বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তথাকথিত ‘কালো টাকা’ বা অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থ কিংবা অপরাধের মধ্যে উপার্জিত অর্থ, সেটার একটা বড় ভূমিকা আছে। বাংলাদেশে অপরাধমূলক তৎপরতা, অর্থনীতির একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অপরাধমূলক তৎপরতার অন্তর্ভূক্ত হচ্ছে জমি দখল, রাষ্ট্রীয় বা গণসম্পদ দখল। যেমন বন-নদী-নালা-খাল-বিল-জলাশয়– এগুলি দখল করা, অপরিকল্পিত নির্মাণ, কিংবা সেগুলো বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক তৎপরতায় কাজে লাগানো। এগুলোর সাথে আবার সন্ত্রাসী তৎপরতা অবিচ্ছেদ্য। ড্রাগ, নারী পাচার, শিশু পাচার, নকল কারখানা কিংবা বিষাক্ত বিভিন্ন খাদ্য বা খাদ্যের জন্য উপাদান তৈরি করা– এসমস্ত তৎপরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে।

সুতরাং বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলেই যে সবসময় তা অর্থনীতির জন্য ভালো হয় কিংবা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি গতিশীল হয়, তা নাও হতে পারে। অনেক ধরনের বিনিয়োগ আছে, যেসব বিনিয়োগ সন্ত্রাস তৈরি করে, অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে কিংবা অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। সেজন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি কিংবা জিডিপি বৃদ্ধি থেকে সরাসরি সিদ্ধান্ত টানা যায় না। বিনিয়োগের পরিমাণগত দিক আবার গুণগত দিক, এ দুটোই দেখা দরকার।

কারণ আমরা দেখেছি বিশ্বের বহুদেশের তুলনায় গত দুই দশকে বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার একেবারে খারাপ ছিল না। গড়পড়তা পাঁচ-এর বেশি ছিল। তা সত্ত্বেও দারিদ্র-বিমোচনের হার ছিল খুব দুর্বল। জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৫ থেকে ৬-এর মধ্যে থাকা সত্ত্বেও আমরা দেখেছি স্থিতিশীল কর্মসংস্থান সেভাবে বাড়েনি। যতটুকু বেড়েছে সেগুলি বেশিরভাগ অনানুষ্ঠানিক খাতে। টেকসই কিংবা স্থিতিশীল কর্মসংস্থান বৃদ্ধি না পাওয়ার ফলে মানুষের প্রকৃত আয়ও সেভাবে বাড়েনি। মানুষের নিশ্চিত এবং টেকসই আয়ের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি না পেলে দারিদ্র পরিস্থিতিরও কোনো উন্নতি হয় না।

গত কয়েক বছরে যেভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে তার ফলে শতকরা ৬০ থেকে ৭০ ভাগ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। দারিদ্র সীমার নিচে যে জনগোষ্ঠী সেই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আগে সরকারি হিসাব মতে ছিল শতকরা ৪০ ভাগ। সরকারি হিসাব বিবেচনা করে সেটা এখন শতকরা প্রায় ৪৮ এ উঠে গেছে। প্রকৃত হার কিন্তু আরো বেশি। পঞ্চাশও যদি ধরি তাহলে সাড়ে সাত কোটি মানুষ এখন দারিদ্র সীমার নিচে, যে সংখ্যা যাত্রা শুরুর সময় বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল। আমরা যদি দারিদ্র সীমার আয় দুই ডলার (পিপিপি) ধরি প্রতিদিন, তাহলে দারিদ্র সীমার নীচে জনসংখ্যা শতকরা আশি ভাগের বেশি। গত এক দশকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে, দারিদ্রসীমার নীচে মানুষের সংখ্যা একমাত্র বাংলাদেশেই বেড়েছে।

সুতরাং যতই সাফল্যের ঢাক শুনিনা কেন, বাংলাদেশে এখনও দারিদ্র পরিস্থিতি একটা ভয়াবহ অবস্থায় আছে। টাকার অংকে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি, মোটামুটি গ্রহণযোগ্য ভালো একটা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার, ঢাকা শহরে বহুতল ভবন কিংবা শপিংমলের বিস্তার ইত্যাদির পরও আমরা দেখতে পাচ্ছি দারিদ্র পরিস্থিতি এরকম। সম্পদ ও দারিদ্রের, জাকজমক ও বৈষম্যের এই বৈপরীত্য দেখায় যে, যে ধরনের অর্থনীতির নীতির দ্বারা বাংলাদেশ এ যাবৎকাল পরিচালিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্তর্গত গুরুতর সমস্যা আছে। যার ফলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও দারিদ্র বিমোচন সেভাবে ঘটেনি এবং মানুষের টেকসই কর্মসংস্থানও সেভাবে বাড়েনি। বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা আরও তিক্ত।

১৯৭২-৭৩ থেকে ১৯৮২-৮৩ সময়কালে শিল্পখাতের আপেক্ষিক বিকাশ ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ ভিত্তিতে ভেঙে ভেঙে দেখলে দেখা যায় এই সময়ে ক্ষুদ্র শিল্পের আপেক্ষিক অবস্থানের কোন উন্নতি হয়নি বরং তার সামান্য অবনতি দেখা যায় ৫.৫০ থেকে ৫.৪২ শতাংশ। কিন্তু একই সময়কালে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায় বৃহৎ ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে, প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায় এর আপেক্ষিক অবস্থান। ১৯৭২-৭৩ এর আনুপাতিক অবস্থান ছিল ২.৪০, ১৯৮২-৮৩ তে এটি দাঁড়ায় ৫.৭১। কিন্তু এই অবস্থান বর্তমান সময় পর্যন্ত আর পরিবর্তিত হয়নি। মাঝখানে ৯০ দশকের দ্বিতীয়ার্ধে এর অবস্থান আংশিক বাড়লেও পরে তা আবার কমে ৮২-এর কাছাকাছি অবস্থানে এসে স্থিত হয়েছে।

৮২-র পর বৃহৎ ও মাঝারি শিল্পের আপেক্ষিক অবস্থান যখন স্থির অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, সামান্য উঠানামা নিয়ে, সেই সময়কালে অন্যদিকে ক্ষুদ্র শিল্পে নেমেছে ধস। ১৯৮২ সালের তুলনায় ২০০০ সালে ক্ষুদ্র শিল্পের আপেক্ষিক অনুপাত প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ১৯৮২ সালে ক্ষুদ্র শিল্পের অনুপাত যা ছিল ৫.৪২, তার বড় ক্ষয় হয় ৮০ দশকেই, তা নেমে আসে ৩.৬৪ এ। ২০০০ নাগাদ এটি আরও কমে দাঁড়ায় ২.৮৩। ৮০ দশকে বৃহৎ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র সব শিল্পে অবনতি দেখা যায়। উল্লেখযোগ্য যে, ৮০ দশক হলো বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এর ‘সংস্কার’ কর্মসূচির ‘স্বর্ণ-দশক’। বাংলাদেশে এগুলোর সমন্বিত জোরদার প্রয়োগ দেখা যায় এই দশকেই।

বস্তুত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের প্রায় পুরোটাই বেসরকারি খাতে। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের অন্তর্ভুক্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বৃহৎ ও মাঝারি শিল্পের কাতারে। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের শিল্প প্রতিষ্ঠান যখন সরকারি বিভিন্ন নীতি ও দুর্নীতির কারণে ক্রমশ রুগ্ন হয়েছে, ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে কিংবা নিশ্চিহ্ন হয়েছে সেই একই সময়ে আমরা বেসরকারি খাতের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পগুলোর মধ্যেও ক্ষয় এবং ধস দেখি। যদিও “বেসরকারি খাতের বিকাশ” গত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশী সরকারের সকল কর্মসূচির লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু কয়েকটি উপখাতে বেসরকারি খাতের শিল্পখাতে, বিশেষত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে, ধ্বসও একই সময়ের ঘটনা। আমদানিমুখিতা বৃদ্ধি এর অন্যতম কারণ।

৮০ দশকে ও তারপর, বেসরকারি খাতে যে ধরনের তৎপরতার বিকাশ বিশেষভাবে লক্ষণীয় সেটি হলো রফতানিমুখী কারখানা, বিশেষত তৈরি পোশাক ও রফতানিমুখী কারখানা। ১৯৮২ সালের দিকে এ দেশে শ’খানেক গার্মেন্টস কারখানা ছিল, ১৯৯০ নাগাদ এই সংখ্যা সাতশ’ অতিক্রম করে এবং ২০০০ সালের মধ্যে তা প্রায় তিন হাজারে দাঁড়ায়। এখন এর সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। কর্মসংস্থানও এখানে ক্রমে তৈরি হয় ৩০ লক্ষ শ্রমিকের। রফতানিমুখী অঞ্চলেরও এরকম না হলেও অন্যান্য খাতের তুলনায় দ্রুত বিকাশ ঘটেছে। বিশেষত রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের দ্রুত বিকাশ সত্ত্বেও ৮০, ৯০ ও পরবর্তী দশকে সামগ্রিক শিল্পখাতের অবস্থা থেকে ধারণা করা যায় যে, তৈরি পোশাক শিল্প বাদ দিয়ে হিসাব করলে পুরনো শিল্পখাতে ক্ষয় আরও বড় হয়ে ধরা পড়বে।

নতুন ৩০ লাখ কর্মসংস্থান যোগ হওয়া সত্ত্বেও তাই শিল্পখাতে কর্মসংস্থানে উন্নতি দেখা যায় না বরঞ্চ পরিষ্কার অবনতি দেখা যায়। শ্রমশক্তি জরিপের প্রাপ্ত তিন সময়কালের যে দলিল তা তুলনা করলে ৮০ দশকের শেষ ও ৯০ দশকের শেষ সময়ের একটা তুলনামূলক চিত্র পাওয়া যায়। দুই সময়কালের মধ্যে বাংলাদেশে মোট শ্রমশক্তি যোগান বেড়েছে, কৃষি-বন-মৎস্য খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে, বেড়েছে নির্মাণ, ব্যবসা-হোটেল-রেস্তোঁরা, পরিবহণ ক্ষেত্রে।
গত সাড়ে তিন দশকে শিল্পখাতের উল্লেখযোগ্য প্রবণতাগুলো নিম্নরূপ:

১. সমগ্র অর্থনীতিতে শিল্পখাতের টেকসই কোন অবস্থান সৃষ্টি হয়নি।

২. এই সময়কালে বহুসংখ্যক বড় ছোট মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়েছে। দেশের বৃহত্তম কারখানা আদমজী পাটকল বন্ধ হয়েছে ২০০২ সালে। এরপর আরও অনেকগুলো পাটকল বন্ধ হয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর একটি অংশ ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে। কিন্তু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসরকারি কারখানাও এ সময়ে বন্ধ হয়েছে। অনেক শিল্প রুগ্ন হয়ে পড়েছে। বন্ধ কিংবা রুগ্ন হয়ে যাবার ঘটনাবলির পেছনে অবকাঠামো, অর্থসংস্থান, আমদানিমুখি নীতি, অসম প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় সবরকমের বৈষম্যমূলক নীতি কাজ করেছে।

৩. ৮০ ও ৯০ দশকে রফতানিমুখী বিভিন্ন কারখানা বিশেষত গার্মেন্টস কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয় উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। রফতানিমুখী শিল্পখাতের প্রতি আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সরকারের ভর্তুকি ও সুবিধা দানের নানা কর্মসূচি এবং সস্তা শ্রমশক্তির যোগান এই বিকাশ সম্ভব করেছে।

৪. ৭০ দশকের প্রথম দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোই শিল্পখাতের প্রধান মুখ ছিল। ৯০ দশকে এসে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ শতকরা ৮০ ভাগের স্থানে ৪০ ভাগে নেমে আসে। বর্তমানে এই হার আরও কম।

৫. ৭০ দশক পর্যন্ত বৃহৎ শিল্পগুলোই উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করতো। মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, চট্টগ্রাম স্টিল মিল ছিল এ দেশে শিল্পায়নের জন্য আবশ্যকীয় মূলধনী পণ্য প্রতিষ্ঠান। ৮০ দশকে এসে এগুলোর ক্ষয় ও বিলুপ্তির প্রক্রিয়া স্পষ্ট হয় এবং ৯০ দশকে এগুলো অচল হয়ে পড়ে। বৃহত্তম পাটকল আদমজী বন্ধ হবার মধ্য দিয়ে বৃহদাকার শিল্প প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব এ দেশ থেকে প্রায় বিলুপ্তির পথে।

৬. একদিকে নতুন রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানে নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে অন্যদিকে পুরনো শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা রুগ্ন হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থান কমেছে। তার অর্থ হলো এই খাতে যে সংখ্যক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে গত তিন দশকে, বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার থেকে বেশি কর্মসংস্থান বিনষ্ট হয়েছে।

এসব কারণে আমরা গ্রাম থেকে শহরে দারিদ্র স্থানান্তর দেখি, ছিন্নমূল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উৎপাদনশীল রূপান্তর তুলনায় অনেক কম। অনিশ্চিত, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের উপরই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিন্নমূল মানুষের নির্ভরতা দেখতে পাই। যার উপর ভর করে দারিদ্র হ্রাসের পরিসংখ্যান জোর নিয়ে দাঁড়াতে পারে না।

(সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১০ bdnews24.com এ প্রকাশিত)