c662194b95937353a78dc052dbd883a9 13জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে প্যারিসে এখন বিশাল সম্মেলন চলছে। এর দুই মাস আগে গত ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে টেকসই উন্নয়নের বৈশ্বিক লক্ষ্য স্থির করার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কাছাকাছি সময়ে দুটো বৈশ্বিক দরবারের কেন্দ্রীয় বিষয়ে অভিন্নতা আছে। মর্মকথা হলো, বিদ্যমান উন্নয়ন ধরন (উৎপাদন, আহরণ, প্রবৃদ্ধি, ভোগ) দিয়ে বিশ্ব এক মহাবিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর থেকে রক্ষা পেতে গেলে উন্নয়নের ধারার মধ্যে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। সেই পরিবর্তন নিয়েই দরবার, দর-কষাকষি, বোঝাপড়া ও ক্ষেত্রবিশেষে চুক্তি।

দুটো বিশ্বদরবারেই বাংলাদেশ সরকারকে অনেক উৎসাহী ও সক্রিয় দেখা গেছে। দেশ থেকে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে অনেক প্রতিনিধি গেছেন সেখানে। বর্তমান উন্নয়নের ধারায় ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ, তবে যারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এই লক্ষ্যে আসল কারণ দূর না করে জলবায়ু বিষয়ে বিশাল তহবিলের আয়োজন চলছে। তার দিকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, সরকার ও দেশি-বিদেশি বহু নতুন-পুরোনো এনজিও কনসালট্যান্টের নজর। ক্ষতিপূরণের নামে তহবিলের ভাগ পাওয়ার বিষয়ে যত আগ্রহ, নিজেদের ভূমিকা পরিবর্তনে ততটাই অনাগ্রহ। নিজেদের অপরাধ নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই, ভূমিকা পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ নেই।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে হট্টগোলের সুযোগে দেশের ভেতরে ‘উন্নয়ন’ নামে যে সর্বনাশা সব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন আড়াল করার চেষ্টাই বরং জোরদার। বাংলাদেশে নদী-বন খুন হচ্ছে সরকারি ভুল প্রকল্প বা দখলদারির জন্য। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বিশ্ব ঐতিহ্য কোটি মানুষের প্রাকৃতিক সুরক্ষা বাঁধ সুন্দরবনের বিনাশ ঘটতে যাচ্ছে রামপাল ও ওরিয়ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ ভূমি ও বনগ্রাসী বিভিন্ন ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পের জন্য। অপরিমেয় দায়িত্বহীনতায় বিশাল ঋণ আর বিপদের বোঝা তৈরি করে পারমাণবিক বিদ্যুতের ঢোল পেটানো হচ্ছে। দেশে পাহাড় চলে যাচ্ছে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দখলে। বাতাস, পানি ও খাদ্য বিষাক্ত হচ্ছে মুনাফার উন্মাদনায়। এর সঙ্গে ভারতের ফারাক্কা, টিপাইমুখ, চীনের বাঁধ যোগ করছে অপূরণীয় ক্ষতি। এসব ঘটনা দেখলে যে কেউ স্বীকার করবেন প্রকৃতপক্ষে জলবায়ু পরিবর্তনে যদি দেশের কোনো ক্ষতি না-ও হতো, তাহলেও দেশের বিপর্যয় কমত না। প্রাণ-প্রকৃতি মানুষের অস্তিত্ব বিপন্ন হতোই, যাকে আমরা বলতে পারি ‘উন্নয়ন স্বৈরতন্ত্র’, তার কারণে। বিশেষজ্ঞ বা এনজিও যে-ই হোক, এসব বিষয়ে নীরব থেকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার কথা বাগাড়ম্বর ছাড়া আর কী? সরকার কী করে, কোন মুখে এই উন্নয়নের ধারা বজায় রেখে টেকসই প্রকল্প আর পরিবেশ রক্ষার নামে অর্থ ভিক্ষা করতে পারে?
 
টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে গিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের দীর্ঘ ঘোষণা প্রকাশ করা হয়েছে। ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘আমরা এমন এক বিশ্ব কল্পনা করি, যেখানে প্রতিটি দেশ একটানা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভোগ করবে এবং সবার জন্য শোভন কাজের নিশ্চয়তা থাকবে। এমন এক বিশ্ব, যেখানে ভোগ ও উৎপাদনের ধরন এবং সব প্রাকৃতিক সম্পদ—বাতাস থেকে জমি, নদী, লেক, ভূগর্ভস্থ পানি থেকে সাগর–মহাসাগর—ব্যবহারের ধরন হবে টেকসই।’ আসলেই বিশ্বনেতারা তা-ই মনে করেন? মনে করলে নিজেদের ভূমিকার কী পরিবর্তন ঘটাচ্ছেন তাঁরা? তাঁরা আরও বলেছেন, আমরা এমন এক বিশ্ব কল্পনা করি, যেখানে গণতন্ত্র, সুশাসন ও আইনের শাসনের সঙ্গে সঙ্গে টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ রক্ষা হবে, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য ও ÿক্ষুধার নিরসন ঘটবে। বলছেন, এমন এক বিশ্ব, যেখানে উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহার হবে জলবায়ু সংবেদনশীল, যেখানে জীববৈচিত্র্য গুরুত্ব পাবে। এমন এক বিশ্ব, যেখানে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করে বাঁচবে এবং যেখানে বন্য প্রাণী ও অন্যান্য জীবিত প্রজাতি রক্ষা পাবে। <https://sustainabledevelopment. un. org/post 2015 /transformingourworld> বাংলাদেশ সরকার এই ঘোষণার শরিক হয়ে কীভাবে উপরিউক্ত উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হয়?
 
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলাফল নিয়ে বিশ্বে এ রকম একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যদি এভাবেই উন্নয়ন ভোগ চলতে থাকে, তাহলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যঘাটতি বাড়বে। প্রাণ ও প্রকৃতির বড় অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু বিশেষজ্ঞ গিডিয়ন পলিয়া লিখেছেন, ‘প্রতিবছর বিশ্বের ৭০ লাখ মানুষ বায়ুদূষণের কারণেই মৃত্যুবরণ করে।’ (কাউন্টার কারেন্টস, ২৯ নভেম্বর ২০১৫) তিনি আরও বলেন, বিশ্বকে খুব দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে যেতে হবে। তিনি তথ্য দিয়েছেন উচ্চমাত্রায় ভর্তুকিপ্রাপ্ত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকৃত ব্যয় চার ভাগের এক ভাগ।
 
১৯৯৭ সালে কিয়োটো প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যারা আসল অপরাধী, সেই যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত সর্বোপরি বিশ্ব করপোরেট গোষ্ঠী যথারীতি গা না লাগানোয় কোনো কাজ হয়নি। ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে আরেকটি সমঝোতা হয়, ফলাফল একই রকম। এর মধ্যে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনে আরও অবনতি হয়েছে, পাশাপাশি যুদ্ধ, সহিংসতা, দখল ও গণহত্যায় বিশ্বের মানবিক পরিবেশ আরও অবনতির শিকার হয়েছে। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, বেড়েছে বঞ্চনা আর অনিশ্চয়তাও।
 
আমরা দেশে-বিদেশে পুঁজিপন্থী অনেক বিশেষজ্ঞ পাই, যাঁরা মনে করেন, পরিবেশ বিষয়ে চিন্তা করা একটা বিলাসিতা। গরিব দেশ বা গরিব মানুষের এই বিলাসিতা সাজে না। আগে প্রবৃদ্ধি হোক, পরে পরিবেশ ঠিক করা যাবে। আসলে ঘটনাটা উল্টো। গরিবদের জন্যই নিজেদের সম্পদ রক্ষা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নদী, বন, আবাদি জমি, বাতাস নষ্ট হয়ে গেলে বিকল্প পাওয়ার উপায় তাদের আরও কম। পানি নষ্ট হলে ধনী কিনে খেতে পারে, বাতাস নষ্ট হলে ধনী এসি লাগিয়ে ঘুরতে পারে, পরিবেশ বিপর্যয় ঘটলে ধনী লোকজন অন্য দেশে পাড়ি জমাতে পারে। গরিবের জন্য তার উপায় নেই। তাকে দেশেই থাকতে হবে। তার জন্য উন্নয়ন মানে তার বর্তমানকে আরও সমৃদ্ধ করা, সব সম্ভাবনা নিঃশেষ করা নয়। অর্থনীতিবিদ পার্থ দাশগুপ্ত উন্নয়ন সম্পর্কে অর্থশাস্ত্রের নানা তত্ত্ব ও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে লিখেছেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি-বিষয়ক সমসাময়িক মডেলগুলো প্রকৃতিবিদ্বেষী, তারা প্রকৃতিকে দেখে স্থির অবিনাশী একটি উৎপাদন একক হিসেবে, যা খুবই ভুল। প্রকৃতি হচ্ছে বিনাশযোগ্য অসংখ্য উপাদানের সমষ্টি।’ (দ্য নেচার অব ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড দ্য ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অব নেচার, ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি, ডিসেম্বর ২১, ২০১৩)। প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে পুনরুৎপাদনের ক্ষমতা আছে, কিন্তু তা মানুষের আগ্রাসী ভূমিকার কারণেই নষ্ট হয়ে যায়।
 
কার্যত এই দুই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনেই প্রধান সমস্যা দুটো। প্রথমত, যে উন্নয়নদর্শন বিশ্বকে এই রকম বিপদগ্রস্ত অবস্থায় নিয়ে গেছে, তার প্রধান অংশীদারদের কর্তৃত্ব বজায় রেখে, তাদের স্বার্থ সমুন্নত রাখার সব ব্যবস্থা অটুট রেখেই ঘোষণা, লক্ষ্য ও কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে ভালো ভালো লক্ষ্য খণ্ড খণ্ড পরিকল্পনার অধীনে তাদের মর্জি দ্বারাই পরিচালিত হয়। এবং পরস্পরবিরোধী স্বার্থরক্ষায় দেখা দেয় গোঁজামিল। দ্বিতীয়ত, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় অব্যাহত সন্ত্রাসী তৎপরতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও তার উৎস স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতি, সমরাস্ত্র উৎপাদন, দখল ও গণহত্যা নিয়ে কোনো ঘোষণা, প্রতিশ্রুতি, কর্মপরিকল্পনা নেই।
 
নাওমি ক্লেইনের সঙ্গে আমি একমত যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বর্তমান সংকট বিশ্বের একটি মৌলিক পরিবর্তনের জন্য অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। নাওমি এই পরিবর্তনের বিভিন্ন দিকের দীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন। (দিজ চেঞ্জেস এভরিথিং. ক্যাপিটালিজম ভিএস দ্য ক্লাইমেট, এনওয়াই, ২০১৪)। সেই পরিবর্তনের মূল কথা বিশ্বজুড়ে নিজেদের জীবন, সম্পদ ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার ওপর সর্বজনের মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। যুদ্ধ ও ধ্বংসে অর্থের অপচয়ের ধারা বন্ধ করে সর্বজনের শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন ও গৃহায়ণে অর্থ জোগান। জ্বালানি, পানির ওপর সর্বজনের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। নির্বিচার অন্ধ প্রবৃদ্ধি ও মুনাফামুখী পরিবেশবিধ্বংসী উন্নয়নের ধাক্কায় বিশ্বের অস্তিত্বই এখন বিপন্ন। সে জন্য দুনিয়াজুড়ে ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ এখন সন্ত্রাসীর মতোই বড় ভয়ের নাম। ‘উন্নয়ন’ নামের এই সন্ত্রাসী অভিযানের বিরুদ্ধে মানুষের বৈশ্বিক সংহতি এবং নতুন রাজনীতির তাগিদই প্রবল হয়ে উঠছে এখন।
 
 প্রকৃত কারণের জায়গায় হাত না দেওয়া পর্যন্ত এসব ব্যয়বহুল সম্মেলন, লক্ষ্য, চুক্তি সবই খণ্ডিত ফল দিতে বাধ্য। মূল করণীয় উন্নয়নদর্শনের পরিবর্তন। তার সারকথা উন্নয়নকে নিছক প্রবৃদ্ধি, যেকোনো ধরনের নির্মাণ দিয়ে পরিমাপ করার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে আসা। যেকোনো প্রকল্পের লাভ-ক্ষতি হিসেবে শুধু বিনিয়োগ-লাভ দিয়ে বিচার করার প্রচলিত চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে এর কারণে সমাজ-নদী-পরিবেশগত ক্ষতি তাতে যোগ করা। ব্যক্তির জন্য যতই লাভ হোক, তা যদি সামষ্টিক মানুষ ও প্রকৃতির জন্য বিপর্যয় সৃষ্টি করে, তাকে উন্নয়ন তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। নদী, বন, আবাদি জমি নষ্ট হয়—এমন উন্নয়ন প্রকল্প বর্জন করা। সর্বজনের সম্পদ কোনোভাবেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দখলে যেতে না দেওয়া। সব প্রকল্পের নির্বাচন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বজায় রাখা, জনগণের অংশগ্রহণ ও সম্মতিকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে নিশ্চিত করা। বিশ্বদরবারে এসব কথাই নানাভাবে আসছে, কিন্তু কার্যকর পরিবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামো। বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন এখন জীবন-মরণ প্রশ্ন।

[৭ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত]