db68d6bd8ccf1c49865af26a083221fbপ্রশ্নপত্র ফাঁস এখন একটি নিয়মিত খবর৷ স্কুল-কলেজের পরীক্ষা ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনী পরীক্ষা, এমনকি বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রশ্ন আগাম সরবরাহে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্যের খবর পাওয়া যায়৷ খবরাখবর বেশি প্রচারিত হলে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়৷ সেই তদন্ত কমিটি যথারীতি কাজ করার সময় পায় না অথবা কিছুই খুঁজে পায় না৷ অপরাধ অব্যাহত থাকে৷ এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে মুহম্মদ জাফর ইকবাল গত কিছুদিনে চারটি লেখা লিখেছেন৷ তাঁর সেই লেখাগুলো একসঙ্গে ৮-১০টি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে৷ তিনি তাঁর লেখাগুলোয় তথ্য–প্রমাণসহ দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রশ্নপত্রের শতভাগ আগেই ফাঁস হয়েছে৷ তার পরও শিক্ষামন্ত্রী পরিস্থিতির ভয়াবহতায় পুরোপুরি সায় দেননি৷ একটা কথা স্বীকার করেছেন, পরীক্ষা বাতিল হয়েছে, তদন্ত কমিটি হয়েছে৷ অন্যগুলোর বিষয়ে তিনি এর আগে যারা ‘ফাঁসের গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার’ কথা বলেছিলেন৷ এক শিক্ষার্থী উপায়ান্তর না দেখে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করতে গিয়েছিল থানায়৷ পাশাপাশি নিয়োগ-বাণিজ্য বা টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক নিয়োগ এখন সবার জানা গোপন বিষয়৷ ভর্তিও৷
শিক্ষামন্ত্রী কয়েক বছর ধরেই শিক্ষােক্ষত্রে সরকারের সাফল্যের দাবি করে আসছেন৷ সাফল্যের দাবির দুটি দিক প্রধান: ১. পাসের হার এবং ২. জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা৷ এটি ঠিক যে পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে৷ বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যথাযথ শিক্ষার পরিবেশ পেলে নিজ যোগ্যতায় যে অনেক দূর যেতে পারে, তার প্রমাণ বহুভাবেই পাই৷ এই দেশের অভিভাবকেরা, এমনকি যাঁদের সহায়সম্বল নেই, তাঁরাও নিজ সন্তানের শিক্ষার জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত৷ কিন্তু বর্তমান সাফল্য যতটা সংখ্যা বৃদ্ধি, ততটা কি টেকসই বা মানসম্মত?

এ প্রশ্নের পেছনের কারণ সবাই জানেন৷ স্কুল-কলেজ মানে এখন ক্লাসরুমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নয়, অধিক প্রভাব বিস্তার করে শিক্ষার সকল পর্যায় এখন ঘেরাও করে আছে প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং সেন্টার ও গাইড বই৷ এই জগতে প্রতিযোগিতাও অনেক৷ যে তার ক্লায়েন্টদের ভালো ফল নিশ্চিত করতে পারবে, তার বাণিজ্যের সম্ভাবনা তত বেশি৷ তাদের তাই পর্দার পেছনে হাঁটার, নানা যোগাযোগ ও লেনদেনের রাস্তায় চলতে হয়৷
গত কয়েক বছরে স্কুলের শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষা দুটি বেড়েছে৷ কয়েক বছর আগে পর্যন্ত ছিল শুধু এসএসসি পরীক্ষা৷ এর সঙ্গে যোগ হলো পঞ্চম শ্রেণি (পিএসসি) ও অষ্টম শ্রেণি (জেএসসি)৷ এগুলো চালুর সময় শুনেছিলাম, এসএসসি উঠে যাবে৷ দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে তারপর একেবারে পরীক্ষা৷ তা হলো না৷ এসএসসিও থাকল৷ তার মানে চারটি পাবলিক পরীক্ষা৷ ক্লাসেও এখন পরীক্ষার সংখ্যা বেড়েছে৷ শুধু তা-ই নয়, গত এক দশকে বইয়ের ভারও বেড়েছে অনেক বেশি৷ তারপর যোগ হলো সৃজনশীল পরীক্ষার ব্যবস্থা৷ এতগুলো পরীক্ষা যোগ হলো, এত জ্ঞানের বিষয় যোগ হলো, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল হওয়ার জন্য বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলো৷ সেই অনুযায়ী ক্লাসরুম, শিক্ষক, আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি, নিয়মিত প্রশিক্ষণ—এগুলোর কেমন উন্নতি হলো?
সরকারি প্রাথমিক স্কুলে স্থানসংকুলান হয় না৷ শিক্ষকের অভাব৷ মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা আরও কম৷ এই চাহিদা পূরণে পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে কিন্ডারগার্টেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, মাদ্রাসা, ক্যাডেট মাদ্রাসা৷ শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের বই দেখি৷ একদিকে নতুন নতুন কঠিন বিষয়, অন্যদিকে ভুলে ভরা তথ্য, বাংলা-ইংরেজি৷ তাদের প্রতিদিনের রুটিন দেখলে ক্লান্ত লাগে, বিষণ্ন হই৷ ভারী ব্যাগ নিয়ে স্কুল, প্রাইভেট টিউটর, কোচিং সেন্টার৷ হৃদয়ে ধারণ করার উপায় নেই৷ মুখস্থ এবং নির্মম প্রতিযোগিতার শিকার তারা৷
স্বাধীনতার পর থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা কত বেড়েছে? ১৯৭২ সালে সরকারি ও বেসরকারি মিলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৩৬ হাজার ৫৪৭৷ ১৯৯০ সাল নাগাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৩৮ হাজার৷ সে সময় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল নয় হাজার৷ এর পর থেকে বেসরকারি স্কুলের সংখ্যা বাড়ল উল্লেখযোগ্য মাত্রায়৷ ১৯৯৫ সালের হিসাবে দেখা যায়, সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা একই আছে, কিন্তু বেসরকারি সংখ্যা নয় হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ২২ হাজার৷ ব্যানবেইসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী (২০১২) সারা দেশে সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা এখন ৩৭ হাজার ৬৭২৷ তার মানে ১৯৯০ সালের তুলনায় সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা কমেছে৷ আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ হাজার, যার বেশির ভাগই বাণিজ্যিক৷
সংবাদপত্রে প্রায়ই প্রাথমিক স্কুলের দুর্গতির খবর পাওয়া যায়৷ বেঞ্চ নেই, স্থানসংকুলান হয় না, শিক্ষক নেই! যে কজন শিক্ষক আছেন, তাঁদের আবার অনেককে সরকারি নানা দায়িত্বে এদিক-সেদিক যেতে হয়৷ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও চাহিদা অনুযায়ী বাড়েনি৷ সরকারি প্রাথমিক স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ পর্যন্ত সব জায়গাতেই শিক্ষক পদ অনেক খালি৷ ল্যাবরেটরি নেই শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ স্কুলে, লাইব্রেরি নেই, বিজ্ঞান ও অঙ্ক শিক্ষক নেই৷ তবে ডিজিটাল কর্মসূচির অধীনে কম্পিউটার গেছে৷ শিক্ষকদের মধ্যে আনুমানিক শতকরা মাত্র ৪০ ভাগ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত৷ এক দশকের আগের হিসাব, প্রায় এক লাখ শিক্ষকের কোনো প্রশিক্ষণ নেই৷
একদিকে পরীক্ষা ও বইয়ের চাপ বৃদ্ধি, অন্যদিকে স্কুল, শিক্ষক ও প্রশিক্ষণের সংকট৷ তাহলে এর মধ্যে থেকে শিক্ষার্থীরা কী করবে? এই ফাঁক থেকেই সম্প্রসারিত হয়েছে প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং ও গাইড বইয়ের তৎপরতা৷ প্রশ্নপত্র ফাঁস—শিক্ষাকে নিয়ে এসব বাণিজ্যিক উন্মাদনারই ফলাফল৷
‘সকল নাগরিকের জন্য অভিন্ন উন্নতমানের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব’—এই অবস্থান থেকে বাংলাদেশ সরে গেছে অনেক আগে৷ এর বদলে তার বর্তমান নীতি দাঁড়িয়েছে, ‘মেধা নয়, আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষা গ্রহণ করো৷ টাকা থাকলে শিক্ষা কেনো, স্কুলে বা বাইরে’৷ শিক্ষা নয়, ডিগ্রি কেনাবেচার বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়৷ তার ফলে গত দুই দশকে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিপুল বিকাশ হয়েছে৷
বাংলাদেশে প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল পর্যায়ের শিক্ষকদের বেতন পৃথিবীর মধ্যে নিম্নতম কয়েকটি দেশের সারিতে৷ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের শিক্ষকদের বেতনের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন শতকরা ৩০ থেকে ৫০ ভাগ৷ একদিকে বেতন এত কম, অন্যদিকে অর্থ উপার্জনের নানা বাণিজ্যিক পথের সম্প্রসারণ সকল পর্যায়ে শিক্ষকদের বড় অংশকে অস্থির করে রেখেছে৷ পাবলিক বা সর্বজনের প্রতিষ্ঠানগুলোয় ঘটেছে একধরনের অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যিকীকরণ আর অন্যদিকে নিজের পেশাগত পরিচয় ব্যবহার করে নানা বাণিজ্যিক তৎপরতায় যুক্ত হওয়া৷
এর বিপরীতে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত একটি দৃশ্যপট চিন্তা করি: প্রতিটি গ্রাম, পাড়া ও মহল্লায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে৷ সেখানে আছেন একদল শিক্ষক, যাঁরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত৷ শিক্ষক অনুপাতে শিক্ষার্থী ৩০ জনের বেশি হচ্ছে না৷ প্রতিটি স্কুলে যথেষ্টসংখ্যক ক্লাসরুম, বেঞ্চ, কম্পিউটর, মাল্টিমিডিয়া আছে৷ সারা দেশে যথেষ্টসংখ্যক উন্নত মানের মাধ্যমিক স্কুল আছে৷ সবগুলোয় ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি আছে৷ অঙ্ক, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সমাজসহ সব বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, যথেষ্ট সরঞ্জাম আছে৷ সকল পর্যায়ের স্কুলগুলোয় খেলার মাঠ আছে, গাছপালা আছে, যেখানে সম্ভব সেখানে পুকুর আছে, সাঁতার হয়, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক তৎপরতার সব ব্যবস্থা আছে৷ শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল তৎপরতার জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হচ্ছে৷ ক্লাস, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, মাঠ, গাছপালা, পুকুর সব জায়গাতেই শিক্ষা, সবখানেই আনন্দ৷ শিক্ষকেরা ভালো বেতন পাচ্ছেন, শিক্ষকতা তাঁদেরও আনন্দের কাজ, তাঁদের পুরো মনোযোগ প্রতিষ্ঠান ঘিরেই৷ স্কুলেই সব পড়াশোনা হচ্ছে বলে কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউশনি, গাইড বই—সব উঠে গেছে৷ এসব কাজে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা অনেকেই এখন শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছেন৷ শিক্ষকসংখ্যা অনেক বেড়েছে৷ শিক্ষকতা অনেক আগ্রহের পেশা৷ আর ছেলেমেয়েরা? তাদের ঘাড়ে-মাথায়-বুকে বই, টিচার আর মা-বাবার ভীিতকর চাপ নেই৷ মেধা আর সৃজনশীলতা নিয়ে তারা এখন জগতের কাছে উন্মুক্ত৷
বাংলাদেশে আমাদের সন্তানদের জন্য এ রকম শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা কি অসম্ভব? না, খুবই সম্ভব৷ এর জন্য অনেক টাকা দরকার? না, যে টাকা দরকার, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনায় কিছুই না৷ সরকার এই প্রসঙ্গে সব সময়ই বলে এসেছে, এখনো বলবে, আমাদের অর্থ কোথায়? দেশের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয়ে দাবি তুললেই সরকারের এই যুক্তি শোনা যায়৷ জাতীয় আয়ে শিক্ষা খাতে ব্যয়ের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ন্যূনতম অনুপাত আছে, এটা হলো শতকরা ৬ ভাগ৷ পৃথিবীতে বহু দেশ এর দ্বিগুণের বেশি ব্যয় করে৷ বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের অংশীদার হলেও তার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ এখনো জাতীয় আয়ের শতকরা ২ ভাগ৷ অর্থাৎ, শিক্ষা বাজেট ন্যূনতম বাজেট তিন গুণ বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ৷ কিন্তু এ বছরও
শিক্ষা বাজেট আগের বছরের তুলনায় আরও কমছে বলে শোনা যাচ্ছে৷ এই খাতে আগের বছরে স্কুলঘর নির্মাণ ও মেরামতে যতটা বরাদ্দ ছিল, সেটাও উদ্যোগের অভাবে খরচ হতে পারেনি৷
শতকরা ৬ ভাগ ম ানে তো অনুপাত, যত জাতীয় আয় তার শতকরা ৬ ভাগ৷ অন্য বহু দেশ এর থেকে বেশি ব্যয় করতে পারলে আমাদের অসুবিধা কী? অসুবিধা শিক্ষাকে বাণিজ্য বানানোর নীতি ও দুর্নীতিতে৷ সরকার চাইলে আমরা টাকার উৎস হাতে-কলমে দেখিয়ে দিতে পারি৷ কিন্তু এটাও জানি, কিছু লোকের বাদশাহি শানশওকত আর সর্বজনের সম্পদ চুরি-ডাকাতির নীতি অব্যাহত থাকলে কোটি কোটি মানুষের সর্বজনের শিক্ষার জন্য টাকার অভাব কখনোই মিটবে না৷

(জুন ০১, ২০১৪ তাইখে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত)