পুঁজি ১ লেখার কাজ শেষ হয়েছিল ১৮৬৭ সালের ১৬ আগস্ট রাত ২টায়। লেখা শেষ করেই মার্কস চিঠি লিখেছিলেন এঙ্গেলসকে। লিখেছেন, “এই মাত্র শেষ পাতার কাজ শেষ হল।... এর জন্য তোমাকেই ধন্যবাদ জানাতে হয়, কারণ তোমার আত্মত্যাগ ছাড়া তিন খণ্ডের এই বিশাল কাজ করা আমার পক্ষে কখনোই সম্ভব হতো না।” পুঁজি’র প্রথম ইংরেজী সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল; মার্কসের মৃত্যুর পর ১৮৮৬ সালের শেষে। এটি প্রধানত অনুবাদ করেছিলেন মার্কস-এঙ্গেলস দুজনেরই বন্ধু স্যামুয়েল মুর। পুরোটা তিনি করতে পারেননি বলে কিছু অংশ করেছিলেন ড. এভলিং, মার্কসের জামাতা। মেয়েও এই কাজে অংশ নিয়েছিলেন, তিনি বিশেষ করে উদ্ধৃতিগুলো দেখেছিলেন। মার্কসের ইংরেজী থেকে অনূদিত উদ্ধৃতিগুলো পুনরায় পরীক্ষা করার দুরূহ কাজও তিনিই করেছিলেন। অনুবাদ পুরোপুরি দেখে দিয়েছিলেন এঙ্গেলস।

10690065 848727571813442 4363459523692457373 nশেষ খণ্ড বের হতে হতে পুঁজি গ্রন্থ পুরো ইউরোপে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। এঙ্গেলস এই গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন (৫ নভেম্বর ১৮৮৬), “পুরো মহাদেশে পুঁজি এখন হয়ে উঠেছে ‘শ্রমিক শ্রেণীর বাইবেল’। এই গ্রন্থের মূল বক্তব্য আরও বেশী বেশী করে শুধু জার্মানী ও সুইজারল্যান্ডে নয়, ফ্রান্স, হল্যান্ড, বেলজিয়াম, আমেরিকা এমনকি ইটালী ও স্পেনের শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের মূলনীতিতে পরিণত হচ্ছে। আর ইংল্যান্ডে মার্কসের তত্ত্ব পুরো সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের উপরই খুব জোরদার প্রভাব বিস্তার করেছে, ‘সংস্কৃতিবান’ মানুষদের জন্য যার বিস্তার শ্রমিক শ্রেণী থেকে কোন অংশে কম নয়।”
প্রথম জার্মান সংস্করণের ভূমিকা মার্কস লেখেন ২৫ জুলাই ১৮৬৭তে। মার্কস এতে পুঁজি গ্রন্থটিকে ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত ‘এ কনট্রিবিউশন টু দ্য ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকনমি’র ধারাবাহিকতা হিসেবেই উল্লেখ করেছেন। প্রথম অধ্যায়টিকেই, যাতে পণ্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, মার্কস সবচাইতে কঠিন অংশ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কেননা তাঁর ভাষায়, “একটি জৈব সত্তা হিসেবে সমগ্র নিয়ে গবেষণা তার কোষ নিয়ে গবেষণার চাইতে সহজতর।... বুর্জোয়া সমাজে শ্রমের উৎপাদের পণ্যরূপ কিংবা পণ্যের মূলরূপই অর্থনৈতিক কোষের চেহারা নেয়।”২ মার্কস তাঁর কাজের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন ইংল্যান্ডকে। কেন? তিনি বলছেন, “এ বইতে আমি পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি এবং তার সাথে সম্পর্কিত উৎপাদন ও বিনিময়ের শর্তাবলী পরীক্ষা করবো। বর্তমান সময় পর্যন্ত এর উৎকৃষ্ট ক্ষেত্র হল ইংল্যান্ড। সে কারণেই আমার তাত্ত্বিক চিন্তা বিকাশের ক্ষেত্র ইংল্যান্ডই ভিত্তি হিশেবে কাজ করেছে।”৩
ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলের বিশেষতঃ জার্মানীর মানুষের প্রশ্ন খেয়াল করে তিনি আরও বলেছেন, “পুঁজিবাদী উৎপাদনের প্রাকৃতিক নিয়মসমূহের ফলাফল হিসেবে যে সামাজিক দ্বন্দ্বসমূহের বিকাশ হয় তার উচ্চতর ও নিম্নতর মাত্রাটি নিয়ে প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন খোদ আইনগুলো ও প্রবণতাসমূহ নিয়েই, যেগুলো তাকে অবশ্যম্ভাবী এক পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যে দেশ শিল্পের দিক থেকে অধিকতর উন্নত সেটি অধিকতর অনুন্নত দেশের সামনে তার নিজের ভবিষ্যতের প্রতিমূর্তিই উপস্থিত করে।”৪ পুঁজিবাদী বিকাশ মানে তো প্রাক-পুঁজিবাদী শোষণ নিপীড়ন শেষ হয়ে যাবার নিশ্চয়তা নয়। তৎকালীন ইউরোপ এটা খুব ভালোমতোই দেখিয়েছে।
মার্কস সেটাই মনে করিয়ে দিচ্ছেন,“পশ্চিম ইউরোপের বাকি অংশের মতই আমরা শুধু পুঁজিবাদী বিকাশ দ্বারাই নয়, এর বিকাশের অসম্পূর্ণতা দ্বারাও দুর্ভোগের শিকার হই। আমরা শুধু জীবিত নয়, মৃত থেকেও ভুগি।”৫ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী আরও পরিষ্কার হয় যখন তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন যে, কিভাবে পুরো ইউরোপে এবং যুক্তরাষ্ট্রে নানা পরিবর্তনের কথা শাসক শ্রেণীর মুখেই শোনা যাচ্ছে, কিন্তু অবশ্যই ‘তার অর্থ এটা নয় যে, আগামীকালই একটা অলৌকিক পরিবর্তন আসবে।’ তবে তা এটা প্রমাণ করে যে, ‘বর্তমান সমাজ কোন অটল স্ফটিক নয়, এটা জৈব সত্তা যা পরিবর্তিত হতে সক্ষম এবং অবিরাম যার পরিবর্তন ঘটছে।’৬
বিশ্লেষণ পদ্ধতি, কাজের ধরন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলছেন যে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিই তাঁর প্রধান অবলম্বন। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে যে কোন আলোচনা বা সমালোচনাকে তিনি স্বাগত জানান, কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও পরিষ্কার করেছেন যে, এর বাইরে নিছক জনমতকে সন্তুষ্ট করবার জন্য তিনি কখনই কাজ করবেন না।
১৮৭৩ সালের ২৪ জানুয়ারী দ্বিতীয় জার্মান সংস্করণের সংযোজনেও তিনি সমালোচনার উত্তরে এবং প্রাসঙ্গিকভাবে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। ১৮৪৮ সালে মার্কস-এঙ্গেলস যখন কমিউনিস্ট ইশতেহার প্রকাশ করেন তখন থেকেই জার্মানীতে পুঁজিবাদের বিকাশ দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠেছে এবং এই ভূমিকা লেখার সময় তা রীতিমত ফুলে ফেঁপে ওঠে। কিন্তু, মার্কসের ভাষায় এর গতি প্রকৃতি তখন পর্যন্ত পেশাদার অর্থনীতিবিদদের অজানা। এর সঙ্গে মার্কস বিষয়বস্তু হিসেবে, বৈজ্ঞানিক শাস্ত্র হিসেবে, রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের অবস্থানকেও সম্পর্কিতভাবে দেখেছেন। বলেছেন, “এর শেষ মহান প্রতিনিধি রিকার্ডো শেষ পর্যন্ত সচেতনভাবে তাঁর অনুসন্ধানের শুরু হিসেবে শ্রেণী স্বার্থের দ্বন্দ্বকে, মজুরি ও মুনাফা, মুনাফা ও খাজনার বিরোধকে নিয়ে এসেছিলেন, সরলভাবেই তিনি এসব বিরোধকে প্রকৃতির সামাজিক বিধি হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে বুর্জোয়া অর্থনীতির বিজ্ঞান তার শেষ সীমায় এসে উপনীত হয়েছে যাকে অতিক্রম করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। রিকার্ডোর জীবিতকালেই সিসমন্ডির মধ্যে এর সমালোচনা উপস্থিত হয়েছিল।”৭
ততদিনে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে বুর্জোয়ারা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেছে। মার্কসের মতে সে কারণে শ্রেণী সংগ্রাম আরও স্পষ্ট রূপ নিয়েছে। জার্মানী প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, জার্মানীতে বুর্জোয়া শ্রেণীর তুলনায় সর্বহারা শ্রেণী অনেক বেশী শ্রেণীসচেতন। জার্মানীতে একদিকে যেমন রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের বুর্জোয়া বিজ্ঞানের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে তেমনি আবার তা হয়ে উঠেছে অসম্ভব। এর ফলে, জার্মান অর্থনীতিবিদরা দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। একদল হলেন বাস্তিয়াতের অনুসারী-বাস্তব ব্যবসার এবং অরুচিকর অর্থশাস্ত্রের সবচাইতে ভাসা ভাসা প্রতিনিধি। অন্যদলে আছেন যাঁরা পেশাগত বিশ্লেষক হিসেবে গর্বিত এবং জন স্টুয়ার্ট মিলের অনুসারী হিসেবে সংঘাতকে মেলানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। বুর্জোয়া অর্থশাস্ত্রের দিকে থেকে “জার্মানরা সবসময়ই স্কুল ছাত্রের মতই থেকে গেছে, থেকে গেছে বৃহৎ বিদেশী পাইকারদের হকার, খুচরা বিক্রেতা, অনুসারী ও নকলবাজ।”৮
জার্মানীতে পুঁজি গ্রন্থের সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “আমার বইয়ের সাহিত্যিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমার থেকে ভালভাবে অন্য কেউ জানে না।” কিন্তু তারপরও ইংরেজ, রুশ ভাষায় বিভিন্ন সমালোচনায় বরঞ্চ জটিল বিষয় অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করার কৃতিত্বই মার্কসকে দেয়া হয়েছে। ১৮৭২ সালের ফেব্রুয়ারীতে পুঁজির রুশ অনুবাদ প্রকাশিত হয় এবং এক বছর পার হবার আগেই ৩০০০ কপি শেষ হয়ে যায়। কিন্তু জার্মানীতে মার্কসের অন্যান্য লেখার মতই “জার্মান বুর্জোয়াসির শিক্ষিত অশিক্ষিত প্রতিনিধিরা পুঁজিকে নীরবতা দিয়েই হত্যা করতে চেষ্টা করেছিল।”
পুঁজির বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে দ্বান্দ্বিকতার ব্যবহার প্রসঙ্গে মার্কস হেগেলের প্রসঙ্গ টেনেছেন। তিনি বলেছেন, “আমার দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি যে শুধু হেগেলীয় থেকে আলাদা তা ই নয় এটি পুরোপুরি তার বিপরীত।”৯ হেগেলের কাছে যেখানে মস্তিষ্কের ক্রিয়া বা চিন্তার প্রক্রিয়া বা ‘ভাব’ সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে, মার্কস সেখানে এটিকে দেখেছেন সম্পূর্ণ উল্টোভাবে। তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন ভাব মানুষের মনোজগতে প্রতিফলিত বস্তুজগত ছাড়া আর কিছুই নয়, যেটি পরে চিন্তায় রূপান্তরিত হয়। ১৮৪৩ সালের দিকেই মার্কস হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতার বিরোধিতা করেছেন যখন হেগেলীয় ব্যাপারটা ছিল ফ্যাশনের ব্যাপার। কিন্তু যখন হেগেলকে ‘মৃত ঘোড়া’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হতে থাকলো তখন আবার মার্কস নিজেকে ‘এই শক্তিশালী চিন্তাবিদের ছাত্র’ হিসেবে পরিচয় দিতে কুন্ঠাবোধ করেননি। এবং এসব সমালোচককে মনে করিয়ে দিতে ভুল করেন নি যে,“হেগেলের হাতে দ্বান্দ্বিকতা একটা রহস্যের আবরণে ঢাকা পড়লেও তিনিই প্রথম এই বিষয়টিকে সামগ্রিক ও সচেতনভাবে উপস্থাপন করেছেন।”১০
১৮৭২ সালের ১৮ মার্চ ফরাসী সংস্করণের ভূমিকায় মার্কস পুঁজি পাঠের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সমস্যা সম্পর্কে তাঁর আশংকা ব্যক্ত করেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, যে পদ্ধতি তিনি পুঁজি গ্রন্থে ব্যবহার করেছেন তা অর্থনীতি বিশ্লেষণে এর আগে কখনো ব্যবহার করা হয়নি, সে কারণে যেসব পাঠক খুব দ্রুত একটা উপসংহারে আসতে চান তাঁরা অস্থির বোধ করতে পারেন। তিনি আরও বলেছেন, “এটা এমন এক সমস্যা যা দূর করার ক্ষমতা আমার নেই।... বিজ্ঞানের পথে কোন রাজকীয় (শর্টকাট) রাস্তা নেই। শুধু মাত্র যাঁরা এর খাড়া রাস্তায় ক্লান্তিকর যাত্রায় আতংকিত বোধ করবেন না তাঁদের পক্ষেই এর আলোকোজ্জ্বল শীর্ষবিন্দু দেখার সম্ভাবনা আছে।”১১
১৮৮৩ সালের ৭ নভেম্বর তৃতীয় জার্মান সংস্করণের ভূমিকা লেখেন এঙ্গেলস। কারণ সে বছরই ১৪ মার্চ কার্ল মার্কস মারা গেছেন। উল্লেখযোগ্য যে, এই সংস্করণ থেকেই পুঁজির ইংরেজী অনুবাদ করা হয়। এই ভূমিকায় এঙ্গেলস মার্কসের মৃত্যুপূর্ব পরিকল্পনার কথা আমাদের জানান। তিনি বলেন যে, “মার্কসের আসল ইচ্ছা ছিল প্রথম খণ্ডের একটা বড় অংশ নতুন করে লেখার, আরও সুনির্দিষ্টভাবে কিছু তাত্ত্বিক বিষয়ে সূত্রায়ন, কিছু বিষয় নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সর্বশেষ ঐতিহাসিক ও পরিসংখ্যান তথ্য সন্নিবেশিত করার। কিন্তু তাঁর শারীরিক অসুস্থতা এবং দ্বিতীয় খণ্ডের সম্পাদনার কাজ শেষ করবার জরুরী তাগিদ তাঁকে এই পরিকল্পনা বাদ দিতে বাধ্য করে।”১২ শুধু জরুরী কিছু সংশোধনী, এবং কিছু নতুন সংযোজন যা আগেই ফরাসী সংস্করণে গেছে সেগুলো তিনি যুক্ত করেছেন।
মার্কস তাঁর মূল যে কপিটির উপর বিভিন্ন ধরনের সংশোধনী বা সংযোজনী এনেছেন সেটা ছিল জার্মান ভাষায় লেখা। সেখানে আবার অনেক তথ্যনির্দেশ ছিল ফরাসী সংস্করণের। এছাড়া মার্কসের ব্যবহৃত বিভিন্ন উদ্ধৃতিকে ঠিকঠাকমত সাজানোর ক্ষেত্রে কিছু সমস্যাও হয়েছে। সমস্যাগুলো ছিল প্রধানতঃ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ, পাল্টা অনুবাদ, বড় বড় অনূদিত নোট ও উদ্ধৃতিকে আবার মূলে ফেরত আনা বা অন্য ভাষায় অনুবাদ করা।
ইংরেজ অর্থনীতিবিদদের তত্ত্ব পর্যালোচনা মার্কসের এই কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কিন্তু প্রথম যখন এই অর্থনীতিবিদদের লেখা অধ্যয়ন শুরু করেন তখন তিনি ইংরেজী জানতেন না। তিনি এগুলো পড়েছিলেন ফরাসী অনুবাদ থেকে। সেখান থেকেই নোট নিয়েছিলেন। ১৮৪৩-৪৫ সালে তৈরী করা পুরনো প্যারিস নোটবুক-এর এই নোটগুলো পরে ব্যবহার করবার সময় আবার অনুবাদ করতে হয়। এঙ্গেলস বলছেন, পুরো অর্থ ঠিক রাখবার প্রয়োজনে ইংরেজী সংস্করণের জন্য এগুলোর মূল লেখা আবার দেখা হয়।১৩
হিসাব নিকাশ-এর তৎকালীন বিভিন্ন নিয়ম নিয়েও সমস্যা রয়েছে। এঙ্গেলস বলছেন যে, সেসময় জার্মানীতে ওজন ও দৈর্ঘ্যপ্রস্থ পরিমাপের যতসংখ্যক নিয়ম ছিল তা প্রায় বছরের দিনগুলোর সমান। জার্মান মুদ্রা মার্কও ছিল দুইরকম। সেসময় প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে ব্যবহৃত হতো মেট্রিক পদ্ধতি আর বিশ্ব বাজার তৎপরতায় ব্যবহৃত হতো ব্রিটিশ পদ্ধতি। ব্রিটিশ অর্থনীতি এবং শিল্পসম্পর্ক যেহেতু মার্কসের বিশ্লেষণের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল, সেহেতু সেখানকার প্রচলিত পরিমাপ পদ্ধতিই মার্কস গ্রহণ করেছিলেন।১৪
১৮৯০ সালের ২৫ জুন চতুর্থ জার্মান সংস্করণেই এঙ্গেলস সর্বশেষ ভূমিকা লেখেন। মার্কসের মৃত্যু পরবর্তীতে পুঁজি গ্রন্থে ব্যবহৃত উদ্ধৃতি নিয়ে বিতর্কের জবাব ছিল এই ভূমিকার অন্যতম বিষয়। মার্কসের কনিষ্ঠা কন্যা ইলিয়নর এসব বিতর্কে যে সক্রিয় অংশ নেন তার সারসংক্ষেপও এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। এঙ্গেলস মৃত্যুবরণ করেন ১৮৯৫ সালের ৫ আগস্ট।

পণ্য ও মূল্য
পুঁজি গ্রন্থের মূল আলোচনা শুরু হয় পণ্য আলোচনা দিয়ে। প্রথম অধ্যায়ের নাম দেয়া হয়, পণ্য এবং মুদ্রা। এই অধ্যায়ের প্রথম ভাগ পণ্য। প্রথমেই আলোচনা করা হয় পণ্যের দ্বৈত চরিত্র নিয়ে: তার ব্যবহারিক মূল্য এবং মূল্য কিংবা মূল্যের সার ও মূল্যের পরিমাণ নিয়ে। আলোচনা পণ্য নিয়ে কেন শুরু হয়? কারণ পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় সমাজে যে সম্পদ দেখা যায় তা নিজেকে উপস্থিত করে ‘পণ্যসমূহের অপরিমেয় সমাবেশ’ হিসেবে।১৫ তার মানে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সত্তার একক খুঁজতে গেলে তা পাওয়া যাবে এই পণ্য-এর মধ্যেই। পণ্য কী? মার্কস বলছেন, এটা হচ্ছে আমাদের সত্তা-বহির্ভূত কোন জিনিস যা মানুষের বিভিন্ন ধরনের চাহিদা, তা পেটের হতে পারে, হতে পারে শখের, তা পূরণ করে। পণ্য আবার সরাসরি টিকে থাকার উপায় বা ঘুরিয়ে উৎপাদনের উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। মার্কস এখানে উদ্ধৃতি দিচ্ছেন ১৬৯৬ সালে প্রকাশিত একটি লেখার, যেটা লেখা হয়েছিল জন লক-এর একটি বক্তব্যের প্রত্যুত্তরে। লেখক নিকোলাস বারবন সেখানে বলেছিলেন, ‘আকাঙা থেকেই চাহিদা তৈরী হয়; এটা হতে পারে শরীরের ক্ষুধা কিংবা মনের ক্ষুধা।’
মার্কস প্রথমেই প্রবেশ করেছেন পণ্যের গুণ ও পরিমাণ বিষয়ে, এর ব্যবহারিক মূল্য ও বিনিময় মূল্য বিষয়ক আলোচনায়। আমরা পরেও দেখবো ব্যবহারিক ও বিনিময় মূল্য সম্পর্কে মার্কসের বিশ্লেষণ কিভাবে আমাদেরকে গভীর থেকে গভীরতর পর্যায়ে আমাদের নিয়ে যায় এবং একের পর এক অস্পষ্ট অন্ধকারাচ্ছন্ন সম্পর্কগুলোকে পরিষ্কার করে। জন লক-এর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলছেন, সপ্তদশ শতকে ইংরেজ লেখকেরা ‘ব্যবহারিক মূল্য’ বলতে ‘দরকার’ এবং ‘বিনিময় মূল্য’ বলতে ‘মূল্য’ ব্যবহার করতেন।১৬ মার্কস এগুলোকে স্পষ্টভাবে আলাদা করে বিশ্লেষণে অগ্রসর হচ্ছেন। বলছেন, যে কোন বস্তুর উপযোগই তার ব্যবহারিক মূল্য তৈরি করে যা সেই বস্তুর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। বস্তুর এই গুণ তৈরী করতে সেখানে শ্রমের দরকার হতে পারে কিন্তু এই গুণ তার মধ্যে প্রযুক্ত শ্রমের পরিমাণ-নিরপেক্ষ। এটি বাস্তব হয়ে ওঠে কেবল ভোগের মধ্য দিয়েই। আবার এই মূল্য পণ্য সম্পর্কে ভোক্তার ‘বাণিজ্যিক জ্ঞান’-এর উপর নির্ভর করে।
মার্কস বুর্জোয়া সমাজে ‘মুক্ত’ বাজার অর্থনীতি ধারণা যেসব অনুমিতির উপর দাঁড়িয়ে আছে তার মধ্যে সবচাইতে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী ও গুরুত্বপূর্ণ অনুমিতি-র দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলছেন, এখানে এক দৃঢ়মূল বিশ্বাস তৈরী করা হয় যে এই অর্থনীতিতে প্রত্যেকে ক্রেতা হিসেবে পণ্য সম্পর্কে এক বিশ্বকোষীয় জ্ঞান ধারণ করে।১৭ এই অনুমিতিগুলো আদতে কতটা আছে, আদৌ আছে কিনা তা যাচাই করা এই অর্থশাস্ত্রের লোকেরা প্রয়োজনীয় মনে করেন না। কিন্তু সিদ্ধান্তগুলো টানা হয় ঐ অনুমিতিগুলোর ভিত্তিতেই। মার্কসের সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বুর্জোয়া অর্থশাস্ত্রের মধ্যে এই গভীর অসঙ্গতি বিরাজমান। এর থেকে বের হওয়া এই শাস্ত্রের পক্ষে অসম্ভব। কেননা পুঁজিবাদের ‘মুক্ত’ চেহারা অনুমান করা বা তুলে ধরা আর এসবের মাধ্যমে তার অবস্থান যৌক্তিক করা এর অনুকূল অনেক সিদ্ধান্তে পৌঁছাবার প্রধান পথ। সুতরাং এমনসব অনুমিতির ভিত্তিতে বাস্তব সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয় যেগুলো বাস্তবে অনুপস্থিত। এরকম অবস্থায় এই অর্থশাস্ত্রীয় অনেক তাত্ত্বিক বুনিয়াদ ও সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা খুবই ভঙ্গুর অবস্থায় থাকে। এগুলো নিজে নিজে দাঁড়াতে পারে না। তার জন্য রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ ও অধিপতি বুর্জোয়া শ্রেণীর ‘ছলাকলা’ দরকার হয়।
পণ্যের ‘বিনিময় মূল্য’ সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ধারণাগুলো বা আপাতভাবে যা দেখা যায় তার মধ্যে মার্কস বিস্তর স্ববিরোধিতা দেখেছেন। একদিকে বিনিময় মূল্য উপস্থিত হচ্ছে নিছক একটি পরিমাণগত সম্পর্ক রূপে, যা সময় এবং জায়গা ভেদে ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। তার মানে একটি নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে একটি পণ্যের বিনিময় মূল্য একরকম দুর্ঘটনা এবং পুরোপুরি আপেক্ষিক ব্যাপার। আবার অন্যদিকে বিনিময় মূল্যকে দেখা হয় পণ্যের গুণের এক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে, যে গুণ পণ্যের অন্তর্গত, তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। একদিকে অন্তর্গত, অন্যদিকে আপেক্ষিক ও দুর্ঘটনা, এ দুটো ধারণার মধ্যে যে স্ববিরোধিতা তাকে মার্কস গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন এবং বিষয়টির ব্যাখ্যায় প্রবেশ করেছেন।
তিনি উদাহরণ দিয়ে যে আলোচনা করেছেন তা এরকম; ধরা যাক চিনি ও চাল কিংবা আটা ও আলু। আধকেজি চিনির সমান এককেজি চাল কিংবা এককেজি আটার সমান দুই কেজি আলু। এই সম্পর্কগুলো থেকে পণ্যসমূহের তুল্যমূল্য বোঝা যায়। বোঝা যায় একটি পণ্যের নির্দিষ্ট পরিমাণ অপর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্যের সঙ্গে বিনিময় করা যায়, কারণ সেই সেই পরিমাণ ‘সমান’। অর্থাৎ এরকম অবস্থা থেকে, মার্কস সিদ্ধান্ত টানছেন যে, প্রথমত, একটি নির্দিষ্ট পণ্যের কার্যকর বিনিময় মূল্য একটা সমান অবস্থা নির্দেশ করে। দ্বিতীয়ত, সাধারণত বিনিময় মূল্য হচ্ছে নির্দিষ্ট একটি বিষয়-এর প্রকাশ যা এই পণ্যেরই অন্তর্গত, তবুও এর থেকে তাকে আলাদা করা যায়। সেটা কী? মার্কস আবারও দৃষ্টান্তগুলো ব্যাখ্যা করতে করতে এসে বলছেন, দুটি পণ্যের জন্যই অভিন্ন কোন উপাদান এখানে আছে। সাধারণভাবে সকল পণ্যের মধ্যেই এই অভিন্ন উপাদান পাওয়া যাবে যার মাধ্যমে পণ্যগুলোকে প্রকাশ করা যায়, সেগুলোর তুলনা করা যায়, সেগুলোকে বিনিময় করা সম্ভব।
এই অভিন্ন উপাদানটি জ্যামিতিক বা রাসায়নিক কোন ব্যাপার নয়, কিংবা নয় পণ্যের উপযোগিতা, যা তার ব্যবহারিক মূল্য গঠন করে। পণ্যের বিনিময় ব্যবহারিক মূল্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটি ক্রিয়া। ব্যবহারিক মূল্য বিবেচনার সময় বিভিন্ন পণ্যের বিভিন্ন গুণ সামনে আসে আর বিনিময় মূল্য বিবেচনার সময় আসে বিভিন্ন পরিমাণ। তাহলে ব্যবহারিক মূল্য বিবেচনার বাইরে রাখলে সকল পণ্যের মধ্যে অভিন্ন উপাদান থাকে একটিই: এর সবগুলোই শ্রমের তৈরী। সকল পণ্যের জন্যই শেষ পর্যন্ত যে জায়গায় এসে সব এক হয়ে যায় সেটি হল মানুষের বিমূর্ত শ্রম। মার্কস বলছেন, এই শ্রমশক্তি পণ্য উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় খরচ হয়, শ্রম যুক্ত থাকে সকল পণ্যে। যখন আমরা এই সামাজিক দ্রব্যকে আরও স্পষ্টভাবে দেখি তখন সবার ক্ষেত্রে অভিন্ন হিসেবে উপস্থিত হয়- মূল্য। ব্যবহারিক মূল্য থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বিনিময় মূল্য উপস্থিত হয়, পণ্য যখনই বিনিময় হোক, বিনিময় মূল্যের মধ্য দিয়ে তার মূল্যই প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ একটি দরকারী জিনিষের যে মূল্য তা শেষমেশ নির্ধারিত হয় তাতে ব্যবহৃত কিংবা তার অন্তর্গত মানুষের বিমূর্ত শ্রম দ্বারা। তাহলে এই মূল্য পরিমাপ তো করতে হবে, তার উপায় কী? মার্কস বলছেন, সাধারণভাবে এটা করতে হবে মূল্য সৃষ্টিকারী উপাদান, শ্রমের পরিমাণ দিয়ে। শ্রমের পরিমাণ পরিমাপের পথ হচ্ছে তার দৈর্ঘ্য অর্থাৎ শ্রমসময় নির্ধারণ করা।
মার্কসের এই প্রস্তাব বরাবরই নানা সমালোচনা ও বিকৃত উপস্থাপনার শিকার হয়েছে। বর্তমান সময় পর্যন্ত অর্থশাস্ত্র আলোচনায় মার্কসের মূল্য সংক্রান্ত ধারণা অব্যাহত আক্রমণের বিষয়। এ নিয়ে আমরা পরে আরও বিস্তারিত আলোচনায় যাবো। তবে মার্কসের সময়ই এটি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ছিল। মার্কস সেসব নিয়েও আলোচনা করেছেন পুঁজিতে। তিনি বলছেন, অনেকেই এরকম কথা বলে থাকেন যে, যদি কোন পণ্যের মূল্য তার মধ্যে প্রযুক্ত শ্রম দিয়েই নির্ধারিত হয় তাহলে অলস এবং অদক্ষ শ্রমিকদের তৈরী পণ্যই সবচাইতে বেশি মূল্যবান হবে, কেননা ঐ পণ্য উৎপাদনে সময় লাগবে অনেক বেশি। মার্কস এখানে নিয়ে এসেছেন ‘সামাজিকভাবে আবশ্যকীয় শ্রমসময়’এর ধারণা। একটি সমাজে একটি পণ্য উৎপাদনে বিভিন্ন শ্রমিক বিভিন্ন সময় নিতে পারেন, তাছাড়া প্রযুক্তির ব্যবহারের পার্থক্যের কারণে বড় তফাৎ তৈরী হতে পারে। হস্তচালিত তাঁত এবং যন্ত্রচালিত তাঁতের মধ্যে তো ঘণ্টাপ্রতি উৎপাদনে অনেক পার্থক্য তৈরী হয়। সেক্ষেত্রে পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হবে কি ভাবে?

সামাজিকভাবে আবশ্যকীয় শ্রমসময়
মার্কসের ব্যাখ্যায়, কোন পণ্য যে প্রযুক্তি দিয়েই উৎপাদিত হোক কিংবা শ্রমিকের দক্ষতার মাত্রা যাই হোক না কেন, তাতে কিছু আসে যায় না। একটি সমাজে একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রযুক্তি ও দক্ষতার একটি মাত্রা উপস্থিত থাকে। তার ভিত্তিতে ঐ সমাজে ঐ নির্দিষ্ট সময়ে একটি পণ্যের উৎপাদনে প্রয়োজনীয় শ্রমসময়ের একটি গড় পাওয়া যায়। একেই বলা হয় ‘সামাজিকভাবে আবশ্যকীয় শ্রমসময়’। কোন পণ্যের মূল্য ভিন্ন ভিন্ন শ্রমসময় নয়, এই ‘সামাজিকভাবে আবশ্যকীয় শ্রমসময়’ দ্বারাই নির্ধারিত হয়। এই ধারণা মার্কস খুব গুরুত্বের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন, তবে এটি তাঁর নিজের আবিষ্কৃত নয়। মার্কসের ব্যবহারের বেশ আগেই এই ধারণা উত্থাপন করেছেন নাম-না-জানা এক অর্থনীতিবিদ। মার্কস এই নাম ও তারিখবিহীন লেখাটির উচ্চ প্রশংসা করেছেন এবং লেখার বিভিন্ন দিক বিবেচনা ও বিশ্লেষণ করে এই মর্মে সিদ্ধান্ত টেনেছেন যে, এটি দ্বিতীয় জর্জ-এর সময়কালের ১৭৩৯ বা ১৭৪০ সালের মধ্যে লেখা। ঐ লেখাতে এটাও বলা হয়েছিল যে, প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যখন বিনিময় হয় তখন সেগুলোর মূল্য নির্ধারিত হয় সেটি উৎপাদনে সাধারণভাবে প্রয়োজনীয় শ্রমের পরিমাণ দ্বারা।১৮
অর্থাৎ, এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো পণ্য উৎপাদনে যদি শ্রমসময়ের প্রয়োজন অপরিবর্তিত থাকে তাহলে তার মূল্যও অপরিবর্তিত থাকবে। কিন্তু এটা তো কখনো হয় না। তাহলে এর কারণ কী? মার্কস বলছেন, শ্রমের উৎপাদনশীলতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দু’দিকেই পরিবর্তন সাধিত হয়। এই উৎপাদনশীলতা অনেক উপাদানের উপর নির্ভরশীল। যার মধ্যে আছে, শ্রমিকের গড় দক্ষতা, বিজ্ঞানের মান ও তার প্রয়োগের অবস্থা, উৎপাদনের সামাজিক সংগঠন, উৎপাদনের উপায়ের ক্ষমতা ও অবস্থা এবং প্রাকৃতিক পরিস্থিতি। প্রাকৃতিক পরিস্থিতির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মার্কস ভূমির মান, আবহাওয়া, খনির অবস্থান ইত্যাদি তুলে এনেছেন। তিনি বলছেন, একই পরিমাণ শ্রম উত্তম খনি হলে যতটা ধাতবদ্রব্য তুলতে পারে, খনি খারাপ হলে তা পারে না। হীরা যেহেতু খুবই দুর্লভ বস্তু সেহেতু তা পাবার জন্য অনেক বেশি শ্রমসময় দিতে হয়। সমসাময়িক বিভিন্ন গবেষণাকর্মের উদাহরণ দিয়ে মার্কস সোনার পুরো মূল্য আদৌ কখনও শোধ করা হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। আরেকটি গবেষণার উদাহরণ টেনে তিনি বলেছেন, ব্রাজিলে ১৮২৩ সাল পর্যন্ত আট বছরে হীরার খনিতে যে উৎপাদন হয়েছে তার দাম ঐ একই দেশে দেড় বছরের উৎপাদিত চিনি ও কফির দামের সমানও হয় নি। অথচ হীরা উৎপাদনে শ্রম প্রয়োজন হয়েছে অনেক বেশী এবং তার মূল্যও তাই অনেক বেশী।
অর্থাৎ, মার্কস, সারসংক্ষেপ করছেন, সাধারণভাবে শ্রমের উৎপাদনশীলতা যত বেশী হয় কোনকিছু উৎপাদনে শ্রমসময় তত কম লাগে, এবং সেই উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্যও তত কম হয়। আবার উল্টোদিকে শ্রমের উৎপাদনশীলতা যত কম হয়, কোনো দ্রব্য উৎপাদনে শ্রমসময় বেশী লাগে তত ঐ দ্রব্যের মূল্য বেশী হয়। আরও সহজভাবে, একটি পণ্যের মূল্য তার অন্তর্গত শ্রমের পরিমাণের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে এবং সেই শ্রমের উৎপাদনশীলতার সঙ্গে বিপরীতভাবে পরিবর্তিত হয়।
এই প্রসঙ্গে মার্কস আরও পরিষ্কার করে বলছেন যে, মূল্য না থাকলেও কোন কিছুর ব্যবহারিক মূল্য থাকতে পারে। এটা হতে পারে পানি, বাতাস, অব্যবহৃত ভূমি ইত্যাদি। মানুষের কাছে যেগুলোর উপযোগিতা থাকে শ্রমের যুক্ততা ছাড়াই। আবার কোনকিছু শ্রমযুক্ত হয়ে, পণ্য না হয়েও মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে পারে। নিজের শ্রমে উৎপাদিত অনেক দ্রব্য মানুষের চাহিদা পূরণ করে, সেগুলোর ব্যবহারিক মূল্য আছে, কিন্তু সেগুলো পণ্য নয়। পণ্য উৎপাদন করতে গেলে সেগুলোর ব্যবহারিক মূল্য শুধু ঐ ব্যক্তির কাছে থাকলেই হবে না, অন্যদের কাছেও তার ব্যবহারিক মূল্য থাকতে হবে, অর্থাৎ সেগুলোর সামাজিক মূল্য থাকতে হবে।
এখানে এরকম একটি প্রশ্ন উঠতে পারে যে, তবে কি কোন দ্রব্যের উপযোগিতা উৎপাদক ছাড়া অন্যকারও কাছে থাকলেই তা পণ্যে পরিণত হবে? এটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরী হতে পারে ভেবে বিষয়টা পরিষ্কার করে এঙ্গেলস একটি প্যারা যোগ করেছেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলছেন যে, কোনকিছু অন্যের জন্য উৎপাদিত হলেই তা পণ্য হবে না, যেমন ফসলী-খাজনা পণ্য নয়, পণ্য হতে গেলে তা অবশ্যই বিনিময় হতে হবে।১৯ যাইহোক, মার্কস এই অংশটি শেষ করছেন এই বলে যে, উপযোগিতা না থাকলে কোনকিছুরই মূল্য থাকে না। কোনকিছু যদি ব্যবহার অযোগ্য হয় তাহলে তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত শ্রমেরও কোনো কার্যকারিতা থাকে না, শ্রম সেখানে শ্রম হিসেবে বিবেচিতই হয় না। সুতরাং ঐ দ্রব্যেরও কোন মূল্য দাঁড়ায় না।


images 3পণ্যে অন্তর্ভুক্ত শ্রমের দ্বৈত চরিত্র
মার্কস এই পর্বে আবারও শুরু করছেন সেখান থেকেই যে, প্রথম দৃষ্টিতে একটি পণ্য আমাদের সামনে দুটো বিষয়ের জটিল মিশ্রণ হিসেবে উপস্থিত হয়, এগুলো হল: ব্যবহারিক মূল্য এবং বিনিময় মূল্য। এরপর তিনি বলছেন, শ্রমের ক্ষেত্রেও ক্রমে আমরা একই বৈশিষ্ট্য দেখি। শ্রমের মধ্যে পণ্যের এই দ্বৈত চরিত্র শনাক্ত করার কাজটি মার্কসই প্রথম করেন। তিনি নিজেও তা বলেছেন। অর্থশাস্ত্রের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। শ্রমের এই বৈশিষ্ট্য এবং শ্রম বিভাজনের তাৎপর্য্য নিয়েই এরপর তিনি আলোচনা করেছেন।
মার্কসের অনুসরণে উদাহরণ হিসেবে এখানে দুটো পণ্যের বিষয় আনা যায়: সুতা এবং পোশাক। দুটোতেই শ্রম প্রয়োজন হয়। কিন্তু গুণগত দিক থেকে সেগুলো এক নয়। কারণ দুটোর ব্যবহারিক মূল্য ভিন্ন। সুতরাং এই দুটোর উৎপাদনের জন্য শ্রমও ভিন্ন, একটির জন্য দরকার সুতা বোনার শ্রম, অন্যটির জন্য দরকার দর্জির শ্রম। এরকম দুটো পণ্য যদি গুণগত ভাবে ভিন্ন না হয়, যদি এগুলো গুণগতভাবে ভিন্ন শ্রম দ্বারা উৎপাদিত না হয় তাহলে বিনিময়ের জন্য এগুলোর মুখোমুখি দাঁড়াবার অবস্থাও থাকে না। একই ধরনের পণ্যের মধ্যে বিনিময় হয় না, অর্থাৎ একই ধরনের শ্রমের মধ্যে বিনিময় হয় না। এই যে বিভিন্ন ধরনের মূল্যের উদ্ভব এবং তার পেছনে বিভিন্ন ধরনের শ্রম এটাই বিনিময়ের অবস্থা তৈরী করে এবং সামাজিক শ্রম বিভাজনকেও তা স্পষ্ট করে।
পণ্য উৎপাদনের জন্য এই শ্রমবিভাজন একটি আবশ্যকীয় পূর্বশর্ত, কিন্তু মার্কস সতর্ক করেছেন যে, তার অর্থ আবার এটা নয় যে, উল্টোদিক থেকে শ্রমবিভাজনের জন্য পণ্য উৎপাদন একটি আবশ্যকীয় পূর্বশর্ত- তা সঠিক নয়। আদি সমাজেও শ্রম বিভাজন ছিল কিন্তু পণ্য উৎপাদন ছিল না। আবার মানব সমাজ হাজার বছর ধরে পোশাক বানিয়েছে, একক ব্যক্তির দর্জি হয়ে ওঠা ছাড়াই। মার্কস একটু পরে গিয়ে আবার এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, পণ্য উৎপাদনের পেছনে বিভিন্ন ধরনের শ্রম যখন নিয়োজিত থাকে তখন সমাজের বিকাশ ধারা এমন পর্যায়ে থাকতে পারে যেখানে এক এবং অভিন্ন ব্যক্তিই এই বিভিন্ন ধরনের শ্রম দান করতে পারে। এটা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে, কিন্তু তা সত্ত্বেও এটাই ঘটে।
মার্কস বলছেন: সমাজের ধরন যাই হোক, ব্যবহারিক মূল্য উৎপাদনের জন্য শ্রমের ব্যবহার মানব সমাজের অস্তিত্বেরই অন্যতম শর্ত। এটি প্রকৃতি আরোপিত একটি প্রক্রিয়া যেটি ছাড়া মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যে কোনো বস্তুগত বিনিময় সম্ভব হতো না এবং তার ফলে জীবনও চলমান থাকতো না। যেকোন ব্যবহারিক মূল্য কিংবা যেকোন পণ্য দুটো উপাদানের সমষ্টি, এগুলো হল: বস্তু এবং শ্রম। শ্রম না থাকলেও বস্তুটি থাকেই এবং মানুষের সহায়তা ছাড়াই প্রকৃতিতে অবিরাম এগুলোর কাজ চলতে থাকে। মানুষ এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন কিছুই করে না। প্রকৃতি যা করে সেটাই মানুষও করে, তা হল বস্তুর রূপান্তর ঘটানো। একাজ তাকে প্রকৃতির সাহায্য নিয়েই করতে হয়। তার মানে আমরা দেখছি যে, মার্কসের ব্যাখ্যায়, বস্তুগত সম্পদ কিংবা শ্রম উৎপাদিত ব্যবহারিক মূল্যের একমাত্র উৎস শ্রম নয়। কাজেই, যেকোন উৎপাদনে মানুষের শ্রম প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েই অগ্রসর হয়। মার্কস এখানে এসে উইলিয়াম পেটি-র উদ্ধৃতি দিয়েছেন, পেটি বলেছেন- শ্রমব্যবহৃত যে কোন সম্পদের ক্ষেত্রে ‘প্রকৃতি হচ্ছে মাতা এবং শ্রম হচ্ছে পিতা।’

শ্রম: মূর্ত ও বিমূর্ত
সাধারণভাবে উৎপাদনশীল তৎপরতা বা শ্রমের ব্যবহারোপযোগী চরিত্র মানুষের শ্রমশক্তির ব্যয় ছাড়া আর কিছুই নয়। যত বিভিন্ন ধরনের শ্রমই হোক, সবগুলো ক্ষেত্রেই মানুষের মস্তিষ্ক, ৱায়ু এবং পেশীর ব্যবহার ঘটে অর্থাৎ শ্রমশক্তির খরচ হয়। এগুলো দুটো পদ্ধতিতে মানুষের শ্রমক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। বিভিন্ন পরিবর্তন সত্ত্বেও এই শ্রমশক্তি আসলে একই। তবে এর বিবিধ ধরন গ্রহণের জন্য একটি পর্যায়ের বিকাশ প্রয়োজন হয়। তবে পণ্যের মূল্য মানুষের বিমূর্ত শ্রমকেই প্রতিনিধিত্ব করে।
শ্রম পরিমাপ করতে গেলে দক্ষ ও সরল শ্রমের মুখোমুখি হই আমরা। মার্কস বিষয়টি এখানে পরিষ্কার করে নিয়েছেন, বলছেন: বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে সরল গড় শ্রম ভিন্ন ভিন্ন হয় এটা ঠিকই, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সমাজে এটি নির্দিষ্টই থাকে। দক্ষ শ্রম আসলে এই সরল শ্রমের ঘনীভূত রূপ কিংবা তার গুণিতক। অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিমাণ দক্ষ শ্রম আসলে অধিকতর পরিমাণ সরল শ্রমের সমান। হিসাবের সুবিধার জন্য এরপর থেকে মার্কস সকল শ্রমকে অদক্ষ সরল শ্রম হিসেবেই বিবেচনা করেছেন। মার্কস আবার এই বলে সতর্কও করে দিচ্ছেন যে, এখানে মজুরি অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট শ্রম সময়ের জন্য শ্রমিককে যে মূল্য শোধ করা হচ্ছে সেটি নিয়ে তিনি আলোচনা করছেন না, তিনি আলোচনা করছেন পণ্যের মূল্য নিয়ে যে, পণ্যের মধ্যে সেই শ্রমসময় কার্যকর হয়েছে।
আগে আমরা যে দুটো পণ্যের উদাহরণ দিয়েছি সেই সুতা এবং পোশাক-এর কথা আবার ভাবতে পারি। এগুলো নিছক মূল্যই নয়, বিভিন্ন পরিমাণের মূল্য। পোশাকের মূল্য সুতার চাইতে বেশী, কারণ সুতার মধ্যে যতটা শ্রম আছে তার চাইতে বেশি আছে পোশাকে। মার্কস ব্যবহারিক মূল্য ও (বিনিময়) মূল্য ধারণাগুলো আরও পরিষ্কার করে বলছেন যে, ব্যবহারিক মূল্য বিবেচনায় একটি পণ্যের মধ্যে যে শ্রম আছে তার গুণগত দিকটি হিসাব করা হয়, আর মূল্য বিবেচনায় হিসাব করা হয় শ্রমের পরিমাণগত দিকটি।
প্রথম ক্ষেত্রে প্রশ্ন হল: কী ও কীভাবে? আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে প্রশ্ন হল: কতটা? কত লম্বা সময়? একটি পণ্যের উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমের পরিমাণ বদলে যায় কিন্তু তার ভেতরে অন্তর্ভুক্ত শ্রমের গুণগত দিকটি একই থাকে। ব্যবহারিক মূল্যের পরিমাণ বৃদ্ধির অর্থ হল বস্তুগত সম্পদের বৃদ্ধি। আবার অন্যদিকে, বস্তুগত সম্পদের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর (বিনিময়) মূল্যের পতন ঘটতে পারে। এই বিপরীত গতির চলার কারণ নিহিত আছে শ্রমের দ্বৈত চরিত্রের মধ্যে। প্রয়োজনীয় শ্রম, তার উৎপাদনশীলতার হ্রাস-বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে, সকল উৎপাদিত দ্রব্যের কমবেশী অফুরান উৎস। উৎপাদন মতা যখন বাড়ে তখন তা একদিকে শ্রমের কার্যকারিতা, এবং সেই শ্রমের উৎপাদিত ব্যবহারিক মূল্যের পরিমাণ বাড়ায়, অন্যদিকে তা একই পরিমাণ দ্রব্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম-সময় হ্রাসের মাধ্যমে তার মূল্য কমিয়ে ফেলে।

একদিকে, শারীরিকভাবে বলতে গেলে, সকল শ্রমই হচ্ছে মানুষের শ্রমশক্তির ব্যয়। এবং অভিন্ন বিমূর্ত মানবিক শ্রমের মাধ্যমে এটি পণ্যের মূল্য সৃষ্টি ও গঠন করে। অন্যদিকে সকল শ্রমই একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ও বিশেষ ধরনে মানুষের শ্রমশক্তির ব্যয় এবং মূর্ত প্রয়োজনীয় শ্রমের এই চরিত্রই উৎপাদন করে ব্যবহারিক মূল্য।
মার্কস এখানে এডাম স্মীথের ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, যিনি শ্রমই সকল পণ্যের মূল্য পরিমাপে একেবারেই যথেষ্ট এবং এই শ্রম দিয়েই সর্বসময়ে সকল পণ্যের মূল্য পরিমাপ ও তুলনা সম্ভব-এই কথা প্রমাণের জন্য বলেছেন, “সমপরিমাণ শ্রমের মূল্য নিশ্চয়ই সবসময় ও সর্বস্থানে শ্রমিকের জন্য সমান হয়। গড়পড়তা দক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিক স্বাস্থ্য, শক্তি এবং সক্রিয়তাকালে একজন শ্রমিককে অবশ্যই সমানুপাতে বিশ্রাম, স্বাধীনতা এবং সুখ বিসর্জন দিতে হবে।”২০ মার্কস এই বক্তব্যকে সরাসরি খণ্ডন করে বলেছেন, সবজায়গায় না হলেও এখানে স্মীথ পণ্য উৎপাদনে ব্যয়কৃত শ্রমের পরিমাণের মূল্য নির্ধারণের সঙ্গে শ্রমের মূল্যের মাধ্যমে পণ্যের মূল্য নির্ধারণকে গুলিয়ে ফেলেছেন। এবং এর থেকেই তিনি এটা প্রমাণ করতে চেষ্টা করছেন যে, শ্রমের সমান পরিমাণের মূল্য সবসময়ই সমান।
অন্যদিকে, মার্কস আরও বলছেন, পণ্যের মূল্যে যে শ্রম প্রকাশিত হয় তাকে স্মীথ শ্রমশক্তির ব্যয় হিসেবে দেখছেন, কিন্তু তিনি এই ব্যয়কে বিবেচনা করছেন নিছক বিশ্রাম, স্বাধীনতা ও সুখ-এর বিসর্জন হিসেবে, একইসঙ্গে জীবন্ত মানুষের স্বাভাবিক তৎপরতা হিসেবে নয়। মার্কস বরঞ্চ, এই প্রসঙ্গে স্মীথের নাম না-জানা উদ্ধৃত পূর্বসূরীর বক্তব্যকে বেশী যুক্তিযুক্ত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছিলেন, “জীবনের এই প্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্য এক ব্যক্তি এক সপ্তাহ কাজ করছে, বিনিময়ে তাকে দিচ্ছে অন্যকিছু। শ্রম এবং সময়ের মতো আর কী কী খরচ হচ্ছে তার হিসাবের চাইতে যথাযথ সমানুপাতিক (বিনিময়) বের করবার আর কোন পথ তার কাছে নেই। এটি কার্যতঃ একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি জিনিসে একজন মানুষের শ্রমের সঙ্গে অন্য একটি জিনিসে আরেকজন মানুষের একই সময়ের শ্রমের বিনিময় ছাড়া আর কিছু নয়।”২১

তথ্যসূত্র 
১. Karl Marx: CAPITAL, A Critical analysis of Capitalist Production, Translated from the third German edition by Samuel Moore and Edward Aveling and edited by Frederick Engels. Progress Publishers, Moscwo, ১৯৬৫.
২. পূর্বোক্ত, পৃ ৮
৩. ঐ
৪. পৃ ৮-৯। The country that is more developed industrially only shows, to the less developed, the image of its own future.
৫. পৃ ৯। We, like all the rest of Continental Western Europe, suffer not only from the development of capitalist production, but also from the incompleteness of that development...We suffer not only from the living, but from the dead.
৬. পৃ ১০। present society is no solid crystal, but an organism capable of change, and is constantly changing.
৭. পৃ ১৪
৮. পৃ ১৬
৯. পৃ ১৯
১০. পৃ ২০
১১. পৃ ২১। There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summit.
১২. পৃ ২৩
১৩. পৃ ২৭
১৪. পৃ ২৪
১৫. পৃ ৩৫। এই ধারণা নিয়ে মার্কস আগে আলোচনা করেছেন অর্থশাস্ত্রের পর্যালোচনা গ্রন্থে।
১৬. In English writers of the 17th century we frequently find & worth in the sense of value in use, and & value in the sense of exchange value. পৃ ৩৬
১৭. In bourgeois societies the economic fictio juris prevails, that every one, as a byuer, possesses an encyclopaedic knowledge of commodities. পৃ ৩৬
১৮. The value of them (the necessaries of life), when they are exchanged the one for another, is regulated by the quantity of labour necesarily required, and commonly taken in producing them.P (Some thoughts on the Interest of Money in General, and Particularly in the Public Funds, & c.P, Lond., p.36)
১৯. yTo become a commodity a product must be transferred to another whom it will serve as a use-value, by means of an exchange.P c… ৪১
২০. Adam Smith: Wealth of Nations, b.1, ch.V.
২১. I. c., p. এঙ্গেলস এখানে একটি টীকা যোগ করেছেন এই বলে যে, ইংরেজী ভাষায় শ্রমের দু’ধরনের প্রকাশ বোঝানোর জন্য দুটো আলাদা শব্দ ব্যবহারের সুবিধা আছে। ওয়ার্ক যেখানে বোঝায় ব্যবহারিক মূল্য যা পরিমাপ করা হয় গুণগতভাবে, সেখানে লেবার বলতে বোঝায় (বিনিময়) মূল্য যা পরিমাণগতভাবে পরিমাপ করা হয়। বাংলাভাষাতেও আমরা দুটো ভিন্ন শব্দই পাই, যথাক্রমে কাজ ও শ্রম।

[ এপ্রিল-জুন ২০০৮ সংখ্যায় নতুন দিগন্তে প্রকাশিত। চলবে... ]