি ভরাট করে বহুতল ভবন, নদী দখল করে বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসাকে ক্রমান্বয়ে আরও বেশি বেশি বাণিজ্যিকীকরণ, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি দেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলে ও ঋণগ্রস্ত করে রূপপুর বা বাঁশখালী দেশধ্বংসী প্রকল্পসহ বড় বড় প্রকল্প—এর সবই জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে।

কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এগুলো জনগণের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন করে। এগুলো আবার চোরাই টাকার আয়তনও বাড়ায়। দখলদারি অর্থনীতি, আতঙ্কের সমাজ, আর সন্ত্রাসের রাজনীতি সবই পুষ্ট হয় উন্নয়নের এই ধারায়।

[লেখাটি ২ জুন ২০১৬ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত]