জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হলো বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শিল্প ও বিদ্যুৎসহ জনগণের স্বার্থে তার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। জনগণ এই মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন তাদের স্বার্থ দেখার জন্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার জন্য। কিন্তু গত প্রায় দুই দশকে সরকার পরিবর্তিত হলেও এই মন্ত্রণালয়ের দেশবিরোধী ভূমিকার কোন পরিবর্তন হয়নি। তারা একের পর এক যেসব চুক্তি এবং যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতে লাভবান হয়েছে কতিপয় বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানি এবং দেশি কিছু গোষ্ঠী। কিন্তু দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তা ক্রমেই আরও বেশি বেশি হুমকির মুখে পড়েছে।
তাদের এই ভূমিকার সাম্প্রতিক উদাহরণ হচ্ছে গত মে মাসের প্রথমদিকে সান্টোস ও হেলিবার্টনের সঙ্গে তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির চুক্তি এবং কনকোফিলিপস-এর সাথে সাগরের গ্যাস ব্লক নিয়ে চুক্তির আয়োজন। সরকার দেশের গ্যাস সঙ্কটকে পুঁজি করে দেশের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে গেছে। তারা জাতীয় সংস্থাগুলোকে পর্যাপ্ত বাজেট দেয়নি। বিদেশি কোম্পানিগুলো নিজেদের দরকষাকষির শক্তি বাড়াতে অযথাই কালক্ষেপণ করেছে। আমরা বিভিন্ন সময়ে বিদ্যমান গ্যাস সংকট সমাধানের পথ দেখিয়েছি। বলেছি, দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ান। পুরাতন এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কূপগুলো মেরামত করুন। বিবিয়ানা থেকে মজুতের তুলনায় বেশি গ্যাস উত্তোলন করতে দেয়া হচ্ছে শেভরনকে, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হচ্ছে না। নীতিগত জায়গা ঠিক থাকলে, প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি নবায়ন করলে এই সমস্যা মোকাবিলা করে অনেক আগেই গ্যাস সংকট সমাধান করা যেতো।

কিন্তু সরকার সেই পথে যায়নি। সরকার সমস্যাকে জিইয়ে রেখেছে এবং এখন জাতিকে আরো বড় সমস্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। টিকিয়ে রাখা এই গ্যাস সঙ্কটের অজুহাত দিয়ে ‌‌‘তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির চুক্তি’র কারণে অস্ট্রেলীয় কোম্পানি সান্টোস ও মার্কিন কোম্পানি হেলিবার্টন এখন যেকোনো দামে তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রি করতে পারবে। বাংলাদেশ যেখানে ২৫ টাকায় প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস যোগান দিতে পারে, সেখানে উৎপাদন বণ্টন চুক্তির কারণে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে এমনিতেই গড়ে ২৫০-৩০০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়। এই তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির চুক্তির বলে এই সীমাও আর থাকবে না। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ৭ থেকে ৯ ডলার বা ৫০০-৭০০ টাকাতেও গ্যাস বিক্রির সুযোগ পাবে। অর্থাৎ উৎপাদন বণ্টন চুক্তির (পিএসসি) কারণে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের তুলনায় যেখানে প্রথমে ১০ থেকে ৩০ গুণ বেশি দামে এতদিন বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে আমাদের নিজেদের গ্যাস কিনতে হ’ত সেখানে উপরোক্ত চুক্তির কারণে এখন কিনতে হবে ৫০-১০০ গুণ বেশি দামে। যে দাম দিয়ে আমাদের নিজেদের গ্যাস আমাদেরই কিনতে হবে তা মায়ানমার বা কাতার থেকে গ্যাস আমদানির মতোই ব্যয়বহুল হবে। দেশের বিদ্যুৎ প্লান্ট বা সার কারখানা হয় গ্যাসের অভাবে অচল থাকবে নয়তো এরকম ভয়াবহ দামে গ্যাস কিনতে গিয়ে গ্যাস বিদ্যুৎসহ সব কিছুর দাম বাড়বে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অব্যাহত দামবৃদ্ধি এবং তার ফলে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে এসব চুক্তি অন্যতম কারণ। সামনে তার চাপ আরও বাড়বে।

গ্যাস খাতে এখনই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে ভর্তুকি দেয়া হয় দুই হাজার কোটি টাকারও বেশি। এখনকার চুক্তিগুলো এই পরিমাণ আরও বাড়াবে। নিজেরা করলে এর এক-দশমাংশ দিয়ে একই পরিমাণ গ্যাস পাওয়া সম্ভব ছিল। ঝুঁকি হিসাব করেই এটা সম্ভব ছিল। তাতে গ্যাস, বিদ্যুৎ সহজপ্রাপ্য ও সুলভ দুটোই হতো। বাপেক্সকে তার অর্জিত টাকা নিজের উন্নয়নে খরচের অনুমতি দেয়া হলে সে অত্যন্ত দক্ষ ও সক্ষম একটি আন্তর্জাতিক মানের জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারতো। জাতীয় সংস্থার মাধ্যমে যদি ‘সুনেত্র’ (সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা) গ্যাস কূপ উন্নয়ন করা হয় তাহলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের আশু কোন সম্ভাবনা থাকবে না। বাংলাদেশের মালিকানায় গ্যাস উত্তোলনের জন্য যে গবেষক ও যন্ত্রপাতি দরকার তা জাতীয় সংস্থাকে দেওয়া হলে বর্তমান জ্বালানি বাজেটের অর্ধেক বরাদ্দে জ্বালানি খাতের টেকসই উন্নয়ন করা সম্ভব।

বিদেশি কোম্পানির দেশীয় মুখপাত্ররা সবসময়ই বলেন, ‘আমাদের দক্ষতার অভাব রয়েছে’। অথচ আমরা দেখেছি বহুজাতিক অক্সিডেন্টাল আর নাইকো মিলে মাগুরছড়া আর টেংরাটিলার প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নষ্ট করেছে। আমরা শেভরন ও নাইকোর কাছে এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য যে পরিমাণ টাকা পাই তার বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ আদায় করবার জন্যও কোন উদ্যোগ কোন সরকার নেয়নি। সরকারের কাছে এরাই হচ্ছে দক্ষ। আর সরকারের কাছে অদক্ষ হলো বাপেক্স; যারা কখনো এরকম কিছু ঘটায়নি। দক্ষতা আকাশ থেকে পড়ে না, তার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ও ব্যবস্থা নিতে হয়। সুযোগ দিতে হয়। ভিশন ও অঙ্গীকার থাকতে হয়।

আর্থিক রক্তক্ষরণ, ধ্বংসযজ্ঞ এবং অর্থনৈতিক বোঝার এসব চিত্র থাকা সত্ত্বেও ৮০ ভাগ রপ্তানিমুখী চুক্তির মাধ্যমে কনোকোফিলিপস-এর হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে সমুদ্রের গ্যাস ব্লক। এই কোম্পানির আছে বহু দুর্ঘটনার রেকর্ড । সম্ভবত সেকারণেই দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের বিষয়টি কনোকোফিলিপসের সাথে চুক্তিতে যতটা সম্ভব অস্বচ্ছ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে পুঁজির অভাব। কত বিনিয়োগ করবে তারা? পাঁচ বছরে ১১০ মিলিয়ন ডলার বা ৭৭০ কোটি টাকা। এই টাকা বাংলাদেশের অর্থনীতির আয়তনের তুলনায় তুচ্ছ। এক বছরে এমপি আমলাদের জন্য সরকারি গাড়ি কেনার বাজেটই এর চাইতে বেশি। অথচ খোড়া যুক্তি দিয়ে সমুদ্রের সম্পদ তুলে দেয়া হচ্ছে এই মার্কিনী কোম্পানির হাতে। শতকরা ৮০ ভাগের মালিকানা তাদের, এই গ্যাস তারা এলএনজির মাধ্যমে রফতানি করতে পারবে– এই অধিকারও চুক্তিতে দেয়া আছে। দুর্ঘটনার দায় থেকেও তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

বলা হচ্ছে, তারা আগে পেট্রোবাংলাকে অফার করবে, কিন্তু নিজেরা পাইপলাইন তৈরি করে ভূখণ্ডে আনার চাইতে বিদেশ থেকে আমদানি করাই বেশি যুক্তিযুক্ত দেখানো হবে তখন। বলা হচ্ছে কনকোফিলিপস মেজারমেন্ট পয়েন্ট পর্যন্ত গ্যাস পৌঁছে দেবে। কিন্তু চুক্তিতে মেজারমেন্ট পয়েন্ট কোথায় হবে এটা সুনির্দিষ্ট করা নাই। পরে দেখা যাবে মেজারমেন্ট পয়েন্ট সাগরের মাঝখানে। চুক্তিতে ফাঁক থাকলে তা তাদের পক্ষেই যাবে। কারণ মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলার শীর্ষ কর্মকর্তা, ও কনসালট্যান্টরা বারবার প্রমাণ করছেন তারা কতিপয় গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতেই জান কোরবান করছেন। তারা আমাদের জন্য গুপ্তঘাতক।

আসলে বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ এবং আমাদের জাতীয় প্রয়োজন কখনোই এক হতে পারে না। তাদের দরকার যত তাড়াতাড়ি ও যত বেশি সম্ভব গ্যাস উত্তোলন করে তা বিক্রি করে উচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করা, সেজন্যেই তারা রফতানির বিধানসহ গ্যাস বা কয়লা নিয়ে চুক্তিতে আগ্রহী। আর আমাদের দরকার, প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস তুলে যতদিন সম্ভব তার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। সেজন্যই জাতীয় মালিকানা ও জাতীয় সক্ষমতার প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যে কাজ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ কর্মকর্তাদের করার কথা এখন তা করছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এবং কতিপয় কনসালট্যান্ট। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ দেখার কারণে তাদের পক্ষে এটা বোঝা অসম্ভব হচ্ছে যে, বিদেশি কোম্পানির মালিকানায় সীমিত নবায়নযোগ্য জ্বালানিসম্পদ রপ্তানির সুযোগ থাকা মানেই দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করা। বহুদেশ এই পথে আজ চরম সংকটে। অনেকে বলছেন, রপ্তানির বিধান না রাখলে বিদেশি কোম্পানি আসবে না। যা না রাখলে তারা আসবে না – তা তারা করবে না, এটা আমাদের বিশ্বাস করতে হবে? তাহলে খনিজ সম্পদ রফতানি নিষিদ্ধকরণ আইন প্রণয়ন করতে বাধা কোথায়?

সবমিলিয়ে কনোকোফিলিপস-এর সঙ্গে পিএসসি ২০০৮ এর অধীনে সমুদ্রের গ্যাস ব্লক নিয়ে যে চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার, তার কারণে ভয়াবহ একটি পর্বে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। চুক্তির দলিলেই বলা হচ্ছে বাংলাদেশ কোনভাবেই ২০ ভাগের বেশি পাবে না। সেটাও সমুদ্র বক্ষ থেকে ভূসীমায় আনতে গেলে বাংলাদেশকে ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। তরলায়িত করে(এলএনজি) কনোকোফিলিপস এই গ্যাস রফতানি করতে পারবে। এর পরিণতি হল গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সত্ত্বেও বাংলাদেশের শতভাগ গ্যাসই পাচার হবে বিদেশে। সমুদ্রের বিশাল সম্পদসহ অন্যান্য ব্লকগুলোও ক্রমে এ ধরনের চুক্তির অধীনে বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির হাতে চলে যাবে। সমুদ্রসীমা এখনও নির্ধারিত হয়নি। ভারত আমাদের সীমার একাংশ দাবি করে রেখেছে, বাকি অংশ যাচ্ছে মার্কিনীদের হাতে। মার্কিন কোম্পানির নিরাপত্তার অজুহাতে মার্কিনী নৌ-বাহিনীর কর্তৃত্ব স্থাপিত হবে বঙ্গোপসাগরে। জ্বালানি ও জাতীয় নিরাপত্তা দুটোই বিপর্যস্ত হবে।

(জুন ১৫, ২০১১ bdnews24.com এ প্রকাশিত)