জীবন দিয়ে আনা রেমিট্যান্স ও বিপন্ন মানুষ

বিশ্ব অর্থনীতির সংকট, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ-আগ্রাসন-বিদ্রোহ ইত্যাদি কারণে গত কিছুদিনে প্রবাসীদের কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা বেড়েছে, নি:স্ব হয়ে কিংবা অনিশ্চয়তা নিয়ে ফিরে আসছেন অনেকে। রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়কৃত অর্থ প্রেরণের হারেও নিম্নগতি দেখা যাচ্ছে। ঝুঁকিতে ব্যক্তি, পরিবার ও সামগ্রিক অর্থনীতি।

সত্তর দশকের শেষ দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের দেশে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে জনশক্তি রফতানি শুরু করে। আশির দশকে এ ধারা বেগবান হয়ে ওঠে। নব্বই দশকে ব্যাপকহারে বাংলাদেশী শ্রমিক এবং পেশাজীবীরা অভিবাসিত হতে থাকেন। প্রথম দিকে বাংলাদেশের শ্রমিকরা মূলত যুক্ত হয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারেই। নব্বই দশকে উত্তর আমেরিকাসহ ইউরোপের দেশগুলোতেও তারা যেতে শুরু করেন। তবে উত্তর আমেরিকা ইউরোপে অদক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি ডাক্তার, প্রকৌশলী, স্থপতি, নার্সসহ বিভিন্ন পেশার মানুষজনও তুলনামূলকভাবে বেশি গেছেন।

বর্তমানে বাংলাদেশে যে সংখ্যক মানুষ দৈহিক শ্রমনির্ভর কাজের সঙ্গে যুক্ত একই সংখ্যক বাংলাদেশী মানুষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশেও কর্মরত। প্রায় ৭০ লক্ষ। এই বিষয়টি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এদেরই পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা অর্থাৎ রেমিট্যান্স বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের একটি অন্যতম প্রধান উৎস। জাতীয় আয়ের অনুপাত হিসাবে রেমিট্যান্সের অবস্থানগত দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের একটি বাংলাদেশ।

প্রবাসীদের আয়ের সিংহভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার যারা তুলনামূলক বেশি আয়ের পেশায় জড়িত, পেশাজীবী তারা দেশে খুব একটা টাকা পাঠান না। তাদের মূল লক্ষ থাকে সেই দেশেই স্থায়ী হয়ে যাওয়া। দেখা যায় এই শ্রেণীর লোক ধীরে ধীরে পরিবারের সদস্যদের নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাচ্ছেন। তারা বরঞ্চ উল্টো দেশে যদি কোনো স্থাবর সম্পত্তি থাকে সেগুলো বিক্রি করে নগদ অর্থ সেইসব দেশে নিয়ে যান।

বস্তুত রেমিট্যান্স নিয়ে যে কোনো আলোচনায় প্রবাসী শ্রমিকরাই কেন্দ্রে থাকবার কারণ। এই শ্রমিকেরাই রেমিট্যান্সের মূল উৎস। বাংলাদেশ যে বেশ কয়েক বছর ধরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে একটি স্বস্তিকর পর্যায়ে আছে তার মূল কারণ এই রেমিট্যান্স। প্রবাসী শ্রমিকরা তাদের অবর্ণনীয় কষ্ট শ্রমে ঘামে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকি থেকে রক্ষা করছেন।

সরকারের কাছে এই রেমিট্যান্সের গুরুত্ব থাকলেও এই শ্রেণীর মানুষদের গুরুত্ব নাই। যারা নিজেদের সহায় সম্পত্তি বিক্রি করে বিদেশে যাচ্ছেন, তারা অনেকে এখানে শ্রমিক না হলেও বিদেশে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেই টাকা পাঠান। কিন্তু অনেক সময়ই তারা বিদেশের শ্রমবাজারে যেতে গিয়ে ভয়াবহ প্রতারণা ও বঞ্চনার শিকার হন। চুক্তি অনুযায়ী চাকুরি পান না, চাকুরি পেলে মজুরি পান না। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় চরম অনিশ্চয়তায় পতিত হন। আবার কখনো কখনো অবৈধভাবে অবস্থানের কারণে নির্দিষ্ট দেশ থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয়। এভাবেই সর্বস্বান্ত হন অনেকেই। যারা কাজ অব্যাহত রাখেন তারাও নানা অনিয়ম, অত্যাচার, মজুরি কম দেয়া, বেশি সময় খাটানো, অবর্ণনীয় পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা, বলপ্রয়োগ ইত্যাদির শিকার হন। প্রবাসী শ্রমিকদের লাশ আসে কিন্তু তার অবর্ণনীয় জীবন অভিজ্ঞতা আমাদের অজানাই থাকে। এসব ক্ষেত্রে দেশে সরকারের কিংবা বিদেশে তার প্রতিনিধি দূতাবাসগুলোর কার্যকর কোন সহায়ক ভূমিকা দেখা যায় না।

অন্যদিকে প্রবাসগমন সামাজিক টেনশনও তৈরি করে অনেক ধরনের। একটি পরিবারের একটি ছেলে যখন বিদেশে শ্রম বিক্রি করতে যায় তখন সেই পরিবারটি সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়। পরিবারের ভাঙন, পরিবারের সদস্যদের অনিশ্চয়তা, অর্থ নিয়ে সংঘাত এমন অনেক ঘটনার কথাই আমরা জানি।

দেশের একেবারে চরম দরিদ্র শ্রেণীর প্রতিনিধিরা বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পান না। বিমানের টিকিট, ভিসা ফি, মেডিকেল ফি, দালালদের কমিশন জোগাড় করা এই শ্রেণীর মানুষের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। এই বাস্তবতায় বিদেশে কর্মের সন্ধানে যায় মূলত নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষেরা। অন্যদিকে বিদেশ থেকে যারা টাকা পাঠান বা সঞ্চয় নিয়ে ফিরে আসেন তাদের সেই অর্থ যথাযথ উৎপাদনশীল কাজে কমই ব্যয় হয়। সেকারণে সমাজে তা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না। প্রকৃতপক্ষে প্রবাসী আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হয় ভোগ্যপণ্য, জমিজমা ক্রয় ও সামাজিক প্রতিপত্তি প্রদর্শনের কাজে। টেলিভিশন, ফ্রিজ, মোবাইল, নতুন বিল্ডিং, মসজিদ বা মন্দির, সামাজিক ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে অর্থব্যয় হয় অনেক। প্রবাসী আয় অর্থাৎ রেমিট্যান্সের সাথে দেশের রিয়েল এস্টেট খাত, মোবাইলসহ ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের বাজারে রমরমা একটি ভাবের একটা যোগসূত্র পাওয়া যাবে। উৎপাদনশীল খাতের বিকাশ না ঘটিয়ে ভোগবিস্তার সমাজ ও অর্থনীতিতে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে। বাংলাদেশে সেটাই হয়েছে।

প্রবাসী আয়ের একটি অংশ প্রবাস ফেরত অনেকেই ঠিকই ব্যয় করতে চান যথাযথ অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক কাজে। কিন্তু অভিজ্ঞতার অভাবে আর সেইসঙ্গে সরকারের নির্দেশনা ও সহায়তার যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাবে এঁদের অনেকেই প্রতারকদের খপ্পড়ে পড়েন এবং বিপর্যস্ত হন। এ জাতীয় ঘটনা আবার অন্যদের অনুৎসাহিত করে। অনেকে তাই ঝুঁকি না নিয়ে সঞ্চিত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখেন। কেউ কেউ জমি বা এপার্টমেন্ট কেনার কাজে সেই অর্থ লগ্নি করেন। এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য কোন সরকারের কোন কার্যকর উদ্যোগ এখনও দেখা যায়নি। সরকারসমূহ আন্তর্জাতিক ‘বিদেশি সাহায্য’ নির্ভর থাকতে যত আগ্রহী, উৎপাদশীল বিশাল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করতে তত আগ্রহী নয়।

‘সাহায্য’ দেবার নাম করে বাংলাদেশ, শুধু বাংলাদেশ নয়, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অর্থনৈতিক নীতিমালা নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্বব্যাংক, এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আইএমএফ-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। উন্নয়নের নামে তাদের মূল এজেন্ডা থাকে অর্থনীতিতে বহুজাতিক পুঁজির আধিপত্য তৈরি করা। অথচ তথাকথিত সাহায্যের নামে, প্রধানত ঋণ হিসেবে যে অংকের টাকা বাংলাদেশ গ্রহণ করে প্রবাসীদের আয় তার ১০ গুণেরও বেশি। এই বিপুল উৎসের একাংশের যথাযথ ব্যবহার করলেও আন্তর্জাতিক এসব সাম্রাজ্যবাদী সংস্থার খবরদারী থেকে সহজেই বাংলাদেশের মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

খাতওয়ারি উদ্যোগের কথা বললে নির্দিষ্টভাবে পাট শিল্প বা জ্বালানী খাতের কথা বলা যায়। শিল্পের উন্নয়নে বা জাতীয় সক্ষমতা বিকাশে এই রেমিট্যান্স থেকে ঋণ নেয়া কিংবা তার বিনিয়োগের রাস্তা তৈরি করে দেয়া খুবই সম্ভব। আমরা সরকারকে বরং বেশি আগ্রহী দেখি ‘বিদেশি সাহায্য’ নামে ঋণ নিতে। এই ঋণ আসে আদমজী পাটকল বন্ধসহ পাটশিল্পের বিনাশ করতে কিংবা গ্যাস বা কয়লাসম্পদ বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেবার মতো নীতিমালা বা আয়োজন করবার জন্য।

পাট শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা দরকার বিবিধ কারণে। এবং তা করা খুবই সম্ভব। তাতে প্রবাসী আয় কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। এছাড়া সার্বজনীন চিকিৎসা, সার্বজনীন শিক্ষা এবং গ্যাস, কয়লা, বিদ্যুৎ খাতে প্রবাসী আয় সহজেই কাজে লাগানো যায়। পুঁজির অভাবের অজুহাত দিয়ে জ্বালানী খাতের উপর দেশি বিদেশি মাফিয়াদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, আরও আয়োজন চলছে। অথচ জ্বালানী সংকট সমাধানের সহজ পথ করা হয়েছে কন্টকাকীর্ণ।

অথচ এগুলোর চাহিদার সঙ্গে রেমিট্যান্সের প্রবাহটাকে মেলানো গেলে ক্ষতিকর বিদেশি ‘সাহায্য’, ধ্বংসাত্মক বিদেশি বিনিয়োগ বা ঋণের জাল থেকে সহজেই দেশকে মুক্ত করা সম্ভব। আর সম্ভব উৎপাদনশীল খাত বিকাশের মধ্য দিয়ে অর্থনীতির যথাযথ বিকাশ। এই বিশাল সম্পদের যথাযথ, সুচিন্তিত, সুষ্ঠু ও উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং এই সম্পদ তৈরির পেছনের মানুষদের নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা গ্রহণের মূল দায়িত্ব সরকারেরই, যে ভূমিকা থেকে সরকার এখনও অনেক দূরে। এই কারণেই বর্তমানে যখন প্রবাসী খাতে সংকট দেখা যাচ্ছে তার মোকাবিলারও যথাযথ প্রস্তুতি নেই। কার্যকর উদ্যোগও নেই, শুধু আছে বাগাড়ম্বর। অপ্রস্তুত সরকার ও প্রতিষ্ঠানের সামনে এখন বিপন্ন লক্ষ লক্ষ মানুষ।

(জুন ৯, ২০১১ bdnews24.com এ প্রকাশিত)

Footer 1

Anu Muhammad
Professor of Economics
Jahangirnagar University

আনু মুহাম্মদ, Anu Muhammad

Footer 2

প্রচ্ছদপ্রবন্ধবই পত্রবক্তৃতাসাক্ষাৎকার • ভিডিও চিত্র | Landing
Email: This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

Developed by AM.Julash